Press "Enter" to skip to content

শিল্পী জীবনের আত্নকথা…

‘অনেক সাধনার পরে আমি
পেলাম তোমার মন,
পেলাম খুঁজে এ ভুবনে
আমার আপনজন।
তুমি বুকে টেনে,
নাওনা প্রিয় আমাকে
আমি ভালোবাসি,
ভালোবাসি – ভালোবাসি তোমাকে।’

জনপ্রিয় এ গানের শিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। আধুনিক গান, নজরুল সঙ্গীত, লোকগীতি, সিনেমার গান সব ধরনের গানে সমান তালে অভিষেক ঘঠিয়েছেন কনকচাঁপা। চলচ্চিত্র, আধুনিক, নজরুল সঙ্গীত, লোকগীতি সহ সব ধরনের গানে তিনি সমান পারদর্শী। প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবেও হয়েছেন সম্মানীত। দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে সঙ্গীতের সাথে কাজ করছেন তিনি। এপর্যন্ত চলচ্চিত্রে গেয়েছেন তিন হাজারেরও বেশী গান। প্রকাশীত হয়েছে ৩৫টির মতো একক এ্যালবাম। প্রকাশিত সর্বশেষ এ্যালবাম ‘আবার এসেছি ফিরে’। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী বশির আহাম্মেদর ছাত্রী। দীর্ঘদিন তার কাছে তালিম নিয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় সঙ্গীতের জন্য কাজ করেছেন এ গুণী শিল্পী। দুঃখজনক হলেও সত্য কিছু কথা তিনি তার শিল্পী জীবন থেকে আমাদের কাছে শেয়ার করেছেন। শিল্পীরা দেশের প্রয়োজনে যতদিন লাগে ততদিন তাদের মূল্য থাকে কিন্তু প্রয়োজন শেষে তাদেরকে আর কেউ মনে রাখেনা। সেই অভিমানে তিনি তার ফেসবুক পেইজে কিছু কথা লিখেছেন এভাবে –

বন্ধুরা আজ আট বছর হল আমি এই ফেসবুকে তোমাদের সাথে আছি, খুব কম সময় আমি শিল্পী হিসেবে কথা বলি কারন আমি শিল্পী হলেও আসলে তোমাদেরই মত একজন। যাইহোক আজ একজন শিল্পীর প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু কথা বলি। তোমরা কিছু মনে করো না। তারপর তিনি লিখেন, বাংলাদেশে একটি পরিবারে যখন একজন শিল্পী জন্ম নেয় প্রথমত বাবা মা তা আমলেই নেননা। তারা যদি আমলেও নেন দেখা যায় হয়তো তারা অর্থনৈতিক ভাবে অক্ষম তার ঘরে জন্মানো শিল্পীকে গড়ে তুলতে। অনেক সময় বাবা মা যদিও সেই সন্তান কে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর হন দেখা যায় তার সেই বিষয়ক কোন সঠিক শিক্ষা ইন্সটিটিউট নেই। কিছু পরিবার আছে সন্তান গান নাচ অভিনয় শিখতে চাইলে তাকে ত্যাজ্য করেন! শিল্পী তখন নিজের জীবন নিজে গড়ে খেয়ে না খেয়ে। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক আবেগপ্রবণ না হলে কেউই এই অনিশ্চিত জীবনে পা দেন না। কারণ শিল্পীর যতই প্রতিভা থাক তার উপযুক্ত পারিশ্রমিক কখনোই পান না বিশেষ কররে বাংলাদেশে। আর এটাও সত্যি যে একজন শিল্পী কখনো আর দশটা চাকুরীজীবী মানুষের মত হিসেবি হতে পারেন না। তা পারলে তিনি এই অনিশ্চয়তার জীবন বেছেই নিতেন না। ধরা যাক একজন মানুষ অনেক অনিশ্চয়তার পর শিল্পী হলেন, পায়ের নীচে মাটি আসলো, তখনও কিন্তু তিনি শিল্পীর দায়িত্বে ব্যস্ত। ব্যংকে কয় টাকা জমলো এই হিসেব শিল্পী করেন না বেশির ভাগ। সেই ধাঁচেরই তিনি নন। উপরন্তু তাকে শিল্পীর ঠাটবাট বজায় রাখতে
অনেক কিছুতেই, নিজেকে, নিজের বাসস্থানকে সাজাতে হয় যা তার আসল বিত্তে পড়েনা। বাংলাদেশীরা একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে কখনোই পাবলিক বাসে দেখা পছন্দ করেন না। তারা শিল্পীদের একটা ফ্যান্টাসি ভাবনায় জড়াতে পছন্দ করেন। শিল্পীরাও সেই ভাবনার জালে পা দিয়ে মিথ্যা স্টারইজম এ ঢুকে পড়েন।

এখানে বলে রাখি বাংলাদেশের শিল্পীরা এখনো রয়ালটি পান না যা তার একান্তই প্রাপ্য। একজন প্লেব্যাক সিঙ্গারের কত গান রেডিও টিভিতে বাজে তার হিসাব জনগণ জানেন কিন্তু সরকার শিল্পীর সাথে সে হিসাব চুকান না। একজন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী যতকিছু পেতে পারেন বাংলাদেশের শিল্পীরা কি সবটা পাচ্ছেন?

শিল্পী যতদিন কাজে ব্যস্ত থাকেন ততদিনই তার হাতে পয়সা থাকে এবং সেটা সরকারি চাকুরীজীবীর মত লম্বা সময় ধরে না। বেশিরভাগ শিল্পীরই স্থায়ীত্ব কাল বড়জোর পনের বছর। এর পর শুরু হয় তাকে ছুঁড়ে ফেলার পালা। শিল্পী সিনিয়র হতে না হতেই তাকে ত্যাগ করা বাংলাদেশের শ্রোতা, দর্শক, এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদঅভ্যাস। সেক্ষেত্রে শিল্পী খুব শীঘ্রই বেকার হয়ে পড়েন। মধ্য বয়স আসার আগেই তিনি ব্রাত্যজীবন এ চলে যান। মন শরীর দুটোই ভেংগে পড়ে।

এইবেলা শিল্পী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। হয়তো সবাই না কিন্তু অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধির কবলে পড়েন। ভেজাল খাবার খেয়ে বাংলাদেশের সব মানুষেরই এখন শেষ অধ্যায় দুরারোগ্য ব্যাধি। কিন্তু ওই যে কারণে তিনি যৌবনে খবর হতেন ঠিক সেই একই কারনে এই দুরারোগ্য ও লোকমুখে ছড়াতে সময় লাগেনা। শিল্পী তার সহায় সম্বল হারান, জনপ্রিয়তা তো আগেই হারিয়েছেন, এখন তার পাওনা সরকারের সামান্য কিছু সহায়তা এবং অতি আগ্রহী পাবলিকের তিরস্কার। এই হল শিল্পীর ভবিতব্য! যে সময়ে সামান্য কিছু সহানুভূতি পাওয়ার কথা সেই সময়ে পাচ্ছেন দুস্থ শিল্পী উপাধি।

আমার ইচ্ছা করে এই প্রার্থনা করতে যে এই দুনিয়াতে কেউ যেন শিল্পী হয়ে না জন্মায়। পড়ে থাক এই পৃথিবী গানহীন, সুরহীন, বাগানে না ফুটুক ফুল, পাখি চলে যাক অন্য কোনও দেশে। আর সব সন্তানরা চাকুরী করে পয়সা জমিয়ে নিশ্চিত জীবন যাপন করুক। মন্দ কি!

হে পাবলিক! মনে রাখবেন এই শিল্পী নামক বেওকুফ জাতির মানুষ গুলো কখনোই সমাজে বেশী ছিলেন না। তারা অল্প সংখ্যক এবং ক্ষনজন্মা। তাদের জন্য এতো ভাবনা এতো আলোচনার কি দরকার! দেশের জনগনের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, শিল্পীকে সরকার বা কেউই তৈরি করেন না, পৃষ্ঠপোষকতাও করেন না কখনোই। সবার সৌভাগ্য যে তাদের আমলে একজন শিল্পী জন্ম নেন আর তার কৃতকর্মের ফল হিসেবে গান কবিতা সাহিত্য এই সমাজকে কল্যাণময় করে গুছিয়ে রাখে। কথাগুলো তিনি যদিও আবেগের বসবতি হয়ে বলেছেন কিন্তু একশত ভাগ সত্যি। আবার এও সত্যি যে ব্যবহার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই আমরা এক হয়ে আজ এই অবহেলীত শিল্পী সমাজ কে হতাশা নিয়ে নয় আশা নিয়ে বেচেঁ থাকার স্বপ্ন দেখাবো। বাংলাদেশের সমস্ত শিল্পী সমাজের জন্য সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভকামনা ও আন্তরিক ভালোবাসা জানাই। সবাই সুস্থ্য সুন্দর আর আনন্দের জীবন অতিবাহিত করুক। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: