আজ খন্দকার নুরুল আলম এর ৭৮তম জন্মবার্ষিকী…

“চোখ যে মনের কথা বলে,
চোখে চোখ রাখা সেতো নয়।
চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে,
চোখের মতো চোখ থাকা চাই।
চোখ যে মনের কথা বলে”

একজন স্বনামধন্য বাংলাদেশী সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার। তিনি কণ্ঠশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রবেশ করলেও জনপ্রিয়তা লাভ করেন সঙ্গীত পরিচালনায়। দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে পরিচালনা করেছেন ছয় শতাধিক গান। চলচ্চিত্রের গানে অবদানের জন্য তিনবার বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। সঙ্গীতেও অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন। তিনি হলেন সবার পরিচিত খন্দকার নুরুল আলম।
তিনি ১৯৩৯ সালের ১৭ আগস্ট ভারতের আসামে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার শুভ জন্মদিন। তার বাবার নাম নেসারউদ্দিন খন্দকার। তিনি ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও মা ফাতেমা খাতুন। তার ছেলেবেলা কাটে আসামের গোয়ালপাড়ায়। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ১৯৫৪ সালে ঢাকায় এসে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। এরপর অধ্যয়ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে। এখানে পড়াকালীন তার সুর ও সঙ্গীতে আগ্রহ জন্মে এবং তার সঙ্গীত প্রতিভার কথা ছড়িয়ে পড়ে। খন্দকার নুরুল আলম তার কর্মজীবনের শুরু থেকে আছেন বাংলাদেশ বেতারের সাথে। ১৯৫৯ সালে বেতার আয়োজিত “নব মঞ্জুরী” নামক অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন। এতে অংশগ্রহন করেন সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহমতুল্লাহর মত শিশুশিল্পীরা। পরের বছর ১৯৬০ সালে তিনি গ্রামোফোন কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েসে যোগ দেন। সেখান থেকে তৎকালীন নামকরা কণ্ঠশিল্পীদের গান বের হয়। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সুচনা লগ্ন থেকেই আছেন। তার পরিচালিত “সুরবিতান” অনুষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। নুরুল আলম চলচ্চিত্রাঙ্গনে আসেন অগ্নিপরীক্ষা চলচ্চিত্রে “জীবন নদীর জোয়ার ভাটা” গানে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। তার চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা শুরু হয় উর্দু চলচ্চিত্র দিয়ে। তার প্রথম সুরকৃত চলচ্চিত্র ‘ইস ধরতি পার’। এছাড়া উর্দু উজালা চলচ্চিত্রের সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন ১৯৬৮ সালে ‘অন্তরঙ্গ’ ও ‘যে আগুনে পুড়ি’ দিয়ে। ‘যে আগুনে পুড়ি’ চলচ্চিত্রের “চোখ যে মনের কথা বলে” গানটি সে সময়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। চলচ্চিত্রের গান ছাড়াও নুরুল আলম আধুনিক গান, ফোক গান, দেশের গান, ও বিখ্যাত কিছু কবিতায় সুরারোপ করেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় ক্রীড়া সঙ্গীত, স্কাউট মার্চ সঙ্গীত, আনসার-ভিডিপি দলের সঙ্গীত, রোটারি ক্লাবের বাংলা ও ইংরেজি উভয় গানের সুর করেন। গীত রচনা এবং গানের স্বরলিপি ও স্টাফ নোটেশন করার কাজও করেছেন নুরুল আলম। খন্দকার নুরুল আলম ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের কিশোয়ার সুলতানার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই সন্তান। মেয়ে আমানি খন্দকার ও ছেলে আবীর খন্দকার।

তার সুরকৃত চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে, ইস ধরতি পার, ঠিকানা, উজালা, অন্তরঙ্গ, যে আগুনে পুড়ি, জলছবি, জীবন তৃষ্ণা, ওরা ১১ জন, সংগ্রাম, চোখের জলে, শত্রু, পিঞ্জর, কাজল লতা, স্মাগলার, দেবদাস, আঁধারে আলো, চন্দ্রনাথ, শুভদা, রাজলক্ষী শ্রীকান্ত, বিরাজ বৌ, বিরহ ব্যাথা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, শঙ্খনীল কারাগার, আজকের প্রতিবাদ, শাস্তি, ইত্যাদি। একুশে পদক পেয়েছেন তিনি ২০০৮ সালে। তার পর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বিজয়ী হন সাত বার। তারমধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – চন্দ্রনাথ শুভদা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, বাচসাস পুরস্কার – দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি পুরস্কার – পদ্মা মেঘনা যমুনা ইত্যাদি। এছাড়া ও আছে হসবাংকা আন্তর্জাতিক পুরস্কার – ১৯৮৬, শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মৃতি পুরস্কার, রাজা হোসেন খান স্মৃতি পদক – ১৯৯৪, সরগম ললিতকলা পদক – ২০০৩, ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ বিজয়ী: আজীবন সম্মাননা – ২০১১।

খন্দকার নুরুল আলম মৃত্যুর আগে বেশ কিছু দিন নিউমোনিয়া ও ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স রোগে ভোগছিলেন। রাজধানী ঢাকার ধানমণ্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়। তিনি ২০১৬ সালের ২২শে জানুয়ারি পরলোক গমন করেন। জানাজা শেষে তাকে মিরপুরস্থ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। আমরা তার জন্মদিনের মাধ্যমে স্মরন করে তার রুহের মাঘফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাকে স্বর্গবাসী করুক। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষথেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: