মৃদঙ্গের পরিচয়…

মৃদঙ্গঃ
মৃদঙ্গ এক ধরনের আনদ্ধ জাতীয় ঘাতবাদ্য যন্ত্রবিশেষ। এর উৎপত্তি সম্পর্কে আপনাদের কিছু ধারণার কথা বলি।
মৃদঙ্গ একটি অতি প্রাচীন ঘাতবাদ্য বিশেষ। বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে মৃদঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর উৎপত্তি সম্বন্ধে স্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
শিবপুরাণ অনুসারে ত্রিপুরাসুর বধের পর শিব যখন তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন, তখন অসুরের রক্তে ভিজে যাওয়া মাটি দিয়ে ব্রহ্মা এক মৃদঙ্গের অনুরূপ বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করেন যার আচ্ছাদন মৃত অসুরের চামড়া দিয়ে এবং বেষ্টনী ও গুলি অসুরের শিরা ও অস্থি দিয়ে তৈরী করা হয় বলে জানা যায়।

অপর একটি পৌরাণিক কাহিনীতে মৃদঙ্গের আবিষ্কর্তা হিসেবে ঋষি স্বাতির নাম পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, এক বৃষ্টির দিনে সরোবর থেকে জল আনার সময় সরোবরের জলে ছড়িয়ে থাকা পদ্মপাতায় বৃষ্টির ফোঁটার আওয়াজে মুগ্ধ হয়ে সেই শব্দকে বাদ্যে ধরে রাখার চেষ্টায় স্বাতি মৃদঙ্গের উদ্ভব করেন। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেনি।

ক্রমবিকাশের ধারা প্রকাশিত ও পরিচিত হয় কিভাবে? মহামুনি ভরতের নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে তিন প্রকার মৃদঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়,
১। আঙ্কিক অর্থাৎ যা অঙ্কে স্থাপন করে বা কোলে রেখে বাজানো হয়,
২। ঊর্ধ্বক অর্থাৎ যা ঊর্ধ্বে তুলে বাজানো হয় এবং
৩। আলিঙ্গ্য অর্থাৎ যাকে আলিঙ্গন করে বাজানো হয়। পরবর্তীকালে ঊর্ধ্বক এবং আলিঙ্গ্যের অবলুপ্তি ঘটে। এই গ্রন্থে মৃদঙ্গ, পণব, দর্দুর প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি মূরজ বা পুষ্কর নাম দুটির উল্লেখ পাওয়া যায়। পুষ্কর বা পদ্মপাতায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ থেকে মৃদঙ্গ, পণব ও দর্দুর এই তিন বাদ্যের জন্মকাহিনী অনুযায়ী এই তিন বাদ্যকে ত্রিপুষ্কর বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে পণব ও দর্দুর বাদ্যযন্ত্রগুলি মৃদঙ্গের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। মৃদঙ্গ কথাটির আক্ষরিক অর্থ মৃৎ অঙ্গ বা মাটির অঙ্গ, কিন্তু ত্রয়োদশ শতকে লেখা শাঙ্গর্দেবের সঙ্গীত রত্নাকর গ্রন্থে এই যন্ত্র কাঠ দ্বারা নির্মিত বলে জানা যায়।

শাঙ্গর্দেবের ত্রয়োদশ শতকে লেখা সঙ্গীত রত্নাকর গ্রন্থে স্কন্ধাৰজ, অড্ডাৰজ প্রভৃতি চর্মাচ্ছাদিত বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে বলেও জানা যায়। ১৪০৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত সুধাকলশ বাচনাচার্যের সঙ্গীতোপনিষৎসারোদ্ধার গ্রন্থে পখাউজ নামক বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভাষাতাত্ত্বিক মতে পুষ্কর ও আৰজ এই দুই শব্দের অপভ্রংশ মিলিত হয়ে পখাউজ এবং পরবর্তীকালে পাখোয়াজ শব্দের সৃষ্টি করেছে।
এবার মৃদঙ্গের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছি।

কাঠামো – মৃদঙ্গের কাঠামো নিম, কাঁঠাল, খয়ের বা রক্তচন্দন কাঠের তৈরী হয়ে থাকে।
ছাউনি – মৃদঙ্গের দুই ধারের দুই মুখ চামড়া দিয়ে ঢাকা থাকে, এই অংশকে ছাউনি বলে।
কানি – ছাউনির ধার বরাবর গোলাকার চামড়ার পটিকে কানি বলে।
গাব বা স্যাহী – ডানদিকের ছাউনির মাঝামাঝি কালো গোলাকার অংশকে গাব বলে। এটি বাম দিকের ছাউনিতে থাকে না।
সুর বা ময়দান বা লব – ডানদিকের ছাউনির গাব ও কানির মাঝের অংশ এবং বাম দিকের ছাউনির কানি বাদে বাকি অংশকে সুর বলে।
পাগড়ী বা গজরা – ছাউনি ও কাঠামোর সংযোগস্থলে চামড়ার অংশকে পাগড়ী বলে।
ছোট্ বা বদ্ধি – চামড়ার যে সরু পটি পাগড়ীর মধ্যে যাতায়াত করে ছাউনিকে টান করে বেঁধে রাখে, তাকে ছোট্ বা বদ্ধি বলে।
গুলি বা গট্টা – কাঠামো ও ছোটের মাঝে যে আটটি গোলাকার কাঠের টুকরো দিয়ে ডান দিকের ছাউনিতে সুর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়, তাদের গুলি বলে।
ঘর – পাগড়ীর ওপরে যে ছিদ্রপথ দিয়ে ছোট যাতায়াত করে, তাকে ঘর বলে।
ঘাট – দুই ঘরের মধ্যবর্তী পাগড়ীর ওপরের অংশকে ঘাট বলে।

মৃদঙ্গের বর্ণমালাঃ

মৃদঙ্গের সাতটি মুখ্য বর্ণ আছে। এগুলি হল – তা, দী বা দেন, না, তে, টে, ঘে বা গে এবং ক। এর মধ্যে ডান হাতে বাজানো হয় পাঁচটি বর্ণ – তা, দী বা দেন্, না, তে, টে এবং বাম হাতে বাজানো হয় দুটি বর্ণ – ঘে বা গে, এবং ক।

বাজানের কৌশলঃ

তা – ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠাকে একসঙ্গে করে, বিশেষভাবে অনামিকা ও কনিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে কনিষ্ঠার দ্বারা গাবের ওপরের অংশে আঘাত করে ‘তা’ বাজানো হয়।
দী বা দেন্ – ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠাকে একসঙ্গে করে গাবের মাঝে আঘাত করে হাত সরিয়ে নিয়ে ‘দী’ বা ‘দেন্’ বাজানো হয়।
না – কানি বা সুরের ওপর ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আঘাত করে ‘না’ বাজানো হয়।
তে – গাবের ওপর ওপরের দিকে পাঞ্জা ঘুরিয়ে ডান হাতের মধ্যমা ও অনামিকা দিয়ে আঘাত করে হাত না সরিয়ে নিয়ে ‘তে’ বাজানো হয়।
টে – গাবের ওপর নিচের দিকে পাঞ্জা ঘুরিয়ে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আঘাত করে হাত না সরিয়ে নিয়ে ‘টে’ বাজানো হয়।
ঘে বা গে – বাম দিকের ছাউনির ওপর বাম হাতের পাঞ্জার ঊর্ধ্বাংশ দিয়ে আঘাত করে হাত সরিয়ে নিয়ে ‘ঘে’ বা ‘গে’ বাজানো হয়।
ক – বাম দিকের ছাউনির ওপর বাম হাতের পাঞ্জা দিয়ে আঘাত করে হাত না সরিয়ে নিয়ে ‘ঘে’ বা ‘গে’ বাজানো হয়।
সঙ্গীতাঙ্গনের সাথেই থাকুন আর জেনে নিন বিভিন্ন যন্ত্রের পরিচয়। সবার জন্য শুভ কামনা। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *