তুমি ছিলে সুরের মণিহার…

“একটি জীবনের, একটি মনের আলোয় যখন ভুবন আলোকিত হয় তখনি হয় একটি জীবনের সার্থকতা। শ্রদ্ধেয় লাকী আখান্দ ছিলেন সুরের ভুবনে এক সুরের বরপুত্র। যার সুরের আলোয়, গানের আলোয় আলোকিত হয়েছে বাংলা সঙ্গীতের ভুবন। একটি পরিবার এর বাবা হলো পরিবারটির শক্তি, তিনি অভিভাবক, এবং মাথার উপর স্নেহের ছাঁয়া। বাবা মারা গেলে যেমন সংসার এবং পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে, শান্তি-শাসন, সুন্দর্য-আলো হারাতে শুরু করে তেমনি এদেশের সঙ্গীতাঙ্গনও একটি পরিবার। এদেশের অসংখ্য গুণী অভিভাবক, পিতা সমতুল্য সঙ্গীতজ্ঞদের মতো লাকী আখান্দও ছিলেন সবার মধ্যমণি, অভিভাবক এবং শিক্ষক।

সবাইকে চিরশোক অশ্রুজলে ভাসিয়ে এভাবে চির বিদায় নিবেন এই প্রিয় মানুষটি কেউ কখনো ভাবতে পারেনি।
সহসা সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। নিভে গেলো সুরের ভুবন থেকে একটি সুরের প্রদীপ।
গত ২১ এপ্রিল জীবনের সাথে মহা যুদ্ধ করে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন শ্রদ্ধেয় লাকী আখান্দ। প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর এই মহাস্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং তা মেনে নিতে হবে আপনমনে।

শ্রদ্ধেয় লাকী আখান্দ ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৫ বছর বয়সেই তিনি তার বাবার কাছ থেকে সঙ্গীত বিষয়ে হাতেখড়ি নেন। তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশন এবং রেডিওতে শিশু শিল্পী হিসেবে সঙ্গীত বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সেই এইচএমভি পাকিস্তানের সুরকার এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিজের নাম যুক্ত করেন।

১৯৭৫ সালে লাকী আখান্দ তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের একটি এ্যালবামের সঙ্গীতায়োজন করেন। এ্যালবামটিতে “আবার এলো যে সন্ধ্যা” ও “কে বাঁশি বাজায়রে” গানে কণ্ঠ দেন হ্যাপী আখন্দ, “স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে” ও “পাহাড়ি ঝর্ণা” গানে কণ্ঠ দেন হ্যাপী ও লাকী দুজনে, এবং লাকী আখান্দ নিজে “নীল নীল শাড়ি পরে” ও “হঠাৎ করে বাংলাদেশ” গানে কণ্ঠ দেন। লাকী আখান্দ ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এই চলচ্চিত্রে হ্যাপী আখন্দের পূর্বের এ্যালবাম এর “আবার এলো যে সন্ধ্যা” গানটি ব্যবহৃত হয় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৮৪ সালে তিনি তাঁর প্রথম একক এ্যালবাম লাকী আখান্দ প্রকাশ করেন। এ্যালবামটি সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয়। এই এ্যালবাম এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান হল “আগে যদি জানতাম”, “আমায় ডেকোনা”, “মামুনিয়া”, “এই নীল মনিহার”, ও “হৃদয় আমার”।

আখান্দের সঙ্গীতচর্চা বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দ ১৯৮৭ সালে মারা যাওয়ার পর। তিনি প্রায় এক যুগ পরে ১৯৯৮ সালে ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ এ্যালবাম এর সঙ্গীতায়োজনের মাধ্যমে গানের ভুবনে ফিরে আসেন। পরিচয় কবে হবে ছিল তাঁর দ্বিতীয় একক এ্যালবাম এবং হ্যাপী আখন্দের একক এ্যালবাম শেষ উপহার-এর রিমেক। বিতৃষ্ণা জীবনে আমার ছিল ব্যান্ড ও আধুনিক গানের মিশ্র এ্যালবাম । এতে সেসময়ের ছয়জন জনপ্রিয় গায়ক, মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, ও সামিনা চৌধুরী কণ্ঠ দেন। একই বছর তিনি সামিনা চৌধুরীকে নিয়ে আনন্দ চোখ নামে একটি দ্বৈত এ্যালবাম প্রকাশ করেন। গোলাম মোরশেদের গীতে এবং লাকী আখান্দের সঙ্গীতায়োজনে এ্যালবামটি প্রকাশ করে সাউন্ডটেক। এতে ১২টি গান ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান ছিল “কাল কি যে দিন ছিল”, “বলো কে পারে”
ও “এই বর্ষা রাতে”। পরের বছর লাকী আখান্দ সামিনা চৌধুরীর একক এ্যালবাম ‘আমায় ডেকোনা’র সঙ্গীতায়োজন করেন। এছাড়া তিনি ব্যান্ডদল আর্কের “হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা” গানের সুর করেন। ২০০০ সালের পর তিনি আরেকটি মিশ্র এ্যালবাম ‘তোমার অরণ্যে’র সুর ও সঙ্গীতায়োজন করেন। এতে লাকী আখান্দের কণ্ঠে গাওয়া ৩টি গানসহ বাপ্পা মজুমদার, ফাহমিদা নবী, ও নিপুর কণ্ঠে ১০টি গান ছিল। তিনি এই এ্যালবামে সমকালীন তাল, লোক গানের তাল ও তার প্রিয় স্পেনীয় গানের তাল ব্যবহার করেন।

তিনি তার বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে অল্পসংখ্যক গান করেছেন। কিন্তু যা করেছেন সবই কালজয়ী। উনার গানের মধ্যে জনপ্রিয় গান গুলো-

♪ এই নীল মণিহার
♪ আগে যদি জানতাম
♪ আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে
♪ আমায় ডেকোনা ফেরানো যাবেনা
♪ যেখানে সীমান্ত তোমার
♪ আবার এলোযে সন্ধ্যা
♪ কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে
♪ লিখতে পারিনা কোন গান
♪ বিতৃষ্ণা জীবনে আমার
♪ ভালোবেসে চলে যেওনা
♪ কি করে বললে তুমি
♪ মামুনীয়া
উনার এ্যালবাম গুলো-

লাকী আখান্দ (১৯৮৪)
পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮)
বিতৃষ্ণা জীবনে আমার (১৯৯৮)
আনন্দ চোখ (১৯৯৯)
আমায় ডেকোনা (১৯৯৯)
দেখা হবে বন্ধু (১৯৯৯)

তিনি গানকে ভালোবেসে পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।

লাকী আখন্দ দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি নিজের আর্মানিটোলার বাসাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্মরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে সঙ্গীতাঙ্গন সহ শ্রোতাদের মাঝেও শোক বিরাজ করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থানে শ্রদ্ধেয় লাকী আখান্দের সমাধি স্থাপন করা হয়েছে।
ভালোবাসা এবং সুর গুলো রয়ে গেছে আগের মতোই, শুধু মানুষটি নেই।
একজন লাকী আখান্দ এভাবে আর আসবে না, যিনি বুকে টেনে নিয়ে একটি সুরের বিশুদ্ধ পথ দেখাতেন।
আমরা ভুলতে পারিনা, ভুলবো না কখনো।
তুমি ছিলে সুরের মণিহার।।
অলংকরন – গোলাম সাকলাইন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: