দিনু ঠাকুরের গানের সংকলন নিয়ে ‘আমার বেদনা লহ বুঝি’ শীর্ষক অডিও সিডির প্রকাশনা অনুষ্ঠান…

ধানমন্ডিস্থ ছায়ানট মিলনায়তনে গতকাল সন্ধ্যায় শিল্পী সুকান্ত চক্রবর্তী ও অভিজিৎ মজুমদার এর কন্ঠে ধারণ করা দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সংকলন নিয়ে ‘আমার বেদনা লহ বুঝি’ শীর্ষক এ্যালবামটি প্রকাশিত হয়। এ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক। অনুষ্ঠানে সুকান্ত চক্রবর্তী ও অভিজিৎ মজুমদার দ্বৈতসংগীত পরিবেশন করেন। দুইশিল্পীর গানের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথের লেখা থেকে পাঠ করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিনু ঠাকুরকে বলতেন ‘আমার গানের ভান্ডারী’। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৯ সাল থেকে পরবর্তী ২৫ বছর রবীন্দ্রনাথের ৭০০ গানের স্বরলিপি তৈরী করেন যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত মোট গানের এক তৃতীয়াংশ গান। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘দিনেন্দ্র রচনাবলি’র ভুমিকা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন- “দিনেন্দ্রনাথের কন্ঠে আমার গান শুনেছি, কিন্তু কোনদিন তার নিজের গান শুনিনি। কাব্যরসে তার মতো দরদী অল্পই দেখা গেছে। অথচ কবিতা সে যে নিজে লেখে, এ কথা প্রায় গোপন ছিল বললেই হয়। অনেকদিন পূর্বে কয়েকটি ছোটো ছোটো কবিতা সে বই আকারে ছাপিয়েছিল। ছাপা হয়েছিল মাত্র, কিন্তু পাঠকসমাজে সেটা প্রচার করবার জন্যে সে লেশমাত্র উদ্যোগ করেনি। চিরজীবন অন্যকেই সে প্রকাশ করেছে, নিজেকে করেনি। তার চেষ্টা না থাকলে আমার গানের অধিকাংশই বিলুপ্ত হত। কেননা, আমার গান ও সুরগুলিকে রক্ষা করা তার যেন একাগ্র সাধনার বিষয় ছিল। আমার সৃষ্টিকে নিয়েই সে আপনার সৃষ্টির আনন্দকে সম্পূর্ণ করেছিল। আজ স্পষ্ঠই অনুভব করছি, তার স্বকীয় রচনাচর্চায় বাধাই ছিলেম আমি। কিন্তু তাতে তার আনন্দ একটুকুও ক্ষুণ্ণ হয়নি।”

দিনেন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ‘বীণ’ নামে একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর ১৪টি গানের স্বরলিপি পাওয়া গেছে বিভিন্ন জায়গায় যা একসাথে করে তাঁর স্ত্রী কমলা দেবী ‘দিনেন্দ্র রচনাবলী’র মলাটে প্রকাশ করেছিলেন। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই তাঁর নিজের রচনা নিয়ে খ্যাতিলাভের আকাঙ্খা করেননি।

অনুষ্ঠানে শিল্পী সুকান্ত চক্রবর্তী ও অভিজিৎ মজুমদারের গাওয়া গানের তালিকা:

১. যারা কাছে আছে তারা কাছে থাক্ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. পথপাশে মোর রচিনু দেউল- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. আজি আঁধার সাগর- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪. বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫. বুঝেছি বুঝেছি তব বাণী- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬. আধেক ঘুমে নয়ন চুমে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৭. আজি এ নিশিথে জাগে একাকী- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৮. তারে কেমনে ধরিব হায়- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৯. কিছু বলব বলে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১০. সে কোন্ বনের হরিণ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১১. যেতে যেতে একলা পথে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১২. পলাশরাঙা বাসনাগুলি- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৩. বলা যদি নাহি হয় শেষ- দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৪. আজি বরিষনমুখরিত শ্রাবণরাতি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অডিও এ্যালবাম নিয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ এর মন্তব্য: রবীন্দ্রসংগীতের যাঁরা অনুরাগী, তাঁরা অনেকেই সমান অনুরাগে মনে রাখেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। তিনি যে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র, একথার চেয়ে বেশি মনে থাকে এই তথ্য যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলতেন তাঁর ‘গানের ভান্ডারী’। সুর দিয়ে ভুলে যেতেন নিজে, তাই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দরকার হতো তাঁর স্নেহের দিনুর স্বর আর স্বরলিপির সহায়তা। তা না হলে কত গানই যে চলে যেত বিস্মরণে! তাই দিনেন্দ্রনাথের কাছে আমাদের অশেষ ঋণ।

কিন্তু সেই সঙ্গে এও সত্যি যে, আমরা অনেকেই ভুলে গেছি বা কখনো জানিইনি তাঁর অন্য অনেক পরিচয়। এই দিনেন্দ্রনাথই নিজেও ছিলেন কবিতা বা গানের রচয়িতা, শুধু স্বরলিপিকারই ছিলেন না তিনি, তিনি ছিলেন সুরকারও। ‘বীণ’ নামে একখানি কবিতার বই ছিল তাঁর, কখনো কখনো মনের আনন্দে চিঠিও লিখতেন ছন্দে, আর সুরসহ নিজের গানও তৈরি করেছিলেন বেশ কিছু। তাই জাহাজযাত্রী রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁর সদ্যরচিত একটি গান পাঠিয়ে দিনেন্দ্রনাথকে লিখতে পেরেছিলেন : ‘তুই তোর সুরে গাইতে চেষ্টা করিস তা আমার সঙ্গে মেলে কি না দেখব…।’

দিনেন্দ্রনাথের লেখা সেসব গানে বা কবিতায়, সুরে বা কথায় রবীন্দ্রনাথের ছাঁয়া আছে অবশ্যই, কিন্তু তা সত্ত্বেও, আছে কিছু স্বকীয়তারও চিহ্ন। কোথায় গেল সেসব? এমন নয় যে কোথাও পাওয়াই যায় না সেই গান আর তাঁর স্বরলিপি, কিন্তু তবু সেই সুরশিল্পীকে আমরা চিনি না প্রায় কেউই। এতকালের দীর্ঘ অবহেলার পর, দুই বাংলার দুই সাহসী তরুণ, সুকান্ত আর অভিজিৎ, বিস্মৃত সেই গানগুলি থেকে ন-খানি গান বেছে নিয়ে আমাদের উপহার দিচ্ছেন সযত্ন ভালোবাসায়। এ-দুই তরুণের কাছে আমাদের তাই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

সুকান্ত চক্রবর্তী : ১৯৮৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীতে জন্ম। সংগীতশিক্ষার প্রথম তালিম হরিপদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তনে সাফল্যের সাথে রবীন্দ্রসংগীতের কোর্স সমাপ্ত করেন। এ সময়ে সংগীত গুরু হিসাবে পেয়েছেন প্রয়াত ওয়াহিদুল হক, সান্জীদা খাতুন, সুমন চৌধুরী, মিতা হক, নীলোৎপল সাধ্য, রেজওয়ান আলী এবং লাইসা আহমদকে। বর্তমানে ভারত সরকারের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসংগীতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। সেখানে প্রসূণ দাশগুপ্ত ও স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের মত গুণীদের সহচর্যে রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের পাশাপাশি ঠাকুরবাড়ির হারিয়ে যাওয়া গান সংগ্রহ, প্রচার ও গবেষনায় নিজেকে আত্ননিয়োগ করেছেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত এই শিল্পী ২০০৫ সালে রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনে অনন্য মান এবং বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণে শ্রেষ্ঠমান সহ নানা পুরস্কার লাভ করেছেন।

অভিজিৎ মজুমদার: ১৯৮৮ সালের ২৩ এপ্রিলে জন্ম। সংগীতের প্রথম তালিম বাবা অজিত মজুমদার ও মা সবিতা মজুমদারের কাছে। পরে গুরু কৌশিক গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে শুদ্ধসংগীতচর্চা শুরু। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত। সংগীতগুরু হিসাবে প্রয়াত মায়া সেন, অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, দেবারতী সোম, প্রসূণ দাশগুপ্তের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বর্তমানে পন্ডিত নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শ্রাস্ত্রীয়সংগীতের তালিম নিচ্ছেন। – প্রেস বিজ্ঞপ্তি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *