কাচেঁর বোতলে তাল দিয়ে তবলা শেখা শুরু – চন্দন দত্ত…

জীবন একটা বয়ে চলা নদীর মত কিংবা স্রোতে ভাসা শেওলার মতো। জীবন চলার পথে হাজারো স্মৃতি, ব্যাথা, প্রিতী বেদনা, ঘৃণা ভালোবাসা, বঞ্চনা, সবটাই জীবনের একটা অংশ। প্রতিটা মানুষ আজ খুঁজে পেয়েছে তার কষ্ট ভাগ করার মতো সঙ্গী। মনের ব্যথা নিমিষেই দুর হয়ে যায়। ভুলে যায় কষ্টের ক্ষত চিহ্ন। আর সেটা সম্ভব করেছে বিনোদন। গানের মাঝে মানুষ খুঁজে পায় তার সান্তনা। খুঁজে পায় স্বপ্ন রঙ্গীন ভালোবাসা। এই গানের পিছনে থেকে যায় কত হাসি, কান্না ভালো লাগা আর ভালোবাসা। টুকরো টুকরো কথা সাজিয়ে ছন্দের তাল বানিয়ে বাদ্যের ঝংকারে সুরের অমিয় ধারায় ব্যাথিত মনকে করে প্রফুল্ল। সেই গান বা সঙ্গীতের এই ভাবটা তৈরি করতে কাজ করে অনেক নির্মাতা ও কলাকুশলীরা। গীতিকারের কথা, সুরকারের সুর গায়কীর কন্ঠে গান তার কাঠামো গঠন করে, তার মাঝে প্রাণ সঞ্চার করে মিউজিক। সুরেলা মিউজিকে প্রানবন্ত করে দেয় গানটাকে। যখন মানুষ সেটা শুনে মনে প্রশান্তী পায়। সেই গুনী ব্যক্তিত্ব্যের জীবনের কথা আমরা হয়তো কেউ জানিনা। জানতে চাইনা। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে যে আমাদের বিনোদন বেঁচে আছে আমরা তা অনুধাবন করতে পারিনা। আসুন তাদের মধ্যে থেকে একজনের জীবনের গল্প শুনে নেই। তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত তবলা বাদক শ্রদ্ধেয় চন্দন দত্ত। তার জীবনের কিছু অজানা কথা আর সঙ্গীতের প্রেমের গল্প শুনতে কথা হয় সঙ্গীতাঙ্গন এর।

সঙ্গীতাঙ্গন : নমস্কার দাদা। কেমন আছেন? শুভেচ্ছা সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে।

চন্দন দত্ত : নমস্কার সবার আর্শীবাদে ভালো আছি। ধন্যবাদ সঙ্গীতাঙ্গনকে।

সঙ্গীতাঙ্গন : দাদা আপনার সাথে আজ অনেক কথা হবে। অনেক কিছু জানতে চাইবো। দয়া করে কিছু মনে করবেন না। আমি প্রথমে আপনার মুখে শুনতে চাই কেমন করে কিভাবে সঙ্গীত জীবনের সূচনা করেন?

চন্দন দত্ত : আমি যখন ছোট বয়স সাতের মতো হবে তখন দেখতাম আমার কাকাতো বোনরা গান শিখতো। আমি তাদের সাথে বসে তাদের গান শুনতাম। শুনতে শুনতে আমার গানের প্রতি একটা প্রেম একটা ভালো লাগা ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল। আমার বাবা ছিল একজন ডাক্তার। তিনি ঐ সময় এক ধরনের একটি ইন্জেকশন ছিল যা রুগীদের দিতেন। ইন্জেকশনের বোতলটা ছিল কাচের এবং অনেক শক্ত। আমি সেখান থেকে দু’টো বোতল নিয়ে তাদের গানের সময় তাল দিতাম। ছোট মানুষ হাত ছোট তবলা ধরতে পারবো না তাই, আমার বয়স যখন ৮- ৯ বছর তখন আমাকে এক জোড়া তবলা কিনে দেওয়া হয়। আমার বোনের ওস্তাদ যার কাছে আমার বোনরা শিখতো তাদের সাথে শিখতে বসে যাই। ওস্তাদের নাম হলো আবুল কাশেম। ওনার কাছেই আমার হাতে খড়ি তবলায়। ওনার কাছে আমি এক বছর তালিম নেই। তারপর কঁচিকাচার আসর নামে একটি শিশু সংঘটন ছিল নেত্রকোনায়।
প্রাথমিকভাবে সেখানে আমি শিখতে শুরু করি। আস্তে আস্তে বড় হলাম এবং একটি সংঘটনের অনুষ্ঠানে আমি প্রথম স্থান অর্জন করি। শিল্পকলাতেও আমি প্রথম স্থান অর্জন করেছিলাম। তারপর ১৯৭৫ সালে আমি উন্নত প্রশিক্ষন আর পড়ালেখার জন্য ঢাকায় চলে আসি। ঢাকার একজন ওস্তাদ খুরশীদ আলী খান সাহেবের কাছে তালিম শুরু করি। আমি আধুনিক গানের সাথে বাজাতে সাচ্ছন্দবোধ করতাম। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চেয়ে বেশি ভালো লাগতো আধুনিক গান। রেডিওতে যে বাজনা বাজাতো সেটা শুনে শুনে বাজাতাম। ১৯৭৬ সালে প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জনাব মুহাম্মদালী সিদ্দিকি সাহেব ওনার কাছে আমার এক বড় ভাই গান শিখতো। তার কাছে একটা চিঠি লিখে বলে আমার ছোট ভাই ভালো তবলা বাজাতে পারে দেখুন কিছু করা যায় কিনা তার জন্য। জনাব মুহাম্মদালী সাহেব ছিলেন একজন আধুনিক গানের নামকরা শিল্পী। ওনার সহযোগীতায় আমি তবলা প্রচার ও শিখা শুরু করি। তারপর ১৯৮১ সালে রেডিও বেতারে অনিয়মিত শিল্পী হিসেবে চান্স পেয়ে যাই। একজন সঙ্গীত শিল্পীর সহযোগীতায় চাকরীটা হয়। রেডিওতে চাকরী করার পরে শিল্পী মহলে একটা পরিচিত আসে। শিল্পীরা আমাকে আর বাজনা দুটোই পছন্দ করে।
সে ভালোবাসায় বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলম ও আবিদা সুলতানার সাথে কাজ করেছি ২৫ বছর। তাদের মাধ্যেমেই প্রথম আমি বিদেশে যাই। তারাই আমাকে সমস্ত শিল্পী সমাজে পরিচয় করিয়ে দেয়।

সঙ্গীতাঙ্গন : কোন কোন শিল্পীর সাথে কাজ করেছেন?

চন্দন দত্ত : আমি অনেক শিল্পীদের সাথে কাজ করেছি। তাদের মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন, সৈয়দ আব্দুল হাদী, সুবীর নন্দী, মরহুম মাহমুদুন নবী, মুহাম্মদালী সিদ্দিক সাহেব, আব্দুর রউফ, বশির আহাম্মেদ, ফরিদা পারভীন, আবু জাফর, ফিরোজা বেগম, মেহেদী হাসান, এন্ড্রুকিশোর,মান্না দে। তারা আমাকে আর্শিবাদ ও প্রশংসা করেছে।

সঙ্গীতাঙ্গন : এ পর্যন্ত কোন কোন দেশে সফর করেছেন?

চন্দন দত্ত : শো করেছি বিভিন্ন দেশে। সর্বপ্রথম আমি শোতে যাই ১৯৮৮ সালে ভারতে। তার পর লন্ডন, আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, উজবেকিস্তান, পাকিস্থান, নরওয়ে, সুইডেন, কাতার, কুয়েত, মালেয়শীয়া, সিঙ্গাপুরসহ আরো বিভিন্ন দেশে।

সঙ্গীতাঙ্গন : এ পর্যন্ত কতশত গানে তবলা বাজিয়েছেন?

চন্দন দত্ত : ১৯৮৩ সালে সত্য শাহার সাথে আনার কলি চলচ্চিত্রে কাজ করি। ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’ শিল্পী রুনা লায়লা গেয়েছেন গানটি। সেটাই ছিল আমার চলচ্চিত্রের প্রথম কাজ। মিউজিক অফ রোমাঞ্চ নামে একটি সিডি করেছি। ইউটিউবে আছে সেটা। সেটার সঙ্গীত পরিচালনা আমি নিজেই করেছি। এবং তবলাও বাজিয়েছিলাম আমি। চলচ্চিত্রে তিন শত’র মত গানে বাজিয়েছি হবে। ১৯৮২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজারের মত স্টেজ শো করেছি।

সঙ্গীতাঙ্গন : কার অনুপ্রেরণায় সঙ্গীত সাধনায় তবলা বাজানোর সিদ্ধান্ত নিলেন?

চন্দন দত্ত : আমার বাবা খুব ভালো ঢোল বাজাতো। আমার বাবাই আমার অনুপ্রেরণা। আমার বড় ভাই, ছোট কাকা, বড় বোন, তারা ছিল সঙ্গীত শিল্পী। তারাই আমার অনুপ্রেরণা।

সঙ্গীতাঙ্গন : আমি আপনার কাছে আপনার গুরদের কিছু কথা শুনতে চাই।

চন্দন দত্ত : আমার প্রচারমুখী গুরু আবুল কাশেম। আমার কাকা গোপাল দত্ত তিনিও আমাকে তালিম দেন। তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিল্পী। তারপর নেত্রকোনা কলেজের এক অধ্যাপক শাজাহান কবির তার অনুপ্রেরণায় আজ আমি তবলা বাদক হিসেবে দাড়িয়েছি।

সঙ্গীতাঙ্গন : আপনার কাছে জানতে চাই আমাদের দেশের সঙ্গীত জগৎ বিষেশ করে মিউজিকের উপর কি কি পৃষ্টপোষকতা করা জরুরী বলে আপনি মনে করেন?

চন্দন দত্ত : একটা গুরুত্ব্যপূর্ণ প্রশ্ন। পৃষ্টপোষকতা যারা করছেন তারা হয়তো এ বিষয়টাকে গভীর থেকে চিন্তা করছেন না। এটা আমার মনে হয়। বেহেলা,সেতার, তবলা, বাঁশি এই ধরনের একস্টিক যন্ত্রবাদকের অসম্ভব সংকট দেখা দিচ্ছে। এধরনের যন্ত্র শিখতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী না। এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বেড এলার্ম। বাংলদেশের শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক জনাব লিয়াকত আলী, তিনি চেষ্টা করছেন কি ভাবে একস্টিক যন্ত্রটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আশা করি উনার যে প্ল্যান আছে সে অনুযায়ী কাজ করলে আশানুরুপ ফল পাবো। বাংলাদেশ মিউজিশিয়ান ফাউন্ডেশন নামে একটা সংঘটন আছে। সেটার সহ-সভাপতি আমি। আমিও চেষ্টা করছি সরকারের সাথে কথা বলে কিছু একটা করা। এ ব্যাপারে সরকার ও খুব আন্তরিক। তিনিও ভাবছেন কি করে এর দ্রুত উন্নয়ন করা যায়। এর জন্য একটা প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এখন শিক্ষার্থীরা একস্টিক যন্ত্র শিখতে চায়না। এক বছর ছয় মাস চর্চায় কি আর একস্টিক যন্ত্র শিখা যায়? এজন্য তারা আগ্রহী হয়না।

সঙ্গীতাঙ্গন : আপনি কি সঙ্গীতাঙ্গনের মাধ্যমে কিছু বলতে চান?

চন্দন দত্ত : আমি একটা কথাই বলবো সঙ্গীতাঙ্গনের যে শ্রষ্ঠা। যে প্রধান সম্পাদক তার একটা মহৎ কাজের ফসল আমরা ভোগ করছি। অনেক কষ্ট করে সে দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকাটি চালিয়ে আসছে। আমরা সব সময় তার পাশে থাকবো। তার এই মহৎ কাজে আমরাও এগিয়ে আসবো। তাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এ কাজের জন্য। তার জন্য মানুষ আজ আমাদের মতো মিউজিশিয়ানদের জানবে চিনবে। এই পত্রিকার জন্য শুভ কামনা।

সঙ্গীতাঙ্গন : আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা আমাদের কে সময় দেবার জন্য। শুভ কামনা রইলো আপনার জন্য। ভালো থাকেন সুস্থ থাকেন। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: