শ্রদ্ধেয় প্রণব ঘোষ এর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন গীতিকবি বাকীউল আলম…

আজ ১৬ই আগস্ট সুরকার প্রনব ঘোষ এর মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার এই লেখাটি…
সুরের জগতে এক নিঃস্বঙ্গ পথিক –

১৯৯১ কি ১৯৯২ সালের কথা। লিখতাম ছড়া, গল্প কিশোর কবিতা। শিশুসাহিত্যের শাখা প্রশাখায় ছিলো আমার অবাধ বিচরন। খেলাঘর, কচিকাঁচার আসর, ফুলকুঁড়ি কচিকন্ঠ সংগঠন গুলোর সাথে ব্যাস্ত সময় কাটাতাম। ভালোবাসতাম গান ও। লিখতে না পারলেও আধুনিক বাংলা গানের শ্রোতা হিসেবে নিজেকে প্রথম সারিতেই দাড় করাতে পারতাম। কলেজে যাওয়ার হাত খরচ থেকে জমানো টাকায় রেকর্ড করে শুনতাম বাছাই করা গান। তেমনি এক সময় বেরোলো শুভ্রদেব এর “শেষ চিঠি” এ্যালবামটি। সুর ও সঙ্গীত প্রনব ঘোষ। যাতে ছিলো সুন্দর, সহজ সাবলীল কথায় সুরের অলঙ্কার ।
“তুমি পার্বতী আর
আমি দেবদাস
দুই মেরুতে তাই
করি বসবাস”
এ তো ছড়ার ছন্দ। অনুপ্রানিত আমি। গান লেখার চেষ্টা করলে কেমন হয়? চিন্তা চেতনায় গানকে তুলে আনলাম, লিখলাম…

“ভুলে যেতে পারি আমি
যদি তুমি চাও
বুক থেকে স্মৃতি গুলো
মুছে দিয়ে যাও ।

প্রতি দিন মাঝ রাতে
ঘুম ভেঙ্গে যায়
স্মৃতি গুলো ধুকে ধুকে
আমাকে কাঁদায়
কেঁদে কেঁদে রাত কাটে
শুনতে কি পাও ।।”

এমনি চার পাঁচটি গান। ‘শেষ চিঠি’ ক্যাসেটের প্রযোজক এর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে হাজির হলাম সুরকার প্রনব ঘোষ এর বাসায়। তিনি গানগুলো পড়লেন, সাথে সাথে সুর করলেন। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। সেখান থেকে ‘ভুলে যেতে পারি আমি’ গানটি গাওয়ালেন আমার খুব প্রিয় শিল্পী তপন চৌধুরীকে দিয়ে। জন্ম হলো গীতিকার বাকীউল আলমের।

সেই থেকে শুরু হলো সুরের হাত ধরে প্রনব ঘোষের সাথে পথ চলা। প্রনব ঘোষ শেখালেন সহজ কথার গান কিভাবে সহজে লেখা যায়। সুরের উপর কিভাবে গান লিখতে হয়। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্তকে কিভাবে সাতটি সুরের ফ্রেমে বন্দী করা যায় ।

সুরের জগতের মানুষ বেশীর ভাগই দেখেছি একটু খেয়ালী হয়। অগোছালো থাকে। ঘরমুখী থাকে কম। এ ব্যপারে প্রনব ঘোষ ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে চলা প্রনব ঘোষকে দেখেছি স্টুডিও থেকে বাসা, বাসায় এসে হারমনিয়াম নিয়ে বসা। তাই তার বাসায় হতো গীতিকার ও শিল্পীর সৃষ্টিশীল আড্ডা। ওই আড্ডায় বেড়ে উঠতে দেখেছি অনেক গীতিকার ও শিল্পীকে। যাদের বেশীর ভাগই পরবর্তীতে পেয়েছেন তারকা খ্যাতি ।

সেই তারকা শিল্পী তৈরির কারিগর প্রনব ঘোষকে তাঁর জীবনের শেষ সময়ে দেখেছি অনেক নিঃস্বঙ্গ, হতাশ। তাঁর নিঃস্বঙ্গ সময়ের বেশীর ভাগই কেটেছে আমার সাথে। অন্তরমূখী লোকটি অনেক দুখের কথা অকপটে বলেছেন। বলেছেন কাকে কতটুকু ভালোবাসেন, ভালোবাসতেন। অনেক দুঃখ ও অভিমান নিয়ে চলে গেছেন প্রনব ঘোষ। আর কখনো ফিরে আসবেন না, বলবেন না “বেশ কিছু কাজ আছে আমার হাতে, ভালো গান করতে হবে… ফোন করলে বাসায় চলে এসো”। কোথায় আছেন এখন প্রনব ঘোষ ?

হারমোনিয়াম-গানের খাতা ফেলে
সুরের দেশের অভিমানী ছেলে
দাদা তুমি হারিয়ে কোথায় গেলে ?

হারিয়ে গেলে কোন সে অজানায়
সেই খানে কি পাখিরা গান গায়
জোছনা বানে পূর্ণিমা রাত ভাসে
রঙের মেলায় মিষ্টি সকাল আসে
সেইখানে কি ফুলের বাগান আছে
ফুলের বুকে প্রজাপতি নাচে ?

আচ্ছা দাদা সঙ্গী তোমার কারা
জোনাক পোঁকা নাকি চাঁদ ও তাঁরা ।
তাদের সাথে রাত জাগো কি আজো
আড্ডা দিতে মধ্যমণি সাজো ?

আজো তুমি দাও কি গানে সুর
নাকি শুধু শুয়েই থাকো – “একলা অচিনপুর”!! – বাকীউল আলম (গীতিকবি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: