Press "Enter" to skip to content

সঙ্গীত রোমাঞ্চিত বিনোদন নয়…

“মাগো তোমার মধুর কণ্ঠে
শোনাও একটি গান,
তোমার কথায় তোমার সুরে
জুড়ায় মাগো প্রাণ ”

– এই আধুনিকতার নামে আর প্রযুক্তির অবদানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার সাথে আবার অনেক কিছু হারাতেও বসেছি। গত দুই যুগে বিস্মিত পরিবর্তন এসেছে সঙ্গীতে। মাত্র কয়েক বছর আগেও মানুষ টেপরেকর্ডারটি তার বালিশের পাশে রেখে প্রিয় গানটি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতো। এখন চোখ ধাঁধানো অতি রঞ্জিত রোমাঞ্চিত মিউজিক ভিডিওর আকর্ষণে বেসামাল শ্রোতাদর্শক। আসলেই কি দেখছি, কি শুনছি আমরা?

যে প্রিয় শিল্পী ছিল তার কণ্ঠটা শুধু কানে নয় প্রাণেও মিশে গিয়েছিল। অনেক দূর থেকেও যেকোনো গান শুনে বলা যেতো এইতো এই শিল্পীর গান। এখন বুঝতেই পারছিনা কে কোন গান গাইছেন। প্রিয় শিল্পী গুলো ছিল ঐ দূরের তারার চেয়েও অনেক দূরের স্বপ্নের মানুষ। এখন সময়ের ব্যবধানে প্রিয় তারকাকে শ্রোতার সামনে বড় স্টেজে লাঞ্ছিত হতে হয়, এটা নির্বাক বাস্তবতা। সঙ্গীত কখনোই রোমাঞ্চিত অশ্লীল বিনোদন নয়। সঙ্গীত বড় সাধনার বিষয় এবং শিল্পীরা সবসময় সম্মানীয়। অশ্লীলতার জন্য কোন সাধনা লাগেনা, যে কেউ জঙ্গল থেকে এসে মন যা চায় বলে নেচে গেয়ে চলে যেতে পারে। এরা সঙ্গীতাঙ্গনের কেউ না, এরা পচনশীল সম্প্রদায়ের লোক এবং দিনে দিনে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর এদের দাপটে দীর্ঘ সাধনায় গড়া সাধকেরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে।
উপমহাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে সঙ্গীতের অবস্থান ও ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাল শাসনামল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন পর্যায়ে, সঙ্গীতের বিভিন্নরকম উপযোগীতার দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে উপস্থিত। প্রতিটি ভাবান্দোলন রচিত হয়েছে-সঙ্গীতের প্রত্যক্ষ সংযোগে। উপমহাদেশের ভাবান্দোলন আর সঙ্গীত যেন পরস্পরের পরিপূরক হিসেবেই সহাবস্থান করেছে যুগে যুগে। ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী অনেক ঘটনার সাথেও জড়িয়ে আছে সঙ্গীত। দেশপ্রেম, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, স্বাধিকার, স্বাধীনতা এবং আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিভাষা হিসেবে উপমহাদেশের মানুষ সঙ্গীতকে ধারন করেছে নিজেদের চিত্তে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন-এমনকি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও সঙ্গীতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমাদের আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-বিরহ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং জীবনাচরনের সাথে সঙ্গীতের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সঙ্গীত বাংলাদেশের নদী, জল, স্থল, বাতাস এবং প্রাণীর জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে সুগভীরভাবে। সঙ্গীতের মাধ্যমে এদেশের মানুষ তার অন্তরের গোপন-গহীন কথাগুলো গানের ভিতর দিয়েই প্রকাশের প্রয়াস
পেয়েছে। পুরনো যুগের কবিগান থেকে শুরু করে, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদী, মাইজভান্ডারি, ভাব-বৈঠকি, আধ্যাত্মিক, পালাগান সহ অসংখ্য রূপ-বৈচিত্রের যে লোকজ গান আমাদের সংস্কৃতির আবহমান ধারায় সংযুক্ত, তা কোনোভাবেই হেয় প্রতিপন্ন করা যায়না। কারন মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের সাথে যত ধরনের অনুভূতির সংযোগ পাওয়া যায়, এই বঙ্গীয় বদ্বীপে তার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে গানের মাধ্যমে। বিভিন্ন পেশার মানুষ তার যাপিত জীবনকে বারবার প্রতিবিম্বিত করেছে সঙ্গীত দিয়ে। একে অস্বীকার করার অর্থ-আমাদের আবহমান সংস্কৃতিকেই একরকম অস্বীকার করা।

মানুষের মাঝে সম্প্রীতি ও জীবাত্মা-পরমাত্মাকেন্দ্রিক প্রেমভক্তির তত্ত্ব প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে বাংলায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে যে সূফী ভাববাদের অগ্রণী ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়, তার স্পিরিট হিসেবে সঙ্গীতের একটা ভূমিকা আমরা দেখতে পাই। সূফী ভাববাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাউলচর্চার ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তাতে সঙ্গীতই ছিল অন্যতম শক্তির জায়গা। লালন শাহ থেকে শুরু করে রাধারমন, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, বিজয় সরকার, হাসন রাজা এবং শাহ আব্দুল করিম, শাহ আলম সরকার পর্যন্ত সেই ধারাবহিকতা সহজেই দৃশ্যমান।
মরমী সাধনা ও আধ্যাত্নিকতা চর্চার যে ধারা বাংলাদেশে বিদ্যমান তাতে সঙ্গীতের অবস্থান অনেক উঁচুতে। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে, এটা সহজেই বোধগম্য হয় যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রচার-প্রসার ও ভাবান্দোলনের ক্ষেত্রে সঙ্গীত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামই হোন কিংবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই হোন উপমহাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মহান ও কীর্তিমান মানুষের জীবনে সঙ্গীতের ভূমিকা সর্বাগ্রে। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মানুষদের তালিকা করলে, এদের মত মানুষদের কখনই উপেক্ষা করতে পারবে না কেউ যারা সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন ফকির, হাসন রাজা, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সত্যজিৎ রায়, তানসেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আলাউদ্দিন খাঁ, সলীল চৌধুরী, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, লতা মুঙ্গেশকর, মান্না দে, ভূপেন হাজারিকা, হেমন্ত, মান্না, কিশোর বা মোঃ রফি এবং আমাদের মাঝে এখনো আছেন কিংবদন্তী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসিন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, এন্ড্রোকিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, সুবীর নন্দী, আলাউদ্দিন আলী, আলম খান, আজাদ রহমান, শেখ সাদি খান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনির, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মত মানুষরা যেভাবে উপমহাদেশের মানুষকে প্রভাবিত করেছেন, তা বিস্ময়কর। এদের জীবন যদি সঙ্গীতের সাথে যূথবদ্ধভাবে না
অগ্রসর হত, তবে আমরা এতগুলো মণিষী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হতে বঞ্চিত হতাম।

উনাদের মতো গুণী মানুষদের আমরা পেয়েছি বিশুদ্ধ সঙ্গীতের মাধ্যমে। উনারা আমাদের সঙ্গীতের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই উনাদের আমরা স্মরণ করি। এখন যারা সঙ্গীতের নাম ধারণ করে অপবিত্র পান্ডলিপি আবিষ্কার করছেন তাদের আগামী প্রজন্ম কি কারণে মনে রাখবে?
আমি অস্বীকার করছি না, সঙ্গীতে অবশ্যই বাণিজ্যিক বিষয় আছে।
একটি গান একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো। একটি ছোট্ট রুমে তাকে জন্ম দিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌছিয়ে দেওয়া অনেক পরিশ্রম এবং সাধানার বিষয়। এতো মানুষের পরিশ্রেম বিনিময়ে একটি খাদ্য যদি কু-খাদ্য হয়, সন্তান যদি কু-সন্তান হয় তাহলে এর সার্থকতা কোথায়?

সঙ্গীত প্রকাশে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অনেক অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, তাই বলে বাণিজ্যিক কল্পনায় সুরকে অসুর আর সুশীলকে অশ্লীল, শ্রুতিকে অশ্রুতি করে সুরের ভুবনকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে না কেউ।

এই সুরের ভুবনের জন্মদিতে অজস্র মানুষের সারাজীবনের সাধনা লেগেছে।
আর সেই সাধনাকে পুঁজি করে দেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বস্তায় বস্থায় টাকা লুটিয়ে নিয়েছেন অনেক আগেই। এখন আবার কিছু অসাধু জেগে উঠেছে সঙ্গীতের নামে নারী গুলোকে বিবস্ত্র করে যুবকদের চোখে ধুলো দিয়ে অর্থ কামানোর ধান্ধায়।
সঙ্গীত আমাদের প্রাণের কথা বলে, এখনো অনেক ভাল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আছে যারা শুধু বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় নয় সুস্থ এবং সুন্দর সঙ্গীত জন্ম দেওয়াই উনাদের লক্ষ্য।
ভাল গানের শ্রোতা এবং ভাল গানের মূল্যায়ন সবসময় আছে থাকবে, যার প্রমাণ আমরা গত কয়েক বছরেই পেয়েছি। সকল সঙ্গীতানুরাগীদের একাগ্রতা আহবান করছি, দেশ থেকে অপমস্তিষ্কের এবং অপসংস্কৃতির ইতরদের নির্মূল করতে হবে। নয়তো আমাদের প্রাণের সঙ্গীতাঙ্গন একদিন বেসুরের গলিতে হারিয়ে যাবে।
সবার জন্য শুভকামনা, একটি সুস্থ সঙ্গীত হোক পথ চলার সঙ্গী। – মোহাম্মদ আমিন আলীফ

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: