মাইলস ব্যন্ডের জন্মকথা…

মাইলস‌ বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড। মাইলস এর জন্ম ১৯৮১ সালে। এসময় তারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সাবেক হোটেল শেরাটন, বর্তমানের হোটেল রূপসী বাংলা সপ্তাহে ৫ দিন বাজাতো। এতে তারা সন্তুষ্ট ছিল,  কিন্তু তারা তাদের প্রথম বাংলা মিউজিক এ্যালবাম বের করার পরপর-ই জনপ্রিয় হয়ে যায়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তারা সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিক হোটেলে বাজিয়েছিল। মাইলসের সদস্য হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদের বাবা কমল দাশগুপ্ত আর মা ফিরোজা বেগম। ব্যান্ডটি ডিপ পার্পল, সান্টানা, পিংক ফ্লয়েড এবং বিটল্‌স ব্যান্ডের সঙ্গীতের দ্বারা প্রভাবিত।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে মাইলস হিসেবে তাদের প্রথম অংশগ্রহণ ১৯৮২ সালে। ঐ বছরই মাইল্‌স্‌ শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে ১৫০০ সঙ্গীত পিপাসু দর্শকের সামনে তাদের প্রথম সরাসরি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮২ সালে তারা তাদের প্রথম এ্যালবাম বের করে ইংরেজি ভাষায়। ঐ সময় কিছু লোক বলেছিল যে, মাইলস বাংলা গান রচনা করতে পারে না, তারপরই মাইলস তাদের প্রথম বাংলা মিউজিক এ্যালবাম বের করে, এ্যালবামটির নাম হল। “প্রতিশ্রুতি”। এর ভেতর “চাঁদ তারা” গানটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তাছাড়া বাকি গানও জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে তারা তাদের দ্বিতীয় বাংলা মিউজিক এ্যালবাম “প্রত্যাশা” বের করে, যা বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে।
“প্রত্যাশা” এ্যলবামটি বের হওয়ার কয়েক মাসের ভেতরেই তিন লক্ষ কপি বিক্রি হয়। “প্রত্যাশা” এখনও এই দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া মিউজিক এ্যালবাম। মাইল্‌স্‌-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ফরিদ রশিদ যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাস জীবনযাপন করছেন।

মাইলস, তারা রক পপ ব্যান্ড দল হিসেবে পরিচিত। তারা ব্লুজ, রক, ল্যাটিন, জ্যাজ, এবং টেকনো মিউজিক দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাদের সঙ্গীতে অনেক ধরনের সাউন্ড ও ধরন রয়েছে। এ ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যবৃন্দ শাফিন আহমেদ, হামিন আহমেদ, মানাম আহমেদ, সৈয়দ জিয়াউর রহমান তুর্জ, ইকবাল আসিফ জুয়েল।
১৯৯২ সালে মাইলস ব্যাঙ্গালোরের দর্শকদের চিত্তাকর্ষণ করেছিল। এবং ইন্ডিয়াতে তিন ঘণ্টার একটি ইংলিশ কনসার্ট করে সবাইকে মুগ্ধ করেছে। তারা প্রথম ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে সিডি বের করে, ডিস্কো রেকর্ডিং নামে লস অ্যাঞ্জেলেস এর একটি রেকর্ডিং কম্পানি মাইলস এর প্রথম সিডি এ্যালবাম বেস্ট অব মাইলস বের করে। ১৯৯৬ সালে তারা ইন্ডিয়াতে পাঁচটি, আবু-ধাবি ও দুবাইতে দুইটি কনসার্ট করে। এবং চ্যানেল এম ও এমটিভি সরাসরি এই কনসার্ট রেকর্ড করে। ১৯৯৬ সালে তারাই প্রথম বাংলাদেশী ব্যান্ড ছিল, যারা প্রথম ইউএস ও ক্যানাডায় সফরে যায়। শাফিন আহমেদ ও তার দুই ভাই শৈশবের থেকে সঙ্গীত প্রশিক্ষণ পেয়েছে। ঘটনাবশত হামিন এবং শাফিন আহমেদ বহুল প্রচলিত নজরুল গীতির একজন একনিষ্ঠ সাধক ফিরোজা বেগম এর পুত্র। এবং মানাম আহমেদ হচ্ছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক মনসুর আহমেদ এর পুত্র। মাইলস এর ইতিহাসে তাদের একটি অন্যতম কনসার্ট হয়েছিল ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে, যেখানে সাংবাদিক সহ প্রায় ৬০,০০০ দর্শক হয়েছিল। এই কনসার্টটি আয়োজিত হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড এর তত্ত্বাবধানে, এবং স্পন্সর ছিল পেপসি। ২০০১ সালে মাইলস নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে কনসার্ট এর জন্য আমন্ত্রিত হয়। ঐ কনসার্টে আরও ছিল জুনুন এবং সিল্ক রুট ব্যান্ড। মাইলস তাদের সাথে সেই প্রথম বারের মত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল। তারা ৩৫০ এরও বেশি কনসার্ট করেছে, এবং অনেক চ্যারিটি শো করেছে। মাইলস তাদের পঞ্চম এ্যালবাম “প্রত্যয়” বের করার পর দু মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডা ভ্রমণে যায়। ১৯৯৭ সালের দিকে তারা নিউ ইয়র্ক, ডালাস, ওকলাহোমা, শিকাগো এবং ফ্লোরিডাতে ২,৫০০ দর্শক এর সামনে কনসার্ট করে। মাইলস এর গান ইন্ডিয়ান এফএম রেডিওতে বাজানো হত। পরবর্তীতে বিবিসি মাইলসের একাধিক সাক্ষাৎকার নেয়। এবং তাদের একাধিক সঙ্গীত পরিবেশন করে। লন্ডনের বাংলা সংবাদপত্র জনমত পত্রিকায় মাইলসের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে মাইলস আবার কলকাতায় কনসার্ট করে। তারা কিছু সংখ্যক মিউজিক ভিডিও বের করে, যা এমটিভি সহ আরও কিছু চ্যানেল এ প্রকাশিত হয়েছে। তাদের “মাইলস ভলিয়ম ১”বেস্ট অব মাইলস ভলিয়ম ২ বের হওয়ার পর তারা বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার নতুন প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শাফিন আহমেদ ২০১০ সালের ১লা জানুয়ারি বাংলাদেশী গনমাধ্যম কে জানিয়েছেন যে, তিনি মাইলস এর সাথে আর থাকছেন না। কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, মাইলস ব্যান্ডটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। তাই প্রতিটি সদস্য ছিল একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিবেশ না থাকায় তিনি এই দলের সাথে আর থাকছেন না। তারপর তিনি রিদম অব লাইফ নামের একটি ব্যান্ড গঠন করেন। তবে ২০১০ সালের শেষের দিকে শাফিন আহমেদ আবার মাইলস ব্যান্ডে ফিরে আসেন। এই ব্যান্ডে ইন্সট্রোমেন্টালে আছেন, শাফিন আহমেদ (বেজ গিটার, কন্ঠ) হামিন আহমেদ (গিটার,কন্ঠ), মানাম আহমেদ (কি-বোর্ড), ইকবাল আসিফ জুয়েল (গিটার), সৈয়দ জিয়াউর রহমান তূর্য(ড্রামস)।

তাদের প্রকাশিত এ্যালবামসমূহঃ
মাইল্‌স্‌ (ইংরেজি) (১৯৮২), প্রতিশ্রুতি (১৯৯১), প্রত্যাশা (আগস্ট ২৩, ১৯৯৩), প্রত্যয় (১৯৯৬), প্রয়াস, প্রবাহ (২০০০), প্রতিধ্বনি (২০০৬), প্রতিচ্ছবি (২০১৫)।

যে সব গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে তা হলোঃ
১। চাঁদ তারা সূর্য
২। জ্বালা জ্বালা
৩। ধ্বিকি ধ্বিকি
৪। সে কোন দরদীয়া
৫। ফিরিয়ে দাও
৬। এক ঝড় এসে
৭। আর কতকাল খুঁজব তোমায়
৮। পলাশীর প্রান্তর
৯। পাহাড়ী মেয়ে
১০। প্রেমের আগুন
১১।অনাবিল বিশ্বাসে
১২।ভালোবেসো না
১৩। নিরবে কিছুক্ষণ
১৪। অসহায়
১৫। প্রতীক্ষা
১৬। হৃদয়হীনা
১৭। চাই না
১৮। প্রিয়তমা মেঘ ইত্যাদি। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: