একই সুরে গাঁথা, ‘পাহাড়ী’ রাগের জাদু – মীর শাহ্‌নেওয়াজ…

আজ শুনবো ‘পাহাড়ী’ রাগ নির্ভর সৃষ্ট গান ও যন্ত্রসঙ্গীত। রাগ অনুসরণ করেই গানের সৃষ্টি হয়। গান শোনার সত্যিকারের মজাটা যদি পেতে চান, তাহলে ক্লাসিক্যাল (শাস্ত্রীয়) সঙ্গীত তৈরীর মূল ভিত্তি যে রাগ, এই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে শুধু ‘পাহাড়ী’ রাগ অনুসরণে সৃষ্ট ক্রমিক নম্বর ১ থেকে ১৭ পর্যন্ত গান ও যন্ত্রসঙ্গীতগুলো আপনাকে ক্রমানুসারে শুনতে হবে। আশা করি আপনি গান শোনার সেই সুখানুভুতিটি অবশ্যই পাবেন। গানগুলো শোনার সময় নজরুল সঙ্গীত “চুড়ীর তালে নুড়ির মালা” গানের সুরটি মাথায় রাখুন। কোথাও দেখতে পাবেন ভিডিও লিঙ্কের নীচে লেখা আছে ০০:৩৬ থেকে খেয়াল করুন অর্থাৎ যথার্থ সুরটা এখান থেকেই শুরু হচ্ছে।

গান শুনতে গানের সাথে দেয়া ভিডিও লিঙ্কে ক্লিক করুন।

রাগ সংশ্লিষ্ট ভিডিও ক্লিপ সমুহঃ

১. মীরাবাই ভজন
Paayo Ji Maine Ram Ratan Dhan Paayo / Lata Mangeshkar

২. যন্ত্রসঙ্গীত (বাঁশী) / অজয় প্রসন্ন
০৩:০৮ থেকে শুনুন

৩. ডোগরী গীত
Pal Pal Bai Jana Bai Jana Ho / Tahira Syed
০০:৫৯ থেকে শুনুন

৪. পাহাড়ী ধুন (বাঁশী) / পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া
শুরু থেকেই শুনুন এবং ০১:১৩ থেকে খেয়াল করুন

৫. যন্ত্রসঙ্গীত (সন্তুর) / পণ্ডিত শিব কুমার শর্মা
০১:০৮ থেকে শুনুন এবং ০১:৪৯ থেকে খেয়াল করুন

৬. ঠুমরী
Baton Baton Mein / Ustad Rashid Khan
শুরু থেকেই শুনুন এবং ০০:৩৯ থেকে খেয়াল করুন

৭. ঠুমরী
Rangi Saari Gulabi Chunariya / Kaushiki Chakrabarty
শুরু থেকেই শুনুন এবং ০০:১৯ থেকে খেয়াল করুন

৮. যন্ত্রসঙ্গীত (সন্তুর) / পণ্ডিত শিব কুমার শর্মা
০০:৩৬ থেকে শুনুন

৯. নজরুল সঙ্গীত
চুড়ীর তালে নুড়ির মালা / অনুরাধা পাড়োয়াল
ঝুমুরের আংশিক সংমিশ্রণ আছে
০০:৪৮ থেকে শুনুন

১০. হিন্দি ছায়াছবির গান
Chalo Dildar Chalo / Film: Pakeezah (1971)

১১. বাংলা আধুনিক
দূর কোন পরবাসে / শচীনদেব বর্মণ

১২. হিন্দি ছায়াছবির গান
Jo Vada Kiya Vo / Film: Taj Mahal (1963)

১৩. আমেরিকার লোকসঙ্গীত
Five Hundred Miles / The Hooters, an American rock band

১৪. গজল
Baat Karney Mujhe Mushkil Kabhi / Gayathri
০০:৪২ থেকে শুনুন

১৫. গজল
Dil Mein Ik Lehar Si Uthi Hai Abhi / Ghulam Ali
০১:১২ থেকে শুনুন

১৬. হিন্দি ছায়াছবির গান
Kora Kagaz Tha Ye Man Mera / Film: Aradhana (1969)
০০:৪৬ থেকে শুনুন

১৭ . হিন্দি ছায়াছবির গান
Neela Aasman So Gayaa / Film: Aradhana Silsila (1981)

ভুমিকাঃ

একই রাগের উপরে সৃষ্ট গানসমূহ সবসময় একসঙ্গে একই সুরের চলনে চলে, বলা যায় সৈনিকদের এক তালে মার্চ করে যাওয়ার মত করে চলে। কোন সঙ্গীত পরিচালক একটি নির্দিষ্ট রাগের উপর ভিত্তি করে যখনই একটি গান রচনা করেন তখন তিনি নিশ্চিত হয়ে নেন যে, তিনি সেই রাগের বন্দিশ ব্যবহার করছেন। বন্দিশ, সঙ্গীতের এমন একটি উপাদান যা একটি নির্দিষ্ট রাগের উপর ভিত্তি করে সুর সৃষ্টিতে প্রভাব বিস্তার করে।

একই রাগের উপর ভিত্তি করে সৃষ্ট দুটি গান শুনতে প্রায় একই রকম লাগে। মনে হয় গান দুটি সবসময় একই সুরকে অনুসরণ করছে, বুঝিবা একই সুরে গাঁথা। একটি রাগের উপর ভিত্তি করে সৃষ্ট কোন কণ্ঠশিল্পীর একটি গান রেডিও বা সিডি প্লেয়ারে শোনার সময়, রাগটি চিহ্নিত বা সনাক্ত করতে গানটি প্লেয়ার থেকে অন্তত ৩০ থেকে ৫০ ফুট দূরে থেকে শুনতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কাছাকাছি থেকে না শুনে বরং দূর থেকে শুনে গানের রাগটিকে সনাক্ত করা সহজ হয়ে পড়ে। এর কারণ, আপনি গানের উৎস থেকে যতই দূরে সরে যাবেন, ততই গানের কথা অস্পষ্ট হয়ে পরবে এমনকি এক পর্যায়ে গানের কথা একেবারেই শুনতে পাবেন না, শুধুমাত্র গানের সুরে আধিপত্য বিস্তারকারী নোট বা বন্দিশীটি শুনতে পাবেন।

একবার আপনি বন্দিশীটি শুনলে সহজেই প্রতিটি গানের মূল ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট রাগটিকে চিহ্নিত বা সনাক্ত করতে পারবেন। অবশ্যই এই কৌশল ব্যবহার করে রাগটি সনাক্ত করার চেষ্টা করার আগে রাগগুলির উপর আপনার কিছু মাত্রায় প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে। এইভাবে সঙ্গীতের ভেতরের লুকানো স্বাদ পরিপূর্ণভাবে আমরা গ্রহণ করতে পারি যদি এই প্রতিবেদনের ভিডিও ক্লিপগুলির গান বা যন্ত্রসঙ্গীত গুলো আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনি।

রাগের গঠন :

ভজন, গজল, ঠুমরী ইত্যাদির উপযুক্ত লোকসংগীত ভিত্তিক এই ‘পাহাড়ী’ রাগটি একটি জনপ্রিয় রাগ। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে বিলাবল ঠাটের অন্তর্গত এই বিশেষ রাগটি ক্লাসিক্যাল থেকে চলচ্চিত্র সংগীত, এমন বিভিন্ন ঘরানার সংগীত সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়। এই রাগে মিশে আছে প্রেম, ভালবাসা, বিষণ্ণতা ও নৈরাশ্যের ভাব।

পর্বত-চূড়ায় অধিবাসী মেয়েদের গাওয়া সুরেলা পাহাড়ী সুর থেকে ‘পাহাড়ী’ রাগ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলেন, রাগ ‘পাহাড়ী’ এসেছে, কাশ্মীর, হিমাচল, উত্তরখণ্ড থেকে। কেউ বলেন, আসাম বা নেপালের পাহাড়ী সুর থেকে। যখনই কেউ এই রাগভিত্তিক কোন কম্পোজিশন শুনবে, তখন মনে হবে কোন পাহাড়ের উপরে বসে সে তা শুনছে, পাহাড়ের নির্জন নৈঃশব্দই যেন ফুটে উঠছে।

একসময় এটি রাগ হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। তখন ধুন হিসেবেই চালানো হতো। তবে এখন ‘পাহাড়ী’ রাগ হিসেবেই স্বীকৃত এবং সেমি ক্লাসিক্যাল (শাস্ত্রীয়) সঙ্গীতে খুবই জনপ্রিয়।

শুধু ‘পাহাড়ী’ রাগই নয়, অনেকগুলো রাগের জন্ম হয়েছে লোকসঙ্গীত থেকে। রাজস্থানের লোকসঙ্গীত থেকে তৈরি হয়েছে রাগ ‘মান্দ’। হিন্দিভাষী ভূখন্ডের লোকসঙ্গীত থেকে জন্ম হয়েছে ‘পিলু’ রাগের।

আরোহণ: স র গ প ধ র্স
অবরোহণ : র্স ধ প গ প গ র স ধ্।
ঠাট : বিলাবল
প্রহর: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯ টা)
পকড় : গ, র স ধ্, প্ ধ্ স

শেষ কথাঃ

চলচ্চিত্রের গানের সুর রাগ-এর উপর ভিত্তি করে নয়; বরং রাগ-এর নোটের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করা হয়। চলচ্চিত্রের গানে রাগের বিশুদ্ধ রূপটি রাখার প্রয়োজন পড়ে না এবং অধিকাংশ সময় গানের ভিতর বিশুদ্ধ রূপটি পাওয়াও যায় না। এছাড়াও, গানের প্রথম অংশ (যেটাকে বলা হয় স্থায়ী অংশ) এক রাগের নোটে সৃষ্টি করা হতে পারে কিন্তু পরবর্তী অংশে (অন্তরা, সঞ্চারী এবং আভোগ) হয়তো অন্য আরেকটি রাগের নোট ব্যবহার করতে দেখা যেতে পারে বা আদৌ কোনও রাগ ব্যবহার করা হবে না। অনেক সংগীত পরিচালক রাগ-এর গঠন পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েও একটি গানেই বিভিন্ন রাগ-এর নোট ব্যবহার করে শ্রুতিমধুর একাধিক জনপ্রিয় গান আমাদের উপহার দিয়ে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: