আলমাস আলীকে নিয়ে হাসান মতিউর রহমানের স্মৃতিকথা…

হাসান মতিউর রহমান বাংলাদেশের সুনামধন্য গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। তিনি এদেশের নবীন প্রবীণ অনেক সঙ্গীত শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন এবং আমাদের উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তিনি নিজ হাতে পূরণ করে দিয়েছেন অনেক শিল্পীদের গায়ক হবার স্বপ্ন। তিনি সুসম্পর্ক গড়েছেন শিল্পী, সুরকার, গীতিকার এবং যন্ত্রশিল্পীদের সাথে। অন্যদিকে আলমাস আলী দেশের গুনী বেহেলা বাদক। শ্রদ্ধেয় আলমাস আলী এখন অসুস্থ। আলমাস আলীকে নিয়ে গভীর স্মৃতির কথা বললেন, হাসান মতিউর রহমান -“আলমাস আলী দেওয়ান একজন গুনী বেহালা বাদক এবং একজন সঙ্গীত পরিচালক। ওনার বাবা রজ্বব আলী দেওয়ান ছিলেন দেশের নামী বাউল সাধক। তিনি লিখেছেন এবং গেয়েছেন হাজার হাজার গান। যা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার কথা তার সুর অন্তর ছুঁয়ে যায়। গানের টানে আলমাস ভাই জীবনে আর কিছু করতে পারেনি। ইচ্ছে করলে গায়ক হতে পারতেন কিন্তু তিনি সেদিকে যান নি। হাতে তুলে নিয়েছিলেন বেহালা। বাবার সাথে রাত জেগে বিচার গানে বেহালা বাজাতেন, আবার কখনো দোহারি করতেন। আমার সাথে পরিচয় আশির দশকে। আমি সবে গানের ভূবনে পা রেখেছি, কাউকে তেমন চিনিনা – জানিনা।  আরো কয়েক জনের মত আমাকে কাছে টেনে নিলেন আলমাস ভাই। ধীরে ধীরে দুজন বড় কাছাকাছি হয়ে গেলাম। আমার সব গানে বেহালা বাজাতেন তিনি। কাজ আমার, কিন্তু আমি থাকতাম চিন্তা মুক্ত, ভরসা একটাই আলমাস ভাই। তাকে দিয়ে কাজ এমন ভাবে শেষ করতেন যে কিছুই বলার থাকতো না। তিনি প্রায় এক হাজার এ্যালবাম এর সঙ্গীত পরিচালক। এর মধ্যে আমাদের দেশের জনপ্রিয় শিল্পী মাননীয়া সংসদ সদস্যা মমতাজেরও শতশত এ্যালবাম রয়েছে। মমতাজের প্রথম জীবনের সব গানই আলমাস ভাই করেছেন। সে সময় বেহালাবাদক মানেই আলমাস ভাই। কারো সাথে কখনো টাকা পয়সা নিয়ে দরাদরি করেছেন বলে আমার জানা নাই।

আমি যাদের কে হাত ধরে গানের জগতে এনেছি, সে আজকের দিলরুবা খান, আশরাফ উদাস, সুজন রাজা, মুজিব পরদেশী সহ অনেকেই আলমাস ভাইয়ের কাছে ঋণী। আমার মনে আছে আমি যখন ভাবলাম মমতাজকে নিয়ে গান করবো তখন মমতাজ আমাকে বললেন আপনার গানতো আর সবার মত না তাই গাইতে
হলে কয়েকদিন আগে সুর তোলে দিতে হবে। না হলে আপনি যেমন চাইবেন সে রকম হবে না। আর গান তোলে দিতে হবে আমার বাড়ি সিঙ্গাইর গিয়ে। আমি
এক কথায় রাজি  হয়ে গেলাম, আমি বললাম আমার সাথে আলমাস ভাই যাবেন। মমতাজের চোখে মুখে খুশির ঢেউ খেলে গেলো। মমতাজ অনেক বিনয় করে
বললেন, যেভাবে পারেন আলমাস ভাইয়ে নিয়ে আসবেন। আমি আর আলমাস ভাই মমতাজের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। মমতাজ আমাদেরকে আপ্যায়ন করার
জন্য কোন কিছু বাদ রাখেননি।  ঘরে না বসে আলমাস ভাই বললেন, বাড়ির সামনে আম গাছের ছায়ায় বসবো। ওখানে বসেই সুর তোলে দিলাম। আলমাস
ভাই বললেন,  মতি ভাই গানগুলো দারুণ হয়েছে।  কথা ও সুর একদম আলাদা। আমরা ঢাকা চলে এলাম। মমতাজ এর কন্ঠে সেই গান – জাত গেলো পিরিতে,
বেঈমান বন্ধু। বেহালা বাজালেন আলমাস ভাই। শুরু হলো আমার জীবনের নতুন পথচলা, মমতাজ আর আলমাস ভাইয়ের সাথে। সবগুলো এ্যালবাম সুপারহিট
সে এক নজর বিহীন ঘটনা। সেই আলমাস ভাই আজ ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। বেহালা বাজাতে পারছেন না। জানি না তার মনের
ভাব কি। তবে বুঝতে পারি বেহালা ছেড়ে থাকা তার জন্য কত কষ্টকর। আমরা চেষ্টা করছি কিছু করার জন্য। সবাই দোয়া করবেন। মনে রাখবেন আলমাস
ভাইয়ের মত যন্ত্রশিল্পীরা যদি না থাকতো আমাদের গান কে শুনতো?? আমরা যদি চাল, তেল, লবণ, মরিচ হই আলমাস ভাইয়েরা হলেন বাবুর্চি। উনাদের পাক
ভালো না হলে কেউ খেতে পারবে না; যত দামী মসলাই হোক। একজন গায়ক গায়িকা অসুস্থ হলে আমরা যেমন মানবিক কারনে ঝাঁপিয়ে পড়ি , আসুন একজন
যন্ত্রশিল্পী বেলায়ও এগিয়ে আসি। সবাই ভাল থাকুন। ভুলে যাবেন না গানের ভুবনে যারা আছি সবাই মলে একটি পরিবার। সুখে দুঃখে আনন্দ বেদনায় আমরা
সবাই এক মিছিলের সহযাত্রী। “হে আল্লাহ্‌,! তুমি আলমাস ভাইকে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও। তার বেহালায় আবার বেজে উঠুক, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি”।।
অলংকরন – মাসরিফ হক….

One thought on “আলমাস আলীকে নিয়ে হাসান মতিউর রহমানের স্মৃতিকথা…

  • January 9, 2017 at 6:27 am
    Permalink

    Unaarplleled accuracy, unequivocal clarity, and undeniable importance!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: