কিংবদন্তি সুর স্রষ্টা আনোয়ার পারভেজ…

‘একবার যেতে দেনা
আমার ছোট্র সোনার গায়,
যেথায় কোকিল ডাকে কুহু
দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছোটে চলে
আপন মহনায়’
এমন সুন্দর এ গানের সুর স্রষ্টা বিশিষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ আনোয়ার পারভেজ। যিনি আজ আমাদের পৃথিবীতে নেই অন্য জগৎ এর বাসিন্দা। কিন্তু জীবন কেন এমন হয়? আসা যাওয়ার কোন পাসর্পোট ভিসা নেয়না। যখন আসে হাসায় সবাইকে, আর যখন যায় দুঃখের সাগরে ভাসায় সবাইকে। একজন বাংলাদেশী শীর্ষস্থানীয় সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, সঙ্গীতজ্ঞ ও শব্দসৈনিক। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিবিসির জরিপে যে ২০টি বাংলা গান সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি পেয়েছে তার সুরকৃত তিনটি গান “জয় বাংলা বাংলার জয়”, “একবার যেতে দে না” এবং “একতারা তুই দেশের কথা”৷ তার সুরারোপিত ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে অনেক জনপ্রিয় ছিল৷ সঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।

ষাটের দশকের গোড়ায় তিনি পেশাদার সঙ্গীত জীবন শুরু করেন চট্টগ্রাম বেতারে সুরকার পদে যোগ দিয়ে৷ পরে ঢাকায় এসে বিভিন্ন মাধ্যমে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে “জয় বাংলা বাংলার জয়” গানের সুর করেন। এছাড়া তার সুরকৃত শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে “একতারা তুই দেশের কথা” ও “একবার যেতে দে না আমার” গান দুটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। স্বাধীনতার পরই বাংলাদেশের একটি অন্যতম ব্যবসা সফল ছবি রংবাজ-এর সুরকারও ছিলেন তিনি৷ সে সময় “সে যে কেন এলো না কিছু ভালো লাগে না” বা “এই পথে পথে”, “আমি একা চলি”- এ গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে৷ এছাড়া দি রেইন (১৯৭৬) চলচ্চিত্রে সুর করেও তিনি সমালোচকদের দৃষ্টি কেড়েছিলেন৷ সঙ্গীত জীবনের ৪০ বছরে দুই হাজারেরও বেশি গানে সুর দিয়েছেন৷

আনোয়ার পারভেজ জেসমিন পারভেজের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ দেশের একজন খ্যাতিমান গায়িকা এবং তার ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্রস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০০৫ সালে তা তার হার্ট অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল৷ ভীষণ অসুস্থ অবস্থায় তাকে ঢাকার জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশনে নেয়ার পর পরই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান তিনি, এবং ২০০৬ সালে ১৭ই জুন মধ্যরাতে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন৷ তাকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়৷
তার সুরারোপিত চলচ্চিত্রের গুলো হলো –
বিজলী (১৯৬৯), বিন্দু থেকে বৃত্ত (১৯৭০), জয় বাংলা (১৯৭১), ছন্দ হারিয়ে গেল (১৯৭২), রংবাজ (১৯৭৩), বন্দিনী (১৯৭৬), দি রেইন (১৯৭৬), মাটির মায়া (১৯৭৬), অভিযান (১৯৮৪), রাজিয়া সুলতানা (১৯৮৪), ঢাকা ৮৬ (১৯৮৬), জবরদস্ত (১৯৮৮), জীনের বাদশা (১৯৮৯), ছুটির ফাঁদে (১৯৯০), মৌমাছি (১৯৯৬), সাবাশ বাঙ্গালী (১৯৯৮), বউ শাশুড়ীর যুদ্ধ (২০০৩), মধু মালতী, সোনার হরিণ, তালাক, সকাল সন্ধ্যা।
বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি থেকে আজীবন সম্মাননা পেয়েছন ২০০৬ সালে।

আমরা এই শিল্পীর শিল্প কর্মকে সব সময় মনে করবো। সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে এই সুনামধন্য সঙ্গীতপ্রেমী পুরুষের রুহের আত্তার মাঘফেরাত কামনা করি। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *