ভিন্ন ধর্মী যন্ত্রবাদক একরাম হোসেইন…

একতারা দোতারা, সেতার, তবলা, ঢোল, মাদল, বীনা, গীটার, হামোনিয়াম, বেহেলা, এসরাজ, বাশিঁ, ঝাজড়া, সহ আরো কিছু যন্ত্র আছে যা একষ্টিক ইন্সট্রুমেন্ট যন্ত্র বলে পরিচিত। এই যন্ত্রগুলো হলো আমাদের সঙ্গীতের ঐতিহ্য। ৬৮ হাজার গ্রামের দেশ আমাদের সোনার বাংলাদেশ। সবুজ শ্যামল ছাঁয়ায় ঘেরা মায়া ভরা আমাদের এই সোনার বাংলা। আমরা বাঙ্গালী আর সঙ্গীতে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য হলো একতারা, দোতারা, বাজিয়ে বাউল, ঝাড়ি- সাড়ি, ভাটিয়ালী, মুর্শেদী গান গাওয়া। বাংলার প্রানের সুর এই ধরনের একষ্টিক যন্ত্রগুলো। এই ধরনের যন্ত্র আমাদেরকে বাঙ্গালী বলে পরিচিত করে দেয় বিশ্ব মানচিত্রে। আর এই যন্ত্র যারা রপ্ত করেছেন তাদের অনেকেই আজ প্রয়াত। যাদেরকে হারিয়ে আমরা হারাতে বসেছি আমাদের এই যন্ত্রের ব্যবহার। এই ধরনের যন্ত্র যারা বাজায় বা বাজাতো তাদের জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে বুক ভরা ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। তাদের মধ্য থেকে একজন গুণী যন্ত্রশিল্পীকে নিয়ে আলাপ করছি।

তার অতীত ও বর্তমান কিছু কথা শেয়ার করতে কথা হয় সঙ্গীতাঙ্গনের। আর তিনি হলেন সবার পরিচিত সঙ্গীত যন্ত্রবাদক ওস্তাদ যিনি শিল্পকলাতে আছেন দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে। আমাদের এক ভিন্ন ধর্মী যন্ত্রশিল্পী এই গুণী মানুষটি হলেন এসরাজ বাদক এ এফ এম একরাম হোসেইন। যার বেচেঁ থাকার মধ্যেদিয়ে বেঁচে আছে দেশের মায়াবী সুরের একটি আকর্ষনীয় যন্ত্র এসরাজ। তার সাথে কথা বলে জানলাম যে এসরাজ আসলেই একটি অন্যরকম যন্ত্র। যা কেবল রবীন্দ্র সঙ্গীতে বাজানো হয়। কিন্তি তিনি এটা আধুনিক গানের সাথেও বাজিয়েছেন অনেক। কিভাবে তিনি এই যন্ত্র শেখাটা রপ্ত করলেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পরিবারে বাবা সঙ্গীতের সাথে ছিলেন মূলতঃ তার অনুপ্রেরণায় আমি এসরাজ বাজানো শিখি। আমার বাবা খুলনা বেতারে কাজ করতেন। তিনি খুব ভালো তবলা বাজাতেন। কিন্তু তিনি আজ আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৯৩ সালে। বাবার আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় আজ আমি এ অবস্থানে আসতে পেরেছি। তবে আমার প্রথম ছিল ওস্তাদ সাধন সরকার। ওনার কাছেই অনেক দিন শিখি। তিনি আমাকে গাইড লাইন দেন। তার পর আরেকজন ওস্তাদের কাছে কিছু দিন শিখলাম। আমাদের সময় বিশেষ কোন ওস্তাদ ছিলনা। আমার এক ওস্তাদ আমাকে বলেন যে এটি আমাদের দেশে বেশী ব্যবহার হয়না সুতরাং যতটুকু শিখেছো তা দিয়েই চলবে আর শিখার দরকার নেই। তার সাথে আমার পরিচয় হয় ৮০ দশকের সময়। যন্ত্র শিখতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু তবুও আমি এখনো দুটি যন্ত্র নিয়ে আছি। এসরাজ এর পাশাপাশি আমি তবলা বাজাই। তবলাও শিখেছি আমি ভালো একজন গুরুর কাছে। দেশে বিদেশে আমি তবলা বাজিয়ে অনেক সুনাম অর্জন করি।

মানুষের প্রতিভা কত সুদূর প্রসারী তা না দেখলে বিশ্বাস করার যায়না। এসরাজ বাদক একরামের কাছে জানতে চাই তার প্রোফেশনাল বাজানোর ইতিহাস জবাবে বলেন আমি সর্বপ্রথম খুলনাতে বাজাই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত। আগষ্টের মাসের ৯ তারিখ জাপান যাচ্ছি, বাংলাদেশে দুই জন আছে এসরাজ নিয়ে আমরা যাচ্ছি। এ পর্যন্ত কার কার প্রোগামে বাজিয়েছেন শুনতে চাইলে বলেন আমি আইয়ুব বাচ্চুর সাথে বাজিয়েছি। সাম্প্রতিক বাপ্পা মজুমদারের গানে বাজিয়েছি। হাবিবের একটা সোলো এ্যালবামে আমি বাজাই যার মাধ্যেমে আমাকে সবাই চিনে। সেটা ছিল হাবিবের প্রথম একক সোলো এ্যালবাম যার নাম ছিল “শোন” তখন থেকে মানুষ এই যন্ত্রটাকে চিনলো এবং আমি পরিচিত হতে পারি। আধুনিক গানের সাথেও যে এসরাজ বাজানো যায় তখন থেকে মানুষ বুঝতে পারে। টিভিতে কি কাজ করেছেন? জবাবে বলেন যে বিটিভিতে “গীতিবিতান” নাসে একটা রবীন্দ্র সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে আমি নিয়মিত বাজাই। এছাড়াও দীপ্ত, সময়, এনটিভি, আর টিভি, কম বেশি সব চ্যানেলেই বাজিয়েছি এখনো বাজাই।
চলচ্চিত্রে বাজানো সম্পর্কে তিনি বলেন সর্বপ্রথম সত্য সাহার চলচ্চিত্রে বাজিয়েছি। রুনা লায়লা, শাকিলা জাফর, হাসন রাজা, বাপ্পা মজুমদার, আইয়ুব বাচ্চু আরো অনেকের সাথে কাজ করেছি। তার কাছে জানতে চাই পারিবারিক ভাবে কে কে সঙ্গীতে যুক্ত আছে? তিনি বলেন আমি তবলা আর এসরাজ বাজাই, আমার ছোট ভাই তবলা বাজায়। আমার বাবা ও তবলা বাদক ছিলো। আমার ছেলে তবলা বাদক। সে এখন এমবিএ পড়ছে। এটাই আমার পরিবারেরর সঙ্গীত পরিচয়। বর্তমান সঙ্গীতের অবস্থা সম্পর্কে বলেন প্রথম যখন আমরা শিল্পকলাতে আসি তখন আমরা ছিলাম ২২ জন। তার মধ্যে থেকে আজ কয়েকজন আমাদের মাঝে আছে কেউ কেউ প্রয়াত আবার কেউ রিটায়ার আছেন। এখন যদি কেউ পাঁচ জন তবলা বাদক চায় পাওয়া যাবেনা। পাচঁ জন সেতার বাদক চায় পাওয়া যাবেনা পাওয়া গেলেও কষ্ট হবে। তাহলে বুজাই যাচ্ছে অবস্থা বেশি ভালো না। হারিয়ে যেতে
বসেছে। আফসোসের বিষয় আমাদের সঙ্গীতের ঐতিহ্য আজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কি-বোর্ডের মাধ্যেমে সব যন্ত্র বাজানো যায়। কি-বোর্ডের জন্য আজ নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের পুরনো ঐতিহ্য। এটা ফিরিয়ে আনা আমাদের প্রোয়োজন। আমরা সবাই একযোগে কাজ করলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সঙ্গীতাঙ্গনের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন। আমরাও বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই যন্ত্রগুলোকে বাচিঁয়ে রাখতে আহবান করছি। আমাদের এই গুণী যন্ত্রশিল্পী আসছে ডিসেম্বরে অবসর গ্রহন করবেন বলে জানান। আমরা তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষথেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *