জানে আলম – আমাদের গর্ব…

শোষকেরা ধ্বংশ করতে চেয়েছিল সব কিছুই। আঘাত হেনেছিল আমাদের সংস্কৃতিতেও স্বাধীনতার নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল যুব সমাজের অনেকেই। ঘুনে ধরা সমাজটাকে তখন নতুন করে সাজাবার সময়। সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা সচেতন করে তুলেছিল এদেশের কতক যুবককে। সমাজকে দিতে হবে নতুন কিছু। সংগীতকেই বেছে নিল তারা মোক্ষম অস্ত্র হিসেকে। নতুন এক সংগীত ধারার জন্ম দিলেন তারা। আর এই স্বপ্নের কাব্যিকদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন জানে আলম। এদেশে মর্ডান পপ মিউজিকের জন্মদাতা আযম খান, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর -এই নামগুলোর সাথে সমস্বরে উচ্চারিত হওয়া আরেকটি নামই হচ্ছে জানে আলম। আমাদের আজকের এই ব্যান্ডসঙ্গীতের জন্মদাতা তারাই। তবে তখনকার ব্যান্ড সঙ্গীত আর আজকের ব্যান্ড সঙ্গীতের মধ্যে ব্যবধান অনেকখানি। বাদ্যযন্ত্রগুলো ঠিক থাকলেও তখনকার গানগুলোর বক্তব্য এখনকার চেয়ে আরও অনেকখানি হৃদয়গ্রাহী এবং বাস্তববাদী ছিল। সেই সময় থেকেই আজ অবধি জানে আলম তৈরি করেছেন অসাধারন সব সৃষ্টি। ব্যান্ড সংগীত আজ যেভাবে গ্রাম-অঞ্চলেও প্রচার ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেই সময়ে আজকের যে ধরনের ব্যান্ডের গান হচ্ছে তা নিয়ে হয়তোবা জনপ্রিয়তা পেতনা।

তাই তখন মাইজ ভান্ডারী এবং দেহতত্বের গানগুলোকে ব্যান্ডের বাদ্যযন্ত্রের সুরে গেয়েই বেশিরভাগ গানগুলো সৃষ্টি। যা খুবই জনপ্রিয়তা পায়। আর এই ধরনের সৃষ্টির ক্ষেত্রে জানে আলম অদ্বিতীয়। তার এই অসাধারন সৃষ্টিগুলোই তাকে করেছে চির স্মরনীয়। ‘একটি গন্ধমের লাগিয়া’ ‘জ্বালাইয়া গেলা’। তার সেই সময়েরে কিছু অসামান্য সৃষ্টি। আর এই সময়ের তার সৃষ্টির কথা বলে শেষ করার নয়। তার করা সুরে এ পর্যন্ত একাশিটির মত এ্যালবাম বেরিয়েছে। বিভিন্ন এ্যালবামে কাজ করেছেনে দেশ বরেন্য সব আধুনিক
শিল্পীগন ‘রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর, মমতাজ, বেবী নাজনীন, রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনী সহ আরো অনেকে। আমেরিকা থেকে বের হয়েছে তার পাঁচটি সিডি। এতে তার নিজের গাওয়া সিডিও রয়েছে। কিংবদন্তী শিল্পী জানালেন, তাঁর নিজের চার হাজারের মত গান আছে এবং তাঁর সুর ও সঙ্গীতে দুই হাজারের অধিক গান প্রকাশ হয়েছে। ২০১৩-তে ‘পপ লেজেন্ড’ এ্যালবামটির মোড়ক উন্মোচন করেন মাননীয় তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং ‘পপ লেজেন্ড ২’ এ্যালবামটির মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। সঙ্গীতাঙ্গনের সাথে আলাপচরিতায় আরো জানালেন আসছে তাঁর শ্রেষ্ঠ শত গান নিয়ে দশটি এ্যালবাম বের হতে যাচ্ছে বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে। এ মুহূর্তে তিনি ‘এম আই বি’ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অফ বাংলাদেশের সাথে জড়িত আছেন। পুরস্কারের সংখ্যা চারশত পনেরটি, এর মধ্যে পর পর তিনি তিনবার ‘বাসস’ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। আসছে ‘সঙ্গীতাঙ্গন’ ইউটিউব চ্যানেলে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার যা আপনারা কখনই বানিজ্যিক চ্যানেল গুলোতে আজ অবধি প্রচারিত হয়নি এমনই সব মুহূর্ত চিরজীবনের জন্য ধরে রাখার প্রয়াসেই ‘সঙ্গীতাঙ্গন’ এর এই আয়োজন।

জাপান থেকে বের হয়েছে স্বর্গের ভালবাসা নামে আরেকটি সিডি। তার প্রতিভার গুনগান ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। জাপানের বিভিন্ন কালচারার সেন্টারের সঙ্গেও যুক্ত আছেন তিনি। জাপানের রাজা ব্যক্তিগত ভাবে তাকে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। তার সংগীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তিনি তাঁর গলায় পরিহিত সোঁনার ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থার আমন্ত্রনে ঘুরে এসেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। তার করা আধুনিক গানগুলোর সুর কম্পোজিশন অত্যন্ত উচ্চুমানের। শুধুমাত্র শহরাঞ্চলেই নয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তার গানগুলো পেয়েছে অসম্ভব জনপ্রিয়তা। মর্ডান গান সৃষ্টিতে তিনি তৈরি করেছেন নতুন মাইলফলক। দেশের এই বরেণ্য সুরকার, সঙ্গীত শিল্পী আমাদের সংগীতাঙ্গনকে দিয়েছেন অনেকখানি। তার মত গুনী প্রতিভার মর্যাদা হয়তোবা আমরা এখনও পুরোপুরি করতে পারিনি। তবুও এটুকু বলে আমরা নিজেদেরকে স্বাত্বনা দিতে পারি যে, তিনি আমাদের গর্ব।

অলংকরন – মাসরিফ হক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: