গুরু ছাড়া গুরুমুখী বিদ্যা শিখলেন গিটারিস্ট সেলিম হায়দার…

সঙ্গীত জগতে যন্ত্র শিল্পীর অবদান অনেক। গানের খোলা বাক্য গুলোকে বাদ্য যন্ত্রের মাধ্যেমে একটা সুন্দর সঙ্গীত পরিবেশনে বাদ্যযন্ত্রেরর গুরুত্ব্য অপরিসীম। বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র বাজিয়ে একটি গানকে শ্রোতার কাছে ভালো লাগার উপযোগী করে তুলেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন একসময়ের সেরা গীটারিস্ট সেলিম হায়দার। তার সঙ্গীত জীবন নিয়ে কথা হয় সঙ্গীতাঙ্গন এর। এসময় বিভিন্ন ধরনের আলাপ-আলোচনা হয়।

গীটার বাজানোর শুরুটা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এভাবে বলেন যে, শুরু দুই ধরনের হয়। এক ধরনের শুরু হলো লুকিয়ে লুকিয়ে শেখা আর অন্যটি হলো প্রোফেশনাল শিখা। আমার পরিবার একটি ধার্মিক পরিবার। আমার মা বলেন আমার বাবা নাকি বেশ ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। আমার মনে হয় ঐ দিকটা আমাকে আকর্ষণ করেছে। আমার একটা বন্ধু ছিল বয়সে আমার পাঁচ ছয় বছরের বড় হবে। তাদের পুরো পরিবার গান বাজনা করতো। তার বাসায় একটা হাওয়াইয়ান গিটার ছিল। রক্তের টানে হোক আর যাই হোক আমার ভালো লেগে গেল। আমি বাজাতে শুরু করলাম। কোথায় থেকে যেন আমার ভেতরে একটা চিন্তা এসে গেল আমি জানিনা। তখন থেকে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটু একটু করে বাজাতে থাকি। বাড়িতে নিষেধ ছিল তাই কেউ জানতো না আমার গীটার বাজানোর কথা।

আবার প্রোফেশনাল লাইফে আসি। একবার চারটি দেশের একটা কম্পিটিশন হয়। সেখানে জাজমেন্টস করেছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া ও শ্রীলংকা। তখন বাংলাদেশের বেস্ট গিটারিস্ট আমি। আমি গীটার বাজিয়ে এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। সেই অনুভুতি একটু নাড়া দিল। তখন পড়া লেখার পাশাপাশি গীটার শিখি। কখনো কখনো আট নয় ঘন্টা চলে যেত। সেই সময় আমি শাফিন হামিনদের সাথে ইংলিশ ব্যান্ডে বাজাই। তাদের ব্যান্ডের নাম ছিল ‘পারপেল ওশেন’। প্রায় ছয় মাস ঐখানে বাজাই। তারপর আরেকটি ব্যান্ডে জয়েন করি তার নাম ছিল আলট্রাসনিক। সেখানে ১ বছর বাজানো পর কিছু মেম্বার চেন্স হয়। আলট্রাসনিক পরে আবার ফিটব্যাক ২০ সেনচুরি নামে চালু হয় এবং আমরা ইন্টারকনে বাজাতে শুরু করি। তখনো মাকসুদ ড্রামার পিয়ারো জয়েন করেনি। তারা এসেছে প্রায় এক বছর পর। আর আমাদের যে আগের মেম্বার ছিল তারা বিদেশে চলে যায় এবং সিংগার চেন্স হয়। আমাদের সিঙ্গার ছিল জাকিউর রহমান এবং ড্রামার ছিল খাঁজা পপসি। তাঁরা চাকরীর কারনে দেশের বাইরে চলে যান। সিঙ্গার আর ড্রামার চলে যাওয়াতে সিঙ্গারে জয়েন করে মাকসুদ আর ড্রামারে জয়েন করেন পিয়ারো। এই ফিটব্যাকের যাত্রা শুরু হয় সেখানে আমি দশ বারো বছর ছিলাম। এবং ১৯৮৪ তে আমি রুনা লায়লার অফার পাই।

আর এভাবেই শুরু হয় তার পথ চলা। প্রোফেশনাল লাইফে তার সুনাম হতে থাকে। সকল কাজ শিখতে গেলে কেউ না কেউ অনুপ্রেরণা দেয়। সেই ক্ষেত্রে সেলিম হায়দার তার বন্ধু ও বন্ধুর পরিবার থেকে যথেষ্ট সহযোগীতা ও উৎসাহ পেয়েছিল বলে জানান তিনি। তিনি নিজেও কোন দিন জানতেন না যে সে গীটার শিখবেন। এটা একসময় তার ফ্যাশন ছিল। তার গীটার বাজাতে ভালো লাগতো। কিন্তু এটা বাজিয়ে উপার্জন করবে এটা মাথায় আসেনি কখনো। তার বাবা ব্যাবসা করতো সেই ধারাবাহিকতায় তিনি চেয়েছিলেন এয়ারলাইন্সে চাকরী করতে। তাদের পরিবারে কোন চাকুরীজীবী ছিল না যে কোন কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি। এটা ছিল তার সখের বিষয়।
এক সময়ের প্রথম বেস্ট গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের কাছে জানতে চাই গীটার শেখার পেছনে গুরু ছিল কে। সে জবাবে বলেন, আমার বিদ্যাটা যদিও গুরুমুখী কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আমি কখনো গুরু ধরে গীটার শিখিনি। তিনি জানান যে আমার মনে আছে আগের দিনে কটকটি ওয়ালারা কটকটি বিক্রি করতো। তার কাছে একটা বই পেলাম যেটা আমি তার কাছ থেকে কিনে নিয়ে যাই। বইটির নাম ছিল ড্যান মরগান। সেই বইতে একটা গীটারের ছবি দেওয়া ছিল সেই বইটা পরে আমি গীটার শিখি। গুরুমুখী বিদ্যা, বই পড়ে নিজে নিজে ওস্তাদ হয়ে যান গিটারিস্ট সেলিম হায়দার। তার ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান এয়ারলাইন্সে অলরেডি তিন মাসের ট্রেনিং নিয়েছি তখন আমি ইন্টরকনে বাজাই অনেক টাকাও কামাই। কিন্তু কোন কারণে এয়ারলাইন্সের চাকরীটা হয়ে ওঠেনি। কি কারণে হয়নি তিনি আজও তার কারণ খুঁজে পেলামনা। সে ক্ষেত্রে বলা যায় রক্তের টানে তাকে গান বাজনার দিকে নিয়ে এসেছে।

জানতে চাওয়া হয় কেন গীটার যন্ত্রটা তার কাছে বেশি ভালো লাগলো এটাই কেন মন শিখতে সায় দিল। তিনি জানান যে সব কাজের একটা প্রোফাইল থাকে গীটারের ও একটা প্রোফাইল আছে। সুন্দর সবাই ভালোবাসে তো সেই দিক দিয়ে যন্ত্রের মধ্যে ভালো লাগার মত গীটার। তাই এটা আমার মনে ভালো লাগে। এটা স্মার্ট একটা যন্ত্র। এটা অনেক কঠিন জিনিস। সবাই বলে সেতার বাজানো কঠিন কিন্তু আমি বলবো তার চাইতে বেশি কঠিন গীটার।

এই যন্ত্র সঙ্গীতের শিল্পী সেলিম হায়দার জীবনের প্রথম ফাংশনে গীটার বাজান ঢাকা কলেজে। সেখানে সে পড়া লেখা করতো আবার গীটার বাজানোর জন্য তাকেই ডাকা হলো। সেখানে প্রথম তিনি গীটার বাজান। সেই সময়ে গীটার বাজিয়ে ১০০ টাকাও পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন ঐ সময় আজম খানের খুব ভক্ত ছিল। আজম খানের নামের উপর মানুষ আসতো। সেই সময়ের কথা যখন আমি ফাংশনে বাজাতে গিয়ে অনেক ভয় পেয়েছিলাম। আমি বাজাতে বাজাতে স্টেজের পিছনে যেতে থাকি। গান চলছে আমি পিছনের দিকে চলে যাচ্ছি। জীবনের প্রথম প্রোগ্রাম অনেক মানুষ সবাই তাকিয়ে আছে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না। অনুষ্ঠানের পর দেখলাম আমি স্টেজের বাইরে চলে এসেছি। আমাকে নিয়ে সবাই হাসা হাসি করছিল।
এটা ছিল উনার প্রথম স্টেজ শো-র অনুভুতি। বিভিন্ন চ্যানেলেও তার আছে পদচারনা। কম বেশি সব চ্যানেলেই তিনি গীটার বাজিয়েছেন। পূর্ব থেকে এখন পর্যন্ত সঙ্গীতের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে ঘরে ঘরে স্টুডিও হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ বেসুরাও গায় তা ঠিক করে দিতে পারে। সুর করার যন্ত্র কম্পিউটারে আছে। এতে করে সঠিক মিউজিশিয়ান আর হবে না। আমরা যখন বাজাতাম বিশেষ করে আমার কথা বলি আমার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার গান রেকর্ডিং আছে। ক্যাসেট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত। তখন প্রচুর রেকর্ডিং হতো। মাত্র দুটি স্টুডিও ছিল। টেলিভিশন, রেডিও, চলচ্চিত্রে, ক্যাসেট সব মিলিয়ে সাড়ে ছয় এর মত গানে বাজিয়েছি।

এই অভিজ্ঞ গিটারিস্ট দেশের বাইরে প্রায় পচিশটি দেশে প্রোগ্রাম করেছেন বলে জানান। কোন কোন দেশে সাত আট বারও প্রোগ্রাম করেছেন তিনি। তার মধ্যে রুনা লায়লার সাথেই বেশি প্রোগ্রাম করেছেন। তারপর আখীঁ আলমগীরের সাথে করেছেন আরো বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে প্রোগ্রাম করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন এমন এমন পাচঁটা হলে বিদেশে শো করেছি যেখানে বাংলাদেশী কোন শিল্পীরা সেখানে শো করার ক্ষমতা রাখেনি। তার মধ্যে সিডনির অপেরা হাউজ, লিনকন সেন্টারে, এলবার্ট হলে, শ্রাইন অডিটোরিয়াম যেখানে অস্কার দেয়া হয়, তারপর জাপানে। কেমন পারফরমেন্স করেছি জানিনা কিন্তু বাজিয়েছি। এটা গিটারিস্ট হিসেবে আমার বড় একটি পাওয়া।

সম্প্রতি মেয়েরা ব্যান্ড সঙ্গীতে তাদের অবধান রাখছে। গত ঈদে বিটিভিতে অর্কিড অর্কেস্ট্রা অনুষ্ঠানে তাদের বাজানো ব্যান্ড দলের পারফরমেন্স দেখায়। এতে আপনার বক্তব্যে কি তারা আমাদের দেশের জন্য কতটা সহায়ক বলে মনে করেন? জবাবে তিনি বলেন বিদেশে মেয়েরাও বাজায় এবং ছেলেদের থেকে অসম্ভব ভালো বাজায়। মেয়েদের বাদ দিয়ে কোন কাজই এগিয়ে নেয়া সম্ভবনা। আমি মনে করি বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ব্যান্ড প্রোয়োজন। কেনো যে এখনো মেয়েদের ব্যান্ড বাংলাদেশে হচ্ছেনা বুঝিনা। কয়েকটা কোম্পানি এগিয়ে এলেই এটা হয়ে যেতো। তাতে করে মেয়েদেরও কাজ করার প্রেরণা হতো ব্যান্ড সঙ্গীতে। তাদের প্রোমোট করা প্রয়োজন।

সঙ্গীতের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে বলেন, দেশের মানুষের মন মানষিকতা পরিবর্তন করতে হবে। দেশের জনগন চায় নতুন কিছু শুনতে। একই ধরনের গান আর কত শুনবে। নতুন গানতো আসতে হবে।। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামী বিশ বছর পর আর কোন মিউজিশিয়ান থাকবে না। তিনি আরো জানান যে সরকারী পৃষ্টপোষকতা অতিব প্রোয়োজন। সরকার ক্রিকেটের জন্য যত টাকা ব্যয় করেন তার পঞ্চাশ ভাগের একভাগও যদি মিউজিকের পিছনে ব্যায় করতো তাহলে আরো ভালো কিছু করতে পারতো বলে আমার বিশ্বাষ। বিদেশ থেকে তিন চার জন ট্রেইনার এনে যদি ট্রেনিং করানো যেত তাহলে যারা শিখতো তারাই পরে আবার ট্রেনিং দিতে পারতো আর এভাবে একটা বড় পরিবর্তন হতো। সরকারী পৃষ্টপোষকতা ছাড়া এটা কোন ক্রমেই সম্ভব না। এর জন্য সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান করেন তিনি। মাত্র দশ বিশ লাখ টাকা ব্যায় করে এক বছরের জন্য ট্রেনিং করালে তারা সাফল্যের সোপান দেখাতে পারবে।

সেলিম হায়দারের মত অভিজ্ঞ যন্ত্র শিল্পীদের সম্মানের সাথে পাশে রাখা প্রয়োজন বর্তমান সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের। বুঝা উচিৎ তাদের দ্বারাই বাংলাদেশের সঙ্গীত জগৎ পথ খুঁজে পেয়েছিল। প্রতিভাবান আর্টিষ্টদেরকে সামনে রেখে কাজ করার আহবান করছি নতুনদের। প্রবীনদের সম্মান দেখানোর মাঝেই নবীনদের সম্মান নিহীত। সুষ্ট সুন্দর ধারার সঙ্গীত জনগনকে দেবার জন্য প্রবীনদের অবদান এখনো পুরোটাই আছে। সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে দেশের সেরা গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

One thought on “গুরু ছাড়া গুরুমুখী বিদ্যা শিখলেন গিটারিস্ট সেলিম হায়দার…

  • August 16, 2017 at 1:16 am
    Permalink

    Hi selim vai I likes you and your guiter

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: