‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ এই বিখ্যাত গানের জন্ম কিভাবে হলো ?…

‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ …’ গানটি শোনেননি কিংবা গানের সুরটা জানা নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন বা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মানেই হই হুল্লোড়, শুভেচ্ছা উপহার, কেক, আর সঙ্গে চিরচেনা এই গান।

গেল শতক থেকে শুরু করে চলতি শতকের নাটক, চলচ্চিত্রের জন্মদিনের আয়োজন বা যে কোনো মানুষের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে শোনা যায় এ গান। ঘড়ি থেকে শুরু করে মিউজিক্যাল শুভেচ্ছা কার্ড, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ফোনের রিংটোন হিসেবেও গানটির সুর ব্যবহার করা হয়। একাধিক জরিপে জানা যায়, ইংরেজি ভাষায় সব থেকে জনপ্রিয় এবং পরিচিত গান হিসেবে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ তালিকার এক নম্বরে।

গানটির কথা অনেক হলো। কিন্তু এই গানের ইতিহাস জানেন? ধরে নেওয়া গেল, সেটাও না হয় জানেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, গানটির স্বত্বাধিকার নিয়ে রীতিমতো আইনি লড়াই চলছে বছরের পর বছর? ইতিহাস ঘাঁটলেই মিলবে সেসব তথ্য।
কে তুলেছেন সুর, কথাই বা কার?
ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে ছিলেন দুই বোন – প্যাটি ও মিল্ড্রেড হিল। প্যাটি হিল একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষিকা। মিল্ড্রেড ছোটদের পড়ানোর পাশাপাশি বাজাতেন পিয়ানো। কথিত আছে, ১৮৯৩ সালে লুইসভিল এক্সপেরিমেন্টাল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ানোর সময়ে মিল্ড্রেড তাঁর পিয়ানোতে তুললেন ছোট্ট মিষ্টি একটি সুর তোলেন। প্যাটি সেই সুরে বসালেন কথা। ভোরবেলা ক্লাসে আসা শিশুদের স্বাগত জানাতে শিক্ষক-শিক্ষিকারা গেয়ে উঠতেন দুই বোনের তৈরি গান – ‘গুড মর্নিং টু ইউ/গুড মর্নিং টু ইউ/গুড মর্নিং ডিয়ার চিলড্রেন/গুড মর্নিং টু অল।’

পরে কি হলো সেই গানের!
১৮৯৩ সালের ‘সং স্টোরিস ফর দ্য কিন্ডারগার্টেন’ নামের এক বইতে প্রকাশিত হল গানটি। বইটির লেখকও প্যাটি এবং মিল্ড্রেড। ওই গানের সুরের ​ওপরেই পরে বসানো হয় নতুন কথা – ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।’ অবশ্য কীভাবে ‘গুড মর্নিং টু ইউ’ থেকে বিবর্তিত হয়ে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ হলো, কেনই বা এই নতুন কথাগুলি বসানো ​হলো ওই পুরোনো সুরে, তার কোন সঠিক তথ্য এখন আর কারওরই জানা নেই। ১৯২৪ সালে রবার্ট এইচ কোলম্যানের সম্পাদনায় একটি গানের বই প্রকাশিত হয়। সেখানেই প্রথম ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানটি ছাপা হয়। পুরোনো ‘গুড মর্নিং টু ইউ’-এর সুর নিয়ে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ হলেও এত সুন্দর একটি গান তৈরির জন্য প্যাটি এবং মিল্ড্রেড হিলের প্রতি কোথাও কৃতজ্ঞতা জানানো হল না। ফলে খুবই রেগে গেলেন প্যাটি এবং মিল্ড্রেডের আরেক বোন জেসিকা। তিনি তাঁর বোনদের গান ‘গুড মর্নিং টু ইউ’ -এর মেধাস্বত্ব দেখাশোনা করতেন। ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানের স্বত্বাধিকার বোনেদের নামে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। আদালতেই প্রমাণ করেন যে, ওই দুটো গানের সুর একই রকম। অবশেষে ১৯৩৪ সালে ওই দুই বোন গানটির স্বত্বাধিকার পান।

কত হাত ঘুরল সে গান!
জেসিকা কাজ করতেন শিকাগোর সংগীত প্রকাশক সংস্থা ক্লেটন এফ সামি কোম্পানিতে। ১৯৩৫ সালে এই সংস্থা থেকে কপিরাইটসহ ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানটি বাজারে ছাড়া হয়। কিছুদিন পর ত্রিশের দশকেই, সামি কোম্পানিকে কিনে নেন জন সেংস্ট্যাক। সত্তরের দশকে তিনি সংস্থাটিকে নিয়ে যান নিউ জার্সিতে আর নতুন নাম দেন ‘বার্চ ট্রি লিমিটেড’। ১৯৯৮ সালে ২৫ মিলিয়ন ডলারে বার্চ ট্রি কোম্পানিকে কিনে নেয় বিশ্বের বৃহত্তম সংগীত প্রকাশক সংস্থা ওয়ার্নার চ্যাপেল। কপিরাইট ছিল বলে গানটি থেকে বছরে প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার রয়্যালটি পায় সামি-বার্চ টি। সেই টাকার বেশ কিছু অংশ যায় হিল ফাউন্ডেশনে।

২০১৩ সালে নিউ ইয়র্কের ‘গুড মর্নিং টু ইউ প্রোডাকশন কর্প’ নামে এক প্রযোজনা সংস্থা ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানটির ইতিহাস নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যচিত্রে তো মূল গানটি ব্যবহার করতে হবে। ‘গুড মর্নিং টু ইউ প্রোডাকশন কর্প’-এর প্রেসিডেন্ট জেনিফার নেলসনকে ওয়ার্নার চ্যাপেল জানায়, মূল গান ব্যবহার করতে ১ হাজার ৫০০ ডলার দিতে হবে। এতে বেজায় ক্ষেপে যায় ওই প্রযোজনা সংস্থা। এই ঘটনার প্রতিবাদে নিউ ইয়র্কের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে জেনিফার নেলসনের সংস্থা একটি মামলাও করেন। মামলায় বলা হয়েছে, ওয়ার্নার চ্যাপেল অন্যায়ভাবে একটি গানের কপিরাইট রেখে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। তাদের এই সুবিধা বাতিল করে গানটিকে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য মুক্ত করা হোক। মামলার একপর্যায়ে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানের কথার স্বত্বাধিকারী কেউ নন বলে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিচারপতি। ওয়ার্নার চ্যাপেল মিউজিক প্রতিষ্ঠান যুক্তি দেখিয়েছিল যে, ১৯৮৮ সালে তারা এই গানের স্বত্বাধিকার পায়। কিন্তু বিচারপতি জর্জ কিং তাঁর রায়ে বলেছেন, মূল গানটির স্বত্বাধিকার ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি, দেওয়া হয়েছিল বিশেষ যন্ত্রানুষঙ্গে গানটি পরিবেশনার স্বত্বাধিকার। গানটি দীর্ঘ সময় ধরে সারা দুনিয়ার মানুষ ব্যবহার করছেন এবং এ জন্য সত্ত্ব বাবদ অর্থ দাবি করা অযৌক্তিক। বিচারক এও বলেছেন, গানটির কথার জন্য কখনই ওয়ার্নার চ্যাপেলকে সত্ত্ব দেওয়া হয়নি। – মোহাম্মদ আমিন আলীফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: