Press "Enter" to skip to content

দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে বাংলা গান – গীতিকবি রাজীব আহমেদ…

যুগ-কাল এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশী পরিবর্তন হয়েছে সঙ্গীতে অর্থাৎ গান শোনার মাধ্যমগুলো, প্রযুক্তি গুলো। সেই গ্রামোফোন, বেতার, টেলিভিশন, টেপরেকর্ডার, সিডি, ভিসিডি ছেড়ে এখন অনলাইন।
এখন শ্রোতার সংখ্যা অগণিত, প্রতিমাসে গানও প্রকাশ হচ্ছে শত শত। সঙ্গীতের ভুবনে ডানা মেলে দাঁড়িয়েছে একাধিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সহ অসংখ্য গীতিকবি, শিল্পী , সুরকার। এখন প্রতিদিন গান প্রকাশ হলেও এক হতাশার অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে গান।

অথচ একসময় গানই ছিল একটি অন্তরের তৃপ্তিকর সুধা। আমরা অনেক গান পেয়েছিলাম যা সুখে দুঃখে মানুষ এখনো গুনগুন করে গেয়ে থাকেন। ৮০/৯০ দশকে বাংলাদেশের মানুষ বিদেশী গানকে ছেড়ে দিয়ে বাংলা গানের প্রেমে পড়েন। ২০০১ সালের পর সারাদেশে শুরু হয় বাংলা গানের রাজত্ব। হঠাৎ সারাদেশের শ্রোতারা চমকে উঠে একটি চিরসবুজ গানে, রকস্টার শ্রদ্ধেয় আইয়ুব বাচ্চুর এক ভিন্নপ্রয়াস ‘এক আকাশ তারা’ এবং পথিক নবীর ‘নিশি কালো মেঘ’, ‘নগর বাউল জেমস এর ‘পাগলা হাওয়া’ মানুষ মুগ্ধ হয় বাংলা গানে। স্বনামখ্যাত সুরকার শওকত এর সুরে এমন মন পাগল করা গানের গীতিকবি রাজীব আহমেদ।

রাজীব আহমেদ এর হৃদয় থেকে সৃষ্টি হয় অশুভংকর এর ফাঁকি, একদিন আমি বৃদ্ধ হব, নুরজাহান, তুই যদি মোর চন্দ্র হতি, যুবতীর লাশ, আলিঙ্গন, নীলাম্বরী, উড়োমেঘ সহ একাধিক গান। যে গান আসিফ আকবর এর কণ্ঠে শ্রোতা প্রাণের প্রতিধ্বনি।

স্বনামধন্য গীতিকবি রাজীব আহমেদ উনার স্ট্যাটাসে প্রজন্ম এবং সঙ্গীত নিয়ে লিখেন, ‘৮০ দশকের মাঝামাঝি আমি যখন বুঝতে শিখছি তখন আমাদের বাসায় ঠিক এই ছবিটার মতো একটি টেপ রেকর্ডার ছিলো। মা সযত্নে একটি টেবিলে পরিস্কার কাপড়ে ঢেকে রাখতেন ওই যন্ত্রটি। পাশেই ক্যাসেট রাখার র‌্যাক। ওই র‌্যাকে থরেথরে সাজানো থাকতো লতা, হেমন্ত, কিশোর কুমারসহ ভারতীয় গুনী শিল্পীদের ক্যাসেট (তখন ক্যাসেটই বলা হতো)।
বাসায় যখন তখন বেজে উঠতো হিন্দী কিংবা ভারতীয় বাংলা গান। একদিন ওই র‌্যাকে আমার বড় বোন যোগ করলেন কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, রেনেসাঁ, ফিডব্যাক, জুয়েল। বাবা মায়ের মৃদু আপত্তির পরও ক্যাসেট রাখা র‌্যাকে জায়গা কমে গেলে হিন্দী আর ভারতীয় বাংলা গানের। এভাবেই এলো ৯০ দশক। আমার গজাতে লাগলো দাঁড়ি গোঁফের রেখা। ৯২ কি ৯৩ সাল হবে হয়তো। পড়তে বসেছি। মন বসছে না। কারণ পাশের ঘরে টিভিতে কি যেন একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হচ্ছে। সামনে পরীক্ষা তাই দেখার অনুমতি নেই। কিন্তু মন তো পড়ে আছে ওই বোকা বাক্সতেই। হটাৎ কানে এলো একটা লাইন ‘তুমি কেন বোঝ না তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়’। মুহুর্তেই ঠিক করে ফেললাম বাঁচি আর মরি এই ক্যাসেট কিনতেই হবে। তারপর আমার বাসার র‌্যাক দখল করে নিলো এলআরবি, ফিলিংস, মাইলস, সোলস, আর্ক, প্রমিথিউস, ওয়ারফেইজ। শুধু র‌্যাক না দেয়ালও দখল করে নিলেন জেমস। হিন্দী গানকে বিদায় জানিয়ে যখন আমার ঘর দখল করছেন এই গুনি শিল্পীরা, তখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখি হিন্দী গানকে দেশ ছাড়া করছেন বেবি নাজনিন, ডলি, এসডি রুবেল, মনির খান রবি চৌধুরীসহ এক ঝাঁক বাংলা গানের শিল্পী। ততদিনে নিরব ঘাতকের মতো গ্রাম ছেড়ে শহরে আস্তানা গেড়েছেন মমতাজ। শহর গঞ্জ গ্রাম সব দখল নিয়েছে বাংলা গান। ২০০১ সালে ফাইনাল পেরেক ঠুকলেন আসিফ আকবর। তারপর চারিদিকে শুধু বাংলা গান। ওই ছিলো শেষ । তারপর আবারো হিন্দী আর ভারতীয় বাংলা গানের আগ্রাসন। এখন ক্যাসেটও নেই, নেই ক্যাসেট রাখার র‌্যাক। আমাদের মতো আধবুড়ো খোকাদের বুকে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে বাংলা গান।
অলংকরন – গোলাম সাকলাইন…

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: