আমার জন্ম বোধ হয় বাশিঁ বাজানোর জন্যই – গাজী আব্দুল হাকিম…

বিচিত্র এই পৃথিবীতে অনেক ধরনের প্রেমিক আছে। একেক প্রেমের পথ চলা একেক ভাবে। কেউ কেউ প্রেমে পড়ে টাকা-পয়সার। কেউ প্রেমে পড়ে বিলাসিতার। কেউ বা প্রেমে পরে ক্ষমতার। আবার কেউ প্রেমে পড়ে সুন্দরী মেয়ের। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু প্রেমিক আছে যারা প্রেমে পড়েছে সঙ্গীতের। নিজের জীবনের চাইতে বেশি ভালোবাসে সঙ্গীতকে। সঙ্গীতের প্রেম সাধনায় কাটিয়ে দেয় তাদের জীবন। এতো ভাব আর আবেগে ডুবে রয় সঙ্গীত প্রেমীকেরা। তেমন এক বিশ্ব প্রেমীক আমাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ, হৃদয়ের মানুষ, ভালোবাসার মানুষ বাঁশি বাদক ওস্তাদ গাজী আব্দুল হাকিম। তার সাথে কথা হয় সঙ্গীতাঙ্গনের।

জীবনের গল্প শুরু হয় তার বাঁশি বাজানো শিখার অজানা কথার মাধ্যেমে। তিনি শুরুটা করেন এভাবে, বাড়িতে কেউ গান-বাজনার সঙ্গে জড়িত না। তবে কলের গানে আব্বাস উদ্দীনের গান খুব শুনতেন আমার মা। গুনগুন করে গাইতেন ‘ওরে আমার গহিন গাঙের নাইয়া’। মায়ের অনুপ্রেরণায় বাঁশিকেই প্রতিদিনের সঙ্গী করে নেই আমি। আমার জন্ম হয়েছে বোধ হয় বাঁশি বাজানোর জন্য।’ বাঁশির সঙ্গে বন্ধুত্বটা কীভাবে হলো – জানতে চাইলে ৬২ ছুঁই ছুঁই গুণী বাঁশি শিল্পী এভাবেই শুরু করলেন। খুলনার ডুমুরিয়া আমার গ্রামের বাড়ি, সেই এলাকাটি হিন্দু-অধ্যুষিত। প্রতিবছর পূজা-পার্বণে মেলা বসত। মেলায় কীর্তন, বাউলগানের আসর হতো। সবাই ছুটতেন সেই গানের আসরে। আর আমি দলছুট হয়ে খুঁজতাম বাঁশির দোকান, বাঁশি কেনার আশায়। চার-পাঁচ বছর বয়সেই হাতে তুলে নেই বাঁশি। বাড়ির পাশে শ্রীনদী। কখনো নদীর পাড়ে বসে, কখনো সেই নদীতে নৌকা ভাসিয়ে গলুইয়ে বসে বাঁশি বাজিয়ে চলেছি। প্রকৃতির প্রেমে বাঁশি বাজিয়ে চলতাম সময়কে থামিয়ে।

গাজী হাকিম বলেন, আমার চারু কাকার বাড়িতে খুব গান হতো। কাকাও বাঁশি বাজাতেন। তাঁর কাছেই প্রথম হাতেখড়ি হলেও আমার প্রথম শিক্ষা গুরু মুকুল বিশ্বাস। দুই গ্রাম পেরিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে রোজ বাঁশি শিখতাম। একসময় মুকুল বিশ্বাস চলে যান ভারতে। এরপর তালিম নেই দুলাল বাবুর কাছে। ১৯৭৪ সালে বাঁশি শিল্পী হিসেবে খুলনা বেতারে যোগ দেই আমি। রেডিওতে বাজানোর পাশাপাশি তালিম নিয়েছি ওস্তাদ আলী আহমেদ ও বিনয় রায়ের কাছে। একসময় বদলি হয়ে চলে আসি ঢাকায়।

গাজী আব্দুল হাকিম বলেন, ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে আমি ঢাকা বেতারে যোগ দিই। একই সময়ে যোগ দিই আলাউদ্দিন লিটল অর্কেস্ট্রাতে। রেডিওর পাশাপাশি শুরু হয় চলচ্চিত্র আর অডিও এ্যালবামে নিয়মিত বাজানো। চলচ্চিত্রে খান আতাউর রহমান, সত্য সাহা, আজাদ রহমান, আলম খান, আনোয়ার পারভেজের মতো গুণী সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি অনেক। অডিওতে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদি মহম্মদ, অজিত রায়, কলিম শরাফীর রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম এ্যালবামগুলোতে একাই বাজিয়েছি। দেশের বাইরে প্রথম কলকাতা গেলেও স্মরণীয় সফর ছিল স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ফেরদৌসী রহমান আর রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সঙ্গে। এক মাসের সেই সফরে এরপর যাই লন্ডনে। গত ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, হল্যান্ড, ফ্রান্সসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশে বাজিয়েছি। এ পর্যন্ত বিশ্বের বেশ ক’টি দেশে তাঁর একক এবং ফরিদা পারভীনের সঙ্গে যুগলবন্দী অনুষ্ঠান হয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনের হাউস অব কমন্সে, প্যারিসের লা ভেলি থিয়েটারে ফরিদা পারভীন ও তাঁর যুগলবন্দী হয়। এই অনুষ্ঠানগুলোর ডিভিডিও বেরিয়েছে বলে জানান তিনি।

গাজী আব্দুল হাকিমের দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে মিতা আইনে এলএলবি শেষ করে এলএলএম করছেন। রেডিওতে আধুনিক ও পল্লিগানের তালিকাভুক্ত শিল্পী। ছোট মেয়ে রীনা আর ছেলে সুমন এমবিএ পড়ছেন। বাংলাদেশ মিউজিশিয়ানস ফোরামের সভাপতি, বাংলাদেশ বেতার নিজস্ব শিল্পী সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল গাজী আব্দুল হাকিম স্বপ্ন দেখেন একটি মিউজিশিয়ান ক্লাব করার। বললেন, ‘আমাদের যন্ত্রশিল্পীরা অবহেলিত। তাঁদের জন্য একটি ক্লাব করতে চাই, যেখানে তাঁদের জন্য সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি একটি সঙ্গীত একাডেমি ও অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রগুলোর সংগ্রহশালা করতে চাই। সঙ্গীত একাডেমিতে নতুন প্রজন্মকে অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখানো হবে। কারণ, অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজটি এখনই শুরু করতে হবে। আমরা তার এই মহৎ কাজের জন্য তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষথেকে তার দীর্ঘ জীবন কামনা করি। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *