আলোকিত মোস্তফা জামান আব্বাসী ও সামিরা আব্বাসীর গজল সন্ধ্যা…

মোস্তফা জামান আব্বাসী বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের জীবন্ত কিংবদন্তী পুরুষ। তিনি একজন বিখ্যাত গায়ক, লেখক এবং সঙ্গীত গবেষক। জন্মলগ্ন থেকেই সুরের ছোঁয়ায় বেড়ে উঠা তাই সুরকেই আঁকড়ে ধরে এখনো বেঁচে আছেন তিনি। বাবা দেশের বিখ্যাত পল্লী সম্রাট শ্রদ্ধেয় আব্বাসউদ্দিন, ছোট বোন দেশের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌসি রহমান। এবং মেয়ে সামিরা আব্বাসী সঙ্গীত চর্চায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবং আমেরিকা থেকে উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে গড়েছেন। একটি সৃজনশীল সঙ্গীত পরিবার। গত ২৯ তারিখ শুক্রবার ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো জমকালো গজল সন্ধ্যা। বাবা-মেয়ের সুরের আসর। ছিল উৎসাহিত শ্রোতা, ছিল আবেগ ভালোবাসায় মেশানো এক মনোরম পরিবেশ। অনুষ্ঠানকে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর করতে ছিল দেশের জনপ্রিয় যন্ত্রশিল্পীরারা। ছিলেন – গিটারে-রিচার্ড কিশোর, তবলা-পল্লব সান্যাল, কীবোর্ডে-রুপ্তান দাশ শর্মা।
এ মুখরিত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় মোস্তফা জামান আব্বাসীর সু’যোগ্য কন্যা সামিরা আব্বাসী গেয়েছেন – রানজিশ ই শাহী, ঘাম কা খাজানা, দুনিয়া কিসিকি পিয়ার মে, বাত কারনে মুঝে মুশকিল, হাম না জানে কিস জাহান পে খো গিয়ে, হুতুনছে চুন লো তুম, আজ জানে কি জিদ না কারো, আমার যাবার সময় হল। এবং শ্রদ্ধেয় মোস্তফা জামান আব্বাসী গেয়েছেন – মেরি দোস্তানি হাসরাতে, লাগতা নাহি হে জি মেরা, ইয়াদ আয়ি কি না আয়ি তোমারি (মনে রবে কিনা রবে আমারে), ওরে ও সাজনা ভি (কোনদিন আসিবেন বন্ধু কইয়া যাও রে), মোহাব্বত কারনে ওয়ালে, তেরা খেয়াল ইত্যাদি।

মোস্তফা জামান আব্বাসী এবং সামিরা আব্বাসী -র গজল সন্ধ্যা যেন এক স্মরণীয় সুর বিতান। জনাব মোস্তফা জামান আব্বাসী একাধিক গুণে নন্দিত তিনি গায়ক এবং লেখক হিসেবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে লক্ষ লক্ষ শ্রোতার নিকট পরিচিত। তিমি একজন পণ্ডিত-সুরকার-সমাজকর্মী। ওনার লেখা সঙ্গীত, দর্শন, জীবনী, ভ্রমণ কাহিনী থেকে নানারকম বিষয়ে জানা যায়। তিনি এগারো বছর ধরে জাতীয় সঙ্গীত সমিতির সভাপতি ছিলেন। ছিলেন মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জেলা গভর্নর, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল। বর্তমানে তিনি সিনিয়র রিসার্চ স্কলার হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমেদ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি সেন্টার, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান এবং অন্যদের কাছ থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মধ্যে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। মোস্তফা জামান আব্বাসী বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি জনপ্রিয় গায়ক, সংগীত ও সুফিবাদের উপর বিশ্লেষক। তিনি ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, কোরিয়া, মিয়ানমার, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, লিবিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক ও তুরস্ক সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন – পেয়েছেন “একুশে পদক” ১৯৯৫ সালে, সামাজিক অবদানের জন্য অ্যাপেক্স ফাউন্ডেশন পুরস্কার। বাংলার শতবার্ষিকী পুরস্কার একজন লেখক এবং গায়ক হিসেবে, সঙ্গীতের জন্য আব্বাসউদ্দীন স্বর্ণপদক (চট্টগ্রাম)। সাংবাদিকতা, সঙ্গীত এর জন্য চ্যানেল আই পুরস্কার। গান ও লেখার জন্য ২০১১ তে রবির সম্মাননা। এছাড়াও নজরুল একাডেমি পুরস্কার, প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল বিজয়ী ওনাকে ২০১০ এ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সেরা লেখক হিসেবে প্রশংসিত করেন।
সামিরা আব্বাসী, মুস্তাফা জামান আব্বাসী কন্যা এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদের নাতনি, ওস্তাদ আখতার, ওস্তাদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীর অধীনে হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল ভোকাল প্রশিক্ষণ. বর্তমানে তিনি পাতিয়ালা ঘরানার পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী প্রবাসী। সামিরা আব্বাসী একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন শিকাগো-তে ‘আব্বাসউদ্দীন একাডেমী’। তিনি কলকাতা, প্যারিস, সিঙ্গাপুর, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহর সহ দুইশত উপর কনসার্টে অংশগ্রহন করেছেন। সামিরা ২০০৭ সালে গজল এর উপর তার প্রথম এ্যালবাম মুক্তি পায়। এবং ২০১১ সালে নজরুল সঙ্গীতের একটি এ্যালবাম প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় টেলিভিশন এবং রেডিও-র নিয়মিত শিল্পী। ২০১০ সালে তিনি সঙ্গীতে অবদানের জন্য ‘ফোল্ডার কবিতা গ্রুপ’ এর পুরস্কার লাভ করেন। সঙ্গীতের জন্য তার প্রেম ও ভালোবাসা অপরিসীম। এছাড়া সামিরা একজন পরিবেশ প্রকৌশলী ও লেখক। তাঁর ইংরেজি কবিতা, বাংলা গদ্য ও অনুবাদের বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জনস হপকিন্স এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার স্নাতক সম্পন্ন এবং বর্তমানে দক্ষিণ ফ্লোরিডায় বাস করেন।
অলংকরন – গোলাম সাকলাইন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: