“রাগে অনুরাগে” – রাগাশ্রয়ী পঞ্চ কবীর গান…

সঙ্গীত পরিচালনায় : প্রত্যূষ বন্দ্যোপাধ্যায়……

বাংলার পঞ্চকবির গান নিয়ে সিডি প্রকাশনা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। তবে যখন তা শুদ্ধ সঙ্গীতের বিন্যাসে প্রকাশিত হয় তখন তাতে নতুন মাত্রা যোগ হয় বৈকি। রাগ সঙ্গীত নিয়ে কাজ আমাদের দেশে খুব বেশি দেখা যায়না। সেই কথা বললে লেসার ভিশন কে অবশ্যই সাধু বাদ জানাতে হয় “রাগে অনুরাগে” এ্যালবামটির জন্য। আমাদের বহুল শ্রুত কিছু গান নতুন ভাবে এতে উপস্থাপন করা হয়েছে। যে রাগের উপর গানগুলো সুরারপিত হয়েছে, গানগুলোর সাথে সেই রাগের বন্দিশ, বিস্তার, সারগাম, তান, তারানা সহ একটি পূর্নাঙ্গ খেয়াল এতে পরিবেশন করা হয়েছে। এ্যালবাম এর প্রথম ট্র্যাক ভোরবেলার রাগ আহীর ভৈরব এ রচিত কাজী নজরুল ইসলাম এর “অরুনকান্তি কে গো যোগী ভিখারী”। গানটি পরিবেশন করেন সুপ্রিয়া দাস। এর পরে একই রাগের বন্দীশ “কায়সে কে কার আও” খেয়াল পরিবেশন করেন শর্মিলা মজুমদার। গান থেকে খেয়াল এ উত্তীর্ন হবার সময় খুব চমৎকার ভাবে সেতার পরিবেশিত হয়। এ এ্যালবামে সেতার বাজিয়েছেন রাহুল চ্যাটার্জী। দ্বিতীয় ট্র্যাক শুরু হয়েছে রাগ বেহাগ এর ঠুমরী “পালা মোরে মোরে মানাকে” দিয়ে। গেয়েছেন প্রিয়াংকা দাস তিথি। খুব মিষ্টি কন্ঠের অধিকারি তিথি খুব মুনশিয়ানার সাথে পরিবেশন করেন এ মিষ্টি রাগটি। তারপরেই সারেঙ্গী কে সাথি করে বর্ষা মজুমদার পাপড়ি গেয়ে ওঠেন মিষ্টি বেহাগ এর উপর রচিত রজনিকান্ত সেন এর “মধুর সে মুখখানি”। খুব দরদের সাথে পরিবেশন করেন গানটি। এ এ্যালবামে সারেঙ্গী পরিবেশন করেছেন দেবাশীষ হালদার। গান শেষে তবলার বোল এর ঝড় তোলেন জয় নন্দী। শুরু হয় তারানা। এক সাথে খুব চমৎকার ভাবে পরিবেশন করেন তিথি এবং বর্ষা। একটু নতুন আঙ্গিকে তেহাই এ হারমোনাইজ করে শেষ করেন দু’জন। তৃতীয় ট্র্যাক শুরু হয় রাগ খাম্বাজ এর উপর গঠিত ঠুমরী “কাহে কারাতা মোসে”। পরিবেশন করেন সুপ্রিয়া। খুবই শ্রুতিমধুর ভাবে পরিবেশন করেন তিনি। এরপর সেতার ও গিটার দিয়ে খুব সুন্দর করে শুরু হয় এ রাগের উপর রচিত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এর “আজি গাও মহাগীত”। গেয়েছেন তিথি। এই ঠুমরী ও গানের মধ্য দিয়ে রাগ খাম্বাজের বিচিত্র রুপখানি প্রকাশিত হয়েছে। কখনো অভিমানী রূপ তো কখনো উল্লাসিত। এ এ্যালবামে গীটার এ সঙ্গত করেছেন রাজা চৌধুরী। তবলা ও খোলের ব্যবহারও এর মধ্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এর পরে চতূর্থ ট্র্যাক হারমোনিয়াম ও সেতার দিয়ে শুরু হয় রাগ কাফীর ওপর দোল উৎসব নিয়ে রচিত অতুল প্রসাদ এর “মধুকালে এল হোলি”। গেয়েছেন শর্মিলা। কন্ঠের কাজগুলো খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। এর পরে বাঁশি দিয়ে শুরু হয় ভজন “সাধা গোবিন্দ কে গুন গাওয়া”। গেয়েছেন বর্ষা। এ এ্যালবামে বাঁশি বাজিয়েছেন বুবাই নন্দী। এখানে রাগ কাফীর উচ্ছলতা ও ঈশ্বরের আরাধোনার গভীর রূপ ধরা দিয়েছে। এ্যালবামের শেষ ট্র্যাক এ রয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাগ ভূপালী তে রচিত “প্রচন্ড গর্জনে”। এ গানে পাখোয়াজ, মৃদঙ্গ ও তবলার ব্যবহার লক্ষনীয়। সম্মিলিত ভাবে গেয়েছেন এ্যালবামের সকল শিল্পী শর্মিলা, বর্ষা, তিথি ও সুপ্রিয়া। এর পরেই মুখে তবলার বোল এর সরগম দিয়ে শুরু করেন বন্দিশ। খুব উচ্ছশিত ভাবে সবাই পরিবেশন করেন ভুপালি রাগের চতুরঙ্গ। ঝড়ের আভাস তুলে শেষ করেন এ্যালবাম এর শেষ পরিবেশনা। এক কথায় অপূর্ব এ এ্যালবামের চিন্তাধারা ও কার্যকারিতা। নতুন প্রজন্মের কাছে শুদ্ধ সঙ্গীত কে তুলে ধরার এ এক অনন্য প্রয়াস। অনেকেই শুদ্ধ সঙ্গীতের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেন না। কিন্তু রাগের বান্দিস এর সাথে আমাদের চির চেনা কিছু গান মনে করিয়ে দেবে যে শুদ্ধ সঙ্গীতের চলন সবসময় আমাদের সাথে রয়েছে। পরিস্কার পরিবেশনা, রাগ সঙ্গীতের মূল ধারা কে অক্ষুণ্ণ রাখা সহ শ্রুতিমধুর ভাবে সঙ্গীত পরিবেশন করার জন্য শিল্পীদের জানাই অভিনন্দন। বলার মধ্যে শুধু বলতে হয় যে রাগ সঙ্গীত পরিবেশন এর সময় হারমোনিয়ামটি একটু জোরে কানে ঠেকেছে। এর কারন হয়তো রাগ সঙ্গীত এ হারমোনিয়াম এর ব্যবহার একটি আনুসাঙ্গীক বাদ্য যন্ত্র হিসেবে। মূল বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সাধারণত তানপুরা বা সূরমন্ডলকেই বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়। এ এ্যালবামে আরও ছিলেন কিবোর্ড এ গোউতম সোম, পারকেশন এ সঞ্জীবন আচার্য্য এবং রেকর্ডিং এ ছিলেন গৌতম বসু। “রাগে অনুরাগে” এ্যালবামটির সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন প্রত্যূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। “রাগে অনুরাগে” এ্যালবামটি রেকর্ড করা হয় কোলকাতায়। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে পন্ডিত রাম কানাই দাশ কে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় খায়রুল আনাম শাকিল, অসিত দে, রেজওয়ান আলী লাবলু, প্রত্যূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, লেসার ভিশন প্রমূখ। – বৈতালিক…

অলংকরন – মাসরিফ হক…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: