ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৫ (তৃতীয় দিন) – লোকজ সুরের জাদুতে উৎসবের সমাপ্তি…

মঞ্চ প্রস্তুত। সবাই অপেক্ষায় তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক ফোকফেস্টের মধ্যমণি পাকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পী আবিদা পারভীনের জন্য। একটু পরেই ঘোষণা এলো,
আসছেন সিন্ধু প্রদেশের খ্যাতিমান এই শিল্পী। পুরো আর্মি স্টেডিয়াম করতালি আর চিৎকারে ফেটে পড়ল। মঞ্চে এলেন আবিদা পারভীন।সুফি, গজল ও লোকগানের জীবন কিংবদন্তি এই শিল্পী সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করলেন তার পরিবেশনা ‘আলি মওলা মওলা’। প্রথম গানেই মাত। সবার
কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেল দরগা বা ওরসে যে সুফি গান গাওয়া হয়ে থাকে তার পুরোটাই আছে আবিদা পারভীনের কণ্ঠে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতের ওপর বিশাল দখল। এরপর পরিবেশন করলেন ‘ইয়ার তো হামনে যাব যা দেখা’, ‘তেরে ইশক নাচায়া’ ও ‘আলী আলী দম আলী আলী’। অস্থিরতার এই সময়ে
তার গানগুলো যেন এক স্বর্গীয় পরশ বুলিয়ে দিল। শেষ করলেন অসম্ভব জনপ্রিয় পাঞ্জাবি লোকগান ‘দমাদম মাস্তকালান্দার গানটি গেয়ে।

শিল্পীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরপর ভারতের রাজস্থানের মাঙ্গানিয়াস তাদের লোকগান পরিবেশন করলেও মূলতঃ আবিদা পারভীনের পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় প্রথমবারের মতো আয়োজিত লোকসঙ্গীত উৎসবের এই আসর। লোকসঙ্গীত মানেই মাটির কথা, শেকড়ের কথা। তার সঙ্গে লোকজ যন্ত্র একতারা, দোতারা, বায়া, বাঁশি, খমক, খঞ্জনি, মন্দিরাযোগে যখন শিল্পী গান ধরেন তখন আকাশ বাতাসও যেন দুলতে থাকে। আর শ্রোতার হৃদয়ে নাচন সে তো এমিনতেই এসে যায়। এ গান যেন বারবার ফিরে আসে।
12শনিবার আর্মি স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্টের সমাপনী দিনে গানের দোলটা শুরু হয় অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই। সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়ার একটু আগেই স্টেজের ঝলমলে রঙিন আলোর ঝলকানির দেখা মেলে। হেমন্তের রাতের এই শেষ আয়োজনের শুরুতেই মঞ্চে আসে বাংলাদেশের এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফোক ফিউশন ব্যান্ড জলের গান। আমাদের শেকড়ের ছবি, জীবনের গল্প ধারণ করে পরিচিত ও অপরিচিত সব বাদ্যযন্ত্র দিয়ে গান করে তারা। শুরুতেই তারা পরিবেশন করে পাখি নিয়ে গান ‘শুঁয়া যাও যাও গো যাওরে তেপান্তর’। প্রথম গানেই দর্শকদের মাত করে তারা। দ্বিতীয় গান ফুলকে নিয়ে ‘বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি’। এরপর একে একে পরিবেশন করেন ‘এই পাগলের ভালোবাসাটুকু নিও’, ‘আমি একটা পাতার ছবি আঁকি’ গানগুলো। ডি এল রায়ের বিখ্যাত গান ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটি গেয়ে তারা শেষ করেন তাদের পরিবেশনা।
পাহাড়, প্রকৃতি আর অরণ্যের এক অপার ভূমির দেশ আয়ারল্যান্ড। তাদের লোকসঙ্গীতের নিজস্ব একটা ধারা আছে। ফোকফেস্টের শেষদিনের দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল আয়ারল্যান্ডের শিল্পী নিয়াভ নি কারার। মঞ্চে এসেই তিনি আগত দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, সাত হাজার মাইল দূর থেকে আমরা গান শোনাতে এসেছি। বেহালা, এ্যকুস্টিক গিটার ও ড্রামসের সুরে তারা আইরিশ লোকজ সঙ্গীতের একটি ইন্সট্রুমেন্টাল দিয়ে শুরু করেন তাদের পরিবেশনা। এরপর আইরিশ ভাষায় পরিবেশন করেন ‘মাইন’ গানটি যার মূল বক্তব্য হচ্ছে একজন তরুণকে নিয়ে যার ভালোবাসার মানুষ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। গানের সঙ্গে সঙ্গে নিকারা নেচেছেনও বেশ। এই গানের শেষে আবার একটা ইন্সট্রুমেন্টাল। তারপর আইরিশ ভাষায় আরেকটা প্রেমের গান যার বক্তব্যে রয়েছে একজন তরুণের কথা যিনি এক বয়স্ক নারীর প্রেমে পড়েছেন। নিকারা তার বেহালার সুরে মাতিয়ে স্টেজ থেকে বিদায় নেন।14
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে ছিল কিছু আনুষ্ঠানিকতা। মেরিল নিবেদিত এবং মাছরাঙা টেলিভিশন ও সান ইভেন্টসের যৌথ আয়োজনে প্রথম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট ২০১৫-এর সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার অঞ্জন চৌধুরী। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘গত শুক্রবার ফ্রান্সে একটি কনসার্টে হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা গান পছন্দ করে না, তারা মানুষ খুন করতে পারে, এ কথাটি আজ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, এই ফোক উৎসবই প্রমাণ করে, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। আমাদের লোকগান গ্রহ-নক্ষত্রময় আকাশের মতো। বর্তমানে লোকগানের ফিউশন হচ্ছে, আমি ফিউশনবিরোধী নই, তবে লোকগানের আদি ধারাকে রক্ষা করতে হবে। লোকসঙ্গীতের আদি যন্ত্র রক্ষা করতে হবে’। আবুল খায়ের লিটু বলেন, ‘এ ধরনের উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে আমরা মানুষের মনন তৈরির চেষ্টা করছি। এখানে সমাজের সব শ্রেণীর লোক একসঙ্গে গান শুনছে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে সমাজের শ্রেণীবৈষম্য কমানোই আমাদের উদ্দেশ্য’। অঞ্জন চৌধুরী বলেন, ‘তিন দিনের এই আয়োজন শ্রোতাদের সহযোগিতায় সফল হয়েছে। আমরা আগামী বছরও এই উৎসব আয়োজনের চেষ্টা করব’।
এরপর আবার গানের পালা। এ পর্যায়ে মঞ্চে আসে ভারতের লোকসঙ্গীত গানের দল ইন্ডিয়ান ওশেন। তারা দক্ষিণ ভারতে একটি লোকগান দিয়ে তাদের পরিবেশনা শুরু করে। এরপর পরিবেশন করেন ‘আরে রুখজানে বন্দে’ গানটি। এছাড়াও তারা ফোক ঘরানার বেশকিছু গান পরিবেশন করেন। ইন্ডিয়ান ওশেনের পর মঞ্চে আসেন ভারতের শিল্পী পার্বতী বাউল। তার পরিবেশনা শুরু করেন ‘ঘিরি ঘিরি ঘিরি নাচে’ গানটি দিয়ে। তিনি মূলত কীর্তনের ঢংয়ে রাধা কৃষ্ণের প্রেমাখ্যান পরিবেশন করেন। তার অন্যতম পরিবেশনার মধ্যে ছিল ‘পুজিতে শ্যাম নটরাজে’, ‘চোখ গেল চোখ গেল পাখি’, ‘আমি কালো রূপ আর হেরবো না’।

ছবি – গোলাম মাহবুব শাহরিয়ার…

অলংকরন – মাসরিফ হক….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: