ফরিদা ইয়াসমিন এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ…

জন্মিলে মরিতে হবে
এই দুনিয়া ছাড়তে হবে
দু’দিন আগে পড়ে,
সাজাইয়া নতুন সাজেঁ
রাখিবে আধার কবরে।।
এটা চিরন্তন সত্য কথা, মানুষ পৃথিবীর বুকে আগমন করবে এবং কোন এক সময় আবার চলে যাবে সৃষ্টিকর্তার ডাকে সারা দিয়ে আপন ঠিকানায়। যুগে যুগে এই নিয়মই চলে আসছে। পৃথিবীর বুক থেকে চলে যায় চিরদিনের জন্য। তবে কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের কর্ম তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে হাজার বছর ধরে। তেমনি একজন প্রখ্যাত গুণী সঙ্গীত শিল্পী ফরিদা ইয়াসমিন। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী সাবিনা ইয়ামিন এর আপন বোন।

তার কর্ম তাকে আজ আমাদের মাঝে বাচঁয়ে রেখেছে। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত এক দশক জুড়ে চলচ্চিত্র ও বেতারের একজন জনপ্রিয় নিয়মিত সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা, উর্দু গান ও গজলে পারদর্শী ছিলেন। তার বিখ্যাত নগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘তুমি জীবনে মরণে আমায় আপন করেছো’, ‘জানি না ফুরায় যদি এই মধুরাতি’, ‘তোমার পথে কুসুম ছড়াতে এসেছি’, ‘খুশীর নেশায় আজকে বুঝি মাতাল হলাম’। তারা পাঁচ বোন, তাদের মধ্যে চার বোনই সঙ্গীত শিল্পী। তারা হলেন জনপ্রিয় খ্যাতনামা শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, নীলুফার ইয়াসমিন ও ফওজিয়া খান। ১৯৬২ সালে ফরিদা ইয়াসমিন অনুবাদক, প্রকাশক, এবং গোয়েন্দা কাহিনী লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে সাংসারিক ও অন্যান্য কারণে সংগীত থেকে সরে আসেন। এরপর তিনি অনিয়মিত ভাবে গান করতেন ও নব্বইয়ের দশকে এসে একেবারেই গান ছেড়ে দেন। খ্যাতনামা শিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনের জন্ম ১৯৪১ সালে সাতক্ষীরায় তার পৈতৃক নিবাসে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতার নাম ছিল লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম মৌলুদা খাতুন। পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তারা পাঁচ বোনের মাঝে ফরিদা ইয়াসমিন, ফওজিয়া খান, নীলুফার ইয়াসমীন এবং সাবিনা ইয়াসমিন সঙ্গীতাঙ্গনে স্বনামখ্যাত। চাকরি সূত্রে শৈশবে ফরিদা ইয়াসমিন বাবা-মায়ের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। সেখানেই শিল্পী দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে গানের তালিম নেন বলে জানা যায়। মায়ের কাছ থেকেও তিনি গান শিখেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ঢাকা ইডেন গার্লস কলেজে তিনি এক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করেন ও সেখানে তার গানে মুগ্ধ হয়ে সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার আবদুল আহাদ বেতারে গান করার পরামর্শ দেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি নিয়মিত বেতারে গান করা শুরু করেন। অল্পদিনেই তিনি ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেসময়কার বেতার মাধ্যমের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী ফেরদৌসী বেগম ও আঞ্জুমান আরা বেগমের সাথে তার নামও যুক্ত হয়। ১৯৫৯ সালে ওস্তাদ মতি মিয়ার কাছে গান শিখতেন ফরিদা ইয়াসমিন। সে বছর তার সহযোগিতায় ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের একটি গানে কন্ঠ দেয়ার মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে সংগীত শিল্পী হিসেবে অভিষেক ঘটে।
এরপর এক দশক ধরে তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রে কন্ঠ দেন। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাজা এলো শহরে’ চলচ্চিত্রে ‘জানি না ফুরায় যদি এই মধুরাতি’ গানটি গেয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি লাভ করেন।

ফরিদা ইয়াসমিন ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত নিয়মিত ভাবে চলচ্চিত্র ও বেতারের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সাংসারিক ও অন্যান্য কারণে সংগীত চর্চা থেকে দুরে চলে আসেন ও অনিয়মিতভাবে সংগীত পরিবেশন করেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে যার কারণে তাকে আমরা গত দু’বছর আগে পৃথিবীর আবাসভূমি থেকে হারিয়ে ফেলেছি। ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ও বিভিন্ন জটিল শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন আমাদের সবার প্রিয় এই গুণী শিল্পী। ঢাকার বনানী কবরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় সাহিত আছেন। চলে গেছে, চলে যাচ্ছে, চলে যেতে হবে সবাইকে আজ না হয় কাল। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে এই গুণী শিল্পীর রুহের মাঘফেরাত কামনা করি। তার কবরটা যেন শান্তির একটা বাগিচা বানিয়ে দেন। তার পরিবারের সবার জন্য দোয়া কামনা করি। সবাইকে যেনো আল্লাহ দীর্ঘায়ু দান করেন। এই শুভ কামনায়। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: