ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট ২০১৫ (প্রথম দিন) – লোকজ সুরের মায়াজালে মুগ্ধ ঢাকা…

ঘড়ির কাটায় তখন রাত ১২টা বেজে ১ মিনিট। আর্মি স্টেডিয়াম মাঠে লোক সমাগম দেখে বুঝার উপায় নেই যে মধ্যরাত হয়ে গেছে। সুরের মোহজালে সবাই
এতটাই নিবিষ্ট হয়েছেন যে রাত কতটা হলো সেদিকে কারোই দৃষ্টি নেই। লোকসঙ্গীতের সুধা পান করতে তখনও প্রায় ৩০ হাজার দর্শক-শ্রোতা অপেক্ষা করছেন পরবর্তী শিল্পীর জন্য। মঞ্চে এলেন পাকিস্তানে শিল্পী সাঁই জহুর। ‘আল্লাহু আল্লাহু’ বলে ডাক দিতেই আবার সুরের সাগরে ভাসতে শুরু করলেন সবাই। একে
একে পরিবেশন করেন শিল্পীর জনপ্রিয় সব গান। সব শেষে মধ্যরাতে শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দেন ভারতের পাপন ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যান্ড দলটি। লোকসঙ্গীত আমাদের শেকড়, আমাদের প্রাণ। ইট পাথরের এই শহরে জারি, সারি, মুর্শিদী, লালন সাঁই, হাছন রাজা, আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলিম, শাহ আব্দুল করিমের গানের হয়তো অনেক ভক্ত আছে কিন্তু তাদের সেই গানগুলো সেভাবে শুনবার সুযোগ কই! বয়সে তরুণ হলে টিএসসি বা চারুকালয় বসে বন্ধুদের সাথে
সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে সেই গানগুলো কিছুক্ষন হয়তো গাওয়া বা শোনা হয়। আর যাদের সেই সুযোগ নেই তারা হয়তো কম্পিউটারে বা সিডি প্লেয়ারে গানগুলো
শুনে থাকেন। কিন্তু লোকসঙ্গীত শুনার আসল আনন্দ হচ্ছে খোলা মাঠে প্রকৃতির মাঝে। আর ঢাকার মানুষ গতকালই প্রথমবারেই মতো সেই রকম একটি
লোকসঙ্গীত উৎসবের স্বাদ নেয়ার সুযোগ পেলেন যেখানে খোলা মাঠে বসেছে লোকজ সঙ্গীত শিল্পীদের মিলনমেলা। মেরিল নিবেদিত ও মাছরাঙ্গা টেলিভিশন এবং সান ইভেন্টস আয়োজিত ‘ঢাকা ইন্টান্যাশনাল ফোক ফেস্ট-২০১৫’-এ তিনদিনের লোকসঙ্গীত উৎসবের শুরুটা হয়েছে মিনু হক ও পল্লবী ড্যান্স গ্রুপের অসাধারণ নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে। ‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে’, ‘টেউ খেলানি দিয়া নাচে গোলাপি, ‘তোর মাদলেরই তালে আমার মন ঝুমুর নাচে উঠলো মেতে’ এমনি সব নাচের সঙ্গে নেচে গেয়ে মাতিয়ে তোলেন পুরো উৎসবস্থল।

6নাচের শেষে গান পরিবেশন করতে আসেন লালন সম্রাজ্ঞীখ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীন। পরিবেশনার শুরুতেই তিনি ‘পাড়ে লয়ে যাও আমায়’ গানটি গেয়ে শোনান। তার কন্ঠমাধুর্য দিয়ে তিনি সবাইকে মোহাবিষ্ট করেন। গান শেষে চারিদিকে শুধুই করতালির আওয়াজ। এরপর তিনি একে একে পরিবেশন করেন ‘মিলন হবে কত দিনে’ ও ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। প্রিয় শিল্পীর গান এভাবে লাইভ শুনতে পেয়ে অনেক শিল্পী আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। ফরিদা পারভীনের পরিবেশনা শেষে তিনদিনব্যাপী এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। উদ্বোধনী পর্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী ফেরদৌসী রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মাছরাঙ্গা টেলিভিশন ও সান ইভেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী আব্দুল মুহিত বলেন, ‘সঙ্গীতের প্রতি আমাদের যে আকর্ষন তা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। লোকসঙ্গীতে এক ধরনের আন্তজার্তিক সমতা রয়েছে। কিছুদিন আগে আজারবাইজানে এমনই এক লোকসঙ্গীত উৎসবে গিয়েচিলাম। সেখানে গান ও নাচ দেখে আমাদের নিজস্ব লোকসঙ্গীতের কথাই মনে পড়ে যায়’। স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘লোকসঙ্গীত বাংলার গানের আদি ঠিকানা।
ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, জারি, সারি, মুর্শিদা, বিচ্ছেদী প্রভৃতি বাংলার জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার অন্তরের গান। এই গানকে আমরা বড় অবহেলা করেছি। এই লোকসঙ্গীত এখন ব্রাত্য হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমগুলোতেও লোকসঙ্গীতের স্থান কমে গেছে। ফলে যারা গ্রামে এই লোকসঙ্গীতের চর্চা করেন তাদের সঙ্গে শহরের সঙ্গীতধারার যোগ ঘটছে না’। মাছরাঙ্গা টেলিভিশন ও সান ইভেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী বলেন, ‘স্কয়ার বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান। আমাদের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন দেশীয় অঙ্গনে সেবা দিচ্ছে তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রয়েছে। ফোক ফেস্ট যেমন স্কয়ারের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হলো, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উৎসবও স্কয়ার পৃষ্ঠপোষকতা করছে’।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে আবার সঙ্গীতের পালা। সুরের কাছে সমর্পিত গানপ্রেমীদের আগমনে উৎসব প্রাঙ্গণটি একসময় যেন হয়ে ওঠে মহাসঙ্গীতযজ্ঞ। আর এই সুরের
সাগরে উপস্থিত হয়েছিলেন একেবারে তরুণ থেকে মধ্যবয়সী পেরিয়ে বয়স্ক সঙ্গীতানুরাগীও। সুরের মায়াজালে  ঘুচে গিয়েছিল বয়সের সীমারেখা। দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চে আসেন শিল্পী চন্দনা মজুমদার ও কিরণ চন্দ্র রায়। লালনের ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ গানটি গেয়ে পরিবেশনা শুরু করেন চন্দনা। প্রথম গানেই শ্রোতাকে আলোড়িত করেন এই শিল্পী। এরপর পরিবেশন করেন বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের গান ‘সোনা বন্ধুরে ভ্ইুলো না আমারে’ ও রাধারমণের ‘জলে যাইও নাগো রাই’। কিরণ চন্দ্রে রায়ের পরিবেশনা শুরু হয় ‘আয় দেখে যা জগতবাসী বাংলাদেশ ঘুরে’ গানটি দিয়ে। তিনিও শ্রোতাদের মাতিয়ে একে একে গেয়ে পরিবেশন করেন ‘আমার মন তো বসে না  গৃহকাজে/অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’ ও ‘আমার ভিতরে-বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয়জুড়ে’।

25তাদের মাটির গানে যেন ফিরে আসে নবপ্রাণের জোয়ার। এর পর মঞ্চে আসেন ভারতের লোকগানের দল অর্ক মুখার্জী কালেক্টিভ। ফিউশন আঙ্গিকে লোকসঙ্গীত
পরিবেশন করে দলটি। তাদের পরিবেশনার মধ্যে ছিল ‘ও সে এক রসিক পাগল’, ‘দুয়ারে আাইসাছে পালকি/নাইওরিগো তোলো’, ‘আল্লাহ ম্যাঘ দে পানি দে ছায়া
দেরে তুই’, ‘খাজা বাবা খাজা বাবা/মারহাবা মারহাবা’, ‘তুমি জানো নারে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা’ সহ বেশ কিছু গান। এরপর লাবিক কামালের সঙ্গে
মঞ্চে আসেন রব ফকির ও শফি মন্ডল। তিন শিল্পীর পরিবেশনাটিও ছিল দারুণ উপভোগ্য। তবে আয়োজনটি অনন্য হলেও আয়োজকদের অব্যবস্থাপনার কারণে
ফিরে গেছেন অনেক শ্রোতা। নিবন্ধনের সময় শ্রোতারা ব্যাগ নিয়ে উৎসবস্থলে প্রবেশ করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা ছিল না। তাই কর্মস্থল
থেকে ব্যাগ নিয়ে সরাসরি চলে আসেন উৎসব আঙিনায়। এমন শ্রোতাদের আটকে দেওয়া হয় প্রবেশদ্বারে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ফিরে গিয়েছেন বাড়িতে। যদিও নারী দর্শক কিংবা শ্রোতারা ব্যাগসহই প্রবেশ করেছেন উৎসবস্থলে।

ছবি – গোলাম মাহবুব শাহরিয়ার…

অলংকরন – মাসরিফ হক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: