Press "Enter" to skip to content

সেতার বাজানো ছাড়া আর কিছুই চিন্তা করতে পারিনা – এবাদুল হক সৈকত…

সঙ্গীত আমাদের জীবনের অনেক পরমপ্রিয় বন্ধু স্বরূপ। কথা, সুর, কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্র দ্বারা একটি সঙ্গীতকে মাধুর্য সৌন্দর্য এবং শ্রুতিমধুর করা হয়। সাধারণত আমরা একটি গানের গায়ককেই চিনে থাকি বেশী। একটি গান জন্মের পিছনে অনেক মানুষের শ্রম এবং সাধনা থাকে।

অনেকগুলো যন্ত্রের সাহায্যে একটি গানকে মাধুর্যপূর্ণ করা হয়। তাদের মধ্যে এমন এক বাদ্য যন্ত্র সেতার। সেতার বস্তু তাড়িত ধাতব তত বাদ্যযন্ত্র। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র গুলির মধ্যে অন্যতম। অনেক ভালবাসা আর খেয়ালে বাজাতে হয় সেতার। সেতারের শব্দ অনেক সহজে হৃদয়ে মিশে যায়।
তেমনি এক সেতার সাধক এবাদুল হক সৈকত। হৃদয়ের সকল প্রেম বিলিয়ে যে সেতারের তার থেকে সুরের মূর্ছনা বের করে, মুগ্ধ করেন শ্রোতাদের।
সঙ্গীতাঙ্গন এর সাথে সেতার শিল্পী এবাদুল হক সৈকত এর কথোপকথন।

সঙ্গীতাঙ্গন : আপনি তো একজন যন্ত্র শিল্পী। সেতার বাজান, এর শুরুটা কিভাবে হলো একটু বলবেন প্লিজ ?

এবাদুল হক সৈকত : আমি আসলে ছোট বেলা থেকেই তবলা বাজাতাম। শুরু করলাম তবলা বাজানো দিয়ে। আমার বন্ধু সেতার বাজাতো এটা দেখে আমার ভালো লাগলো। কিছুদিন পর তার কাছ থেকে সেতার নিয়ে বাজাতে শুরু করলাম। দেখি বাজানো যায় কিনা। তো বন্ধু আমাকে সেতারটা দিল আর সেদিন থেকেই শুরু আর কী।

সঙ্গীতাঙ্গন : এ ব্যাপারে আপনাকে কেউ কি অনুপ্রেরণা দিয়েছে?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে অনুপ্রেরণা আমাকে কেউ দেইনি। আমার ভালো লাগাই আমার অনুপ্রেরণা। গান বাজনা ভালবাসতাম এটাই সব।

সঙ্গীতাঙ্গন : কখনো কি ভেবেছেন সেতার বাজাবেন?

এবাদুল হক সৈকত : নাহ্ আসলে সত্যি বলতে আমি এই যন্ত্রটাই চিনতাম না।

সঙ্গীতাঙ্গন : যেহেতু যন্ত্র বাজানো শেখাটা গুরু মুখী বিদ্যা তো সে ক্ষেত্রে আপনার গুরু ছিল কে কে?

এবাদুল হক সৈকত : আমি প্রথমে সেতার বাজানো শিখা শুরু করি বাংলাদেশে। উস্তাদ খুরশীদ খাঁনের কাছে। তার কাছে প্রায় বছর তিনেক শিখি আর ততদিনে আমার হাইয়ার সেকেন্ডারী কমপ্লিট করি। তারপর আমি চলে যাই ইন্ডিয়াতে ভারত সরকার আইসিসিয়ার স্কোলারশীপ নিয়ে। সেখানে ভর্তি হই রবীন্দ্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক বিভাগে সেতার বিষয়ে এবং আমি সেতার শেখা শুরু পন্ডিত অজয় সিংহ রায়ের কাছে। আমি যখন গুরুজির কাছে যাই তখন তাঁর বয়স ছিল ৮০+ ওনার কাছে আমি তিন বছর শিখি। এরপর গুরুজ্বি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে যান তখন আমি পন্ডিত রবি শঙ্করজ্বীর অন্যতম শিষ্য পন্ডিত দীপক চৌধুরী কাছে সেতার শিখতে যাই। আমি গুরুজি কে বললাম আপনি আমাকে সেতার বাজানো শিখাবেন? তখন গুরুজি বললেন তুই তো অজয় সিংহ রায়ের কাছে শিখছিস উনি তো আমাদের ঘরেরই লোক। তো শিখতে চাইলে উনার কাছ থেকে
অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। তো আমি গেলাম পন্ডিত অজয়সিংহ রায়ের কাছে। গিয়ে বললাম গুরুজি আমি তো বাংলাদেশ থেকে এসেছি এখন আমার তালিম বন্ধ আছে তবে আমি শিখতে চাই। গুরুজি বললো তোমার যার কাছে শিখতে মন চায় শিখ আমি অনুমতি দিলাম। প্রয়োজনে আমি তোমাকে সহযোগীতা করবো। সেই থেকে পন্ডিত দীপক চৌধুরীর কাছে তার মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত শিখি। গুরুজি মারা যান ২০০৯ সালে। আর আমি ১৯৯৮ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার কাছেই থাকি। পন্ডিত দীপক চৌধুরী মারা যাওয়ার পর দুই বছর শিখি পন্ডিত কার্তিক শেষাদ্রীর কাছে তবে বর্তমানে আমি পন্ডিত দেব প্রসাদ চক্রবর্তীর কাছে শিখছি। পন্ডিত দেব প্রসাদ চক্রবর্তী পন্ডিত অজয় সিংহ রায়ের অন্যতম শিষ্য। তো এভাবেই আমার তালিমের বিষয়টি হয় আর কি।

 

সঙ্গীতাঙ্গন : একটু জানতে চাই প্রথম দিকে কি সেতার শিখাটা সখের ছিল নাকি পেশা হিসেবে দেখেছেন?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে আমি পেশা বলতে কিছু চিন্তা করিনা। সেতার বাজানো ছাড়া আমি কিছুই চিন্তা করতে পারিনা এই আর কি।

সঙ্গীতাঙ্গন : ক্যারিয়ার নিয়ে কি কখনো ভেবেছেন কিছু?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবেন যারা টাকার পিছনে ছুটে। আমি খেয়ে থাকি আর না খেয়ে থাকি ক্যারিয়ার বিষয়ে ভাবতে সময় পাইনি শুধু ভেবেছি সেতার নিয়ে গান বাজনা নিয়ে।

সঙ্গীতাঙ্গন : সেতার বাজানোটাই কেন বেছে নিলেন?

এবাদুল হক সৈকত : আমি জানিনা তো! কিভাবে যেন সেতার আমার জীবনে এসে গেছে। আমি শুরু করলাম বাজানো। আসলে সেতার বাজানোটা শুধু বাজানো না। এখানে জীবন ও আচার এর একটা ব্যাপার আছে। এই যন্ত্রটা বাজানো যেমন কঠিন তেমন এটাকে সবাই চিনেনা। ভালো বুঝ থাকতে হবে এ বিষয়ে।

সঙ্গীতাঙ্গন : জানতে পারি কি কোন্ প্রোগ্রামের মাধ্যমে সেতার বাজানোটা প্রোফেশনাল লাইফে এলো?

এবাদুল হক সৈকত : প্রথমে আমি ছায়ানটে এক কনর্সাটে বাজাই। বশির খান সাহেবের কাছে সেতার শিখতাম। তখন বাংলাদেশে এসেছিলো কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্ভবতো তার বয়স তখন অনেক বেশি ছিল এবং তাকে সম্মান জানানোর জন্য ছায়ানটে একটি কনর্সাটেরর আয়োজন করেন সেখানে আমাকে বলা হলো বাজাতে আমি চোখ বন্ধ করে বাজাতে শুরু করি আর কনর্সাটের শেষে সবাই বাহবা দিল। তখন থেকে আরো ভালো বাজাতে অনুপ্রাণিত হই।

সঙ্গীতাঙ্গন : চ্যানেলে যখন বাজান তখন কেমন অনুভুতি হয়?

এবাদুল হক সৈকত : চ্যানেলে বেশি বাজানো হয়নি। ২০- ৩০ বারের মতো হবে। কারণ সেখানে টাইমিং করা থাকে তো সেখানে প্রোগ্রাম করলে তেমন কমর্ফোট ফিল করিনা। অনেক ঝামেলা থাকে অল্প সময়ের মধ্যে বাজিয়ে মানুষকে তৃপ্তি দিতে হয়। তো সেখানে বেশি মজা পাওয়া যায় না।

সঙ্গীতাঙ্গন : সেতার বাজাতে গিয়ে কোন মজার ব্যাপার ঘটেছে এমন কোন ঘটনা শেয়ার করবেন?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে গান বাজনা এ সবই মজার ঘঠনা। আসলে আমি যখন বাজাই তখন কে এলো কে গেলো ভাবিনা। আমি শুধু বাজাতে শুরু করি চোখ বুজে শুধু তবলা বাদকের সাথে একটু কম্পেয়ার করি এই আর কি?

সঙ্গীতাঙ্গনঃ : আচ্ছা এই পেশায় আসাতে কি কোন জটালতা পোহাতে হয়েছে আপনাকে?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে কেউ চায় না আমার ছেলেমেয়ে গান বাজনা করুক। সবাই চায় তাদের ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে মানুষ হক বিয়ে করে সংসারী হক। সেই দিক দিয়ে পরিবার থেকে কিছু বাধা এসেছে তা আমি সমাধান করে নিয়েছি।

সঙ্গীতাঙ্গন : আমাদের দেশে মিউজিক যারা করেন মিউজিশিয়ান যারা আছেন তাদের মধ্যে কি কোন আনপ্রেজেন্টস ব্যাপার আছে?

এবাদুল হক সৈকত : আসলে বলতে গেলে পুরটাই আনপ্রেজেন্টস। টাকা পাচ্ছে বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। যে যাই বাজাকনা জেনে বুজে বাজানো প্রোয়োজন। এই চিন্তা ভাবনা কারো মাথায় নেই। তারা মিউজিককে একটা প্রোফেশনাল মিউজিক হিসেবে ধরে নিয়েছে। কোন একটা স্টুডিওতে গেলাম আর বললো ভাই বাজান আর বাজিয়ে চলে এলাম। কম্পোজার ঠিক করে দিবে কি ভাবে বাজানো হবে কিন্তু কম্পোজার বলে ভাই নিজের মতো করে বাজান। একটা কাজের ধারা আছে তো। জেনে শুনে করতে হবে তো কাজটা। সেই দিকে আমাদের এখানে বিশাল গ্যাপ। গান গুলো এমন ভাবে করে ছেলে গাইছে না মেয়ে গাইছে মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলি। এদের কোন মাথা মুন্ড নাই। আসলে লোকজন এখন গান বাজনা শুনে না দেখে তাই এই সমস্যাটা রয়ে গেছে। কত গুলো মেয়ে নেচে যাচ্ছে আর লোকজন তা দেখে দারুন এনজয় করছে। যে মেয়েরা টাকার অভাবে ছোট ছোট জামা কাপড় কিনে তাদেরকে কোম্পানি বেশি টাকা পয়সা দেয়। যে গান গুলো শুনি তাতে নাম্বার ওয়ান স্পন্সর খুব কম। এজন্যই এতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সঙ্গীতাঙ্গন : দেশের বাইরে যে প্রোগ্রাম গুলো করেছেন তার বিষয়ে কিছু বলেন।

এবাদুল হক সৈকত : দেশের বাইরে ইন্ডিয়াতে কয়েকটি কনর্সাট করেছি। কলকাতায়, দিল্লীতে আরো কয়েক জায়গায়। বিদেশে যারা প্রোগ্রাম করে তাদের মেক্সিমাম এরেন্জমেন্ট ইন্ডিয়ানরাই করছে। বাংলদেশীরা বিদেশে এরেন্জ করেনা। সে কারণে আমরা যারা বাংলদেশী তাদেরকে ওরা ডাকেনা। সেজন্য বিদেশে যাওয়াটা কম। আর সরকারি পৃষ্টপোষকতা নেই বললেই চলে। আমি আমার ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারি আমি সরকারি কোন পৃষ্টপোষকতা পাইনা। এটা শিল্পকলা বলুন আর যাই বলুন। সেখানে একটি পার্টিকুলার পরিবার আছে বাবা, দাদা, নানা, মা, খালা এরাই সব। গানও গায় বাজনাও বাজায়। বাইরের লোকের কোন চান্স নেই। তারাই বাহাবা পায়। সম্প্রতি একটি প্রোগ্রামের আমন্ত্রন হই। ওয়ারলিয়াস ওয়ার্ল্ড ওয়াইড এরেন্জ করে। সেখানে আমাকে তারা এতোটুকু ভদ্রতা দেখায়নি। কনর্সাটের যে ব্যানার থাকে সেখানে আমার নাম ছবি কিছুই নেই। একজন কে বললাম এমন কেন? তো সে বললো আমি কিছুই জানিনা আমাকে নিষধ করা হয়েছে তাই আমি দেইনি। তো আমি বললাম তাহলে আমি চলে যাই। আমার সাথে একজন সহশিল্পী ছিল সেও বাজাতে এসেছে, সে আমাকে বলছে এসেই যখন পরেছি চল বাজাই। তখন বাজিয়ে চলে এলাম। মনে হলো যেন ভেসে এসেছি এখানে। এই ধরনের কিছু টেন্ডেনসির মানুষ আছে আমাদের দেশে। এ ধরনের নোংরামী এখনো রয়ে গেছে এদেশে।

সঙ্গীতাঙ্গন : আপনি কি সঙ্গীতাঙ্গনের মাধ্যেমে কিছু বলতে চান?

এবাদুল হক সৈকত : আমি শুধু বলবো আপনারা যদি আমাদের প্রোমট করেন যারা আমরা গান বাজনা করি বা করেন তাদের পাশে দাড়ান তাহলে মনে হয় দেশকে কিছু দিতে পারবো। আমাদের কনর্সাটে আসবেন উৎসাহ দিবেন আমরা আনন্দের সাথে ভালো কিছু উপহার দিতে চেষ্টা করবো।

সঙ্গীতাঙ্গনঃ আমাদেরকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সেই সাথে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ভালো থাকবেন।

এবাদুল হক সৈকত : সঙ্গীতাঙ্গন কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ভালো থাকবেন। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: