সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হলেন কিংবদন্তী ‘ফোকরক’ শিল্পী এবং গীতিকার “বব ডিলান”…

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় কিংবদন্তি ফোক রক, রক, ব্লুজ, কান্ট্রি সঙ্গীত গায়ক এবং গীতিকার বব ডিলান এ বছর সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন। গত ১৩ই অক্টোবর, ২০১৬ তে সুইডিশ একাডেমী তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। নোবেলের ১১২ বছরের ইতিহাসে এ পুরস্কারজয়ী প্রথম সংগীত শিল্পী ও গীতিকার তিনি। আগামীকাল ১০ই ডিসেম্বর স্টকহোমে ডিলানকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। ৭৫ বছর এই গায়ক-গীতিকারকে মার্কিন সঙ্গীতের ধারায় ‘কাব্যের সংযোজন ঘটানোর’ কৃতিত্বের জন্য এই সম্মান দেওয়া হবে।
বেশ অনেক বছর ধরে তাকে নোবেল পুরস্কারে, পুরস্কৃত করা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছিলো। তবে যে একজন রক গায়ককে সুইডিশ একাডেমী উক্ত পুরস্কারে ভূষিত করবেন, তা নিয়ে সত্যিই সন্দেহ ছিলো। এর আগে শেষবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৯৩ সালে, ঔপন্যাসিক টনি মরিসন। দশকের পর দশক ধরে বব ডিলানের গান বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষকে বিমোহিত করেছে।

বব ডিলান একজন সুবিখ্যাত গায়ক, গীতিকার, সুরকার, ডিস্ক জকি, এবং একই সঙ্গে একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর। যিনি ১৯৬০-এর দশক থেকে পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে জনপ্রিয় ধারার মার্কন সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ডিলানের শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে অনেকগুলো ১৯৬০ দশকে রচিত হয়েছে। এসময় তিনি আমেরিকান অস্থিরতার প্রতীক বিবেচিত হতেন। তার কিছু গান, যেমন “Blowin’ in the Wind” and “The Times They Are a-Changin'”, যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ১৯৫৫-১৯৬৮ সালের আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাঁর সর্বশেষ অ্যালবা‍ম, ছিল Christmas In The Heart(২০০৯)। “রোলিং স্টোন” ম্যাগাজিন একে পরবর্তীকালে বর্ষসেরা এ্যালবাম হিসেবে সম্মানিত করেছে।
ডিলনের প্রথমদিককার গানের কথা ছিল মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাব সম্বলিত। এগুলো তখনকার জনপ্রিয় ধারার কথিত নিয়ম বহির্ভূত ছিল এবং এ ধারার বিপরীত হিসেবে ধরা হত। নিজস্ব সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষন অনুভব করেছেন। তিনি আমেরিকান লোকগীতি ও কান্ট্রি/ব্লুজ থেকে রক অ্যান্ড রোল, ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ সঙ্গীত, সুইং, ব্রডওয়ে, হার্ডরক এবং গসপেলও গেয়েছেন।

ডিলন সাধারণত গিটার, কিবোর্ড এবং হারমোনিকা বাজিয়ে গান করেন। ১৯৮০ দশক থেকে কিছু সংগীতজ্ঞকে সাথে নিয়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সঙ্গীত ভ্রমণ করে থাকেন যা তার ভাষায় “নেভার এন্ডিং ট্যুর”। তিনি প্রধান অনেক শিল্পীর সাথে একত্রে কাজ করেছেন, যেমন, দ্য ব্যান্ড, টম পেটি, জোয়ান বায়েজ, জর্জ হ্যারিসন, দ্য গ্রেটফুল ডেড, জনি ক্যাশ, উইলি নেলসন, পল সিমন, এরিক ক্ল্যাপটন, প্যাটি স্মিথ, ইউ টু, দ্য রোলিং স্টোনস, জনি মিচেল, জ্যাক হোয়াইট, মার্লে হ্যাগার্ড, নেইল ইয়ং, ভ্যান মরিসন, রিঙ্গো স্টার এবং স্টিভি নিকস। যদিও তার ক্যারিয়ারে গায়ক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত এবং সফল হয়েছেন, তবে গীতিকার হিসেবেই তার অবদানকে বেশি মূল্য দেয়া হয়।

তার রেকর্ডের ফলে তিনি গ্রামি এ্যাডওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব এবং অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছেন এবং রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম, ন্যাশভিল সংরাইটার্স হল অব ফেম, ও সংরাইটার্স হল অব ফেম এ তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রকাশিত বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় তার নাম রয়েছে। ২০০৪ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন প্রকাশিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ১০০ গায়ক তালিকায় দ্য বিটলসের পর বব ডিলন দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছেন। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ডিলনকে ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং কর্তৃক কমান্ডার দেস আর্টস এট দেস লেটার্স উপাধিতে ভুষিত করেছেন; ২০০০ সালে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব মিউজিক তাকে পোলার মিউজিক পুরস্কার প্রদান করে এবং ২০০৭ সালে ডিলনকে সংস্কৃতিতে প্রিন্স অব অস্ট্রিয়াস পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।

ডিলান প্রায় ৫০ বছর ধরে সংগীত জগতে সক্রিয়৷ তাঁর প্রায় সব গানই ইউটিউবে দেখা হয়েছে কয়েক লক্ষ বার৷ আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে ডিলানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে৷ সুইডিশ অ্যাকাডেমি বলছে, ‘অ্যামেরিকার সংগীত ধারায় নতুন কাব‌্যিক দ‌্যোতনা সৃষ্টির’ জন‌্য রক, ফোক, কান্ট্রি মিউজিকের এই কিংবদন্তিকে, নোবেল পুরস্কারের জন‌্য বেছে নেয়া হয়েছে৷ পুরস্কার হিসেবে তিনি উপহার পাবেন ৮০ লাখ ক্রোনার। – শাহারিয়ার হাসান…
অলংকরন – গোলাম সাকলাইন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: