সে কালের মানুষ আমি…

বাংলাদেশের জনপ্রিয় বাউল সঙ্গীতশিল্পী যাকে আমরা রসের মানুষ বলি। তার প্রতিটি কথা এত রসালো যে শুনলে মন ভরে যায়। তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় বাউল শিল্পী কুদ্দুস বয়াতি। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিডিয়ায় পরিচিতি পান তিনি। এরপর অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়ে শ্রোতাদের মনে স্থান করে নেন। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রায় ৫০টি দেশে স্টেজ শোতে গান পরিবেশন করেছেন কুদ্দুস বয়াতি। তবে এ শিল্পী এখন অনেকটাই অন্তরালে। আগে অনুষ্ঠানে গান করলেও এখন সেখানে খুব একটা সরব নন। অনুষ্ঠানে দেখা না গেলেও গানের সঙ্গেই তার বসবাস। আর হবে না কেন বাউলদের সঙ্গীই যে গান। সব সময় তাদের মনে সঙ্গীতের ভালোবাসা বিরাজ করে। তিনি নিজ উদ্যোগে বাউলদের নিয়ে একটি ফাউন্ডেশনের কাজ করছেন। চলতি বছরে ‘আসো মামা হে’ শিরোনামের একটি গান দিয়ে বেশ অলোচনায় এসেছেন এ বাউল শিল্পী। পরে আরও একটি হিপহপ গানে দেখা গেছে তাকে। রসাত্বক এ শিল্পীর সাথে কথা হয় সঙ্গীতাঙ্গন এর। কথার বলার এক পর্যায় তিনি তার একটি খোবের কথা প্রকাশ করেন। আর এ বিষয়টি নিয়ে তার উদিগ্নতার কথা জানান তিনি। পৃথিবী কি এমনই একটি অদ্ভুদ জায়গা যেখানে একদল মানুষ শুধু দিয়ে যাবে আরেক দল শুধু নিয়ে যাবে? এ দেশের একজন শিল্পী হাজার হাজার মানুষকে আনন্দ দেয়। কিন্তু একজন শিল্পী কীভাবে আছেন, কীভাবে তার সংসার চলে, তার ঘরে কি ভাত আছে কিনা!, সে কি খেয়ে আছে, না খেয়ে আছে। তার কোন প্রয়োজনের তাগিদ হচ্ছে কিনা এগুলো দেখার কোনো লোক নেই। বলতে ভিষণ কষ্ট হয় যে, আমাদের অনেক বাউলশিল্পী আছেন যারা রাস্তাঘাটে পড়ে থাকেন। আমার কথা বিশ্বাষ না হলে আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সবাই চলে যাচ্ছে, চলে যাবে, আমিও একদিন চলে যাব, কিন্তু তাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না এই ভেবে আফসোস হয়। আমার গানে আমি মানুষকে মানুষ হওয়ার হুশ দিতে চেয়েছি সব সময়। কিন্তু মানুষ তো বেহুশ। তারা ভাবতে চায় না অন্য একজনের কথা। বহু আগে আমি একটি গান করেছিলাম আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন। বেশ জনপ্রিয় একটি গান যার
মাধ্যমে আমি সফলতার ধার উন্মোচন করতে অনেকাংশে এগিয়ে ছিলাম। গানের কথা গুলো আমি আপনাকে গেয়ে শুনাই!

এই দিন, দিন নয়,
আরো দিন আছে
সেদিনের ঠিকানা
সেদিনের কাছে
আ— আ—- আ, আ——–

আমি গান গেয়েছি ‘এইদিন দিন নয় আরও দিন আছে’, ‘আম খাইও জাম খাইও তেঁতুল খাইও না, অল্প বয়সে বিয়ে করলে প্রাণে বাঁচতা না।’ এসব গানে সচেতনতার কথা ছিল। একতারা-দোতারা নিয়ে দেশে-বিদেশে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমি দেশপ্রেম নিয়ে মরতে চাই। ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়ে সবার মাঝে বেঁচে থাকতে চাই। তাই বিভিন্ন স্টেজে আমি সচেতনতার বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কি হবে আমাদের কথা কেউ কি মনে রাখবে? আমি চেষ্ঠা করে যাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার। তার কারণ একটাই আমি একটা বাউলশিল্পী। বাউলের দুঃখ আমার দুঃখ তাদের জন্য কিছু করতে চাই। কিন্তু সমস্যা একটা তার কাছে পৌঁছাতে এখনও আমাদের ঐতিহ্য, গান, একতারা-দোতারাও ঠিক রাখা প্রয়োজন। লোক শিল্পীরা অনেক কষ্টে আছে। তারা একটি যন্ত্রের জন্য গান গাইতে পারে না। না খেয়ে পড়ে আছে। আমি তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সে জন্য আকুলভাবে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি তাদের সম্পর্কে স্বপ্নের কিছু কথা বলেন তার ইচ্ছা বা আকাঙ্খার কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, আমার দেশের বাড়িতে কিছু নিজের জমি আছে। সেখানেই একটি বিল্ডিং আছে। এটির মধ্যে
একটি জাদুঘরের মতো করব। বাউলদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের ছবি, বাউলদের আদ্যোপান্তের ইতিহাস, নানারকম বাদ্যযন্ত্র আরও অনেক কিছু রাখব। এক কথায় বাউলদের পুরনো ঐতিহ্যের সব কিছু ডিজিটাল বাংলাদেশকে দেখাতে চাই। সঙ্গে অবহেলিত বাউলশিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। এ পর্যন্ত বহু দেশে গান করছি। ভাবতেই ভালো লাগে। তবে আমি তো পড়ালেখা জানি না। তাই ওখানে গিয়ে ভাষাও বুঝি না। এটুকু বুঝি তারা আমার গান অনেক পছন্দ করেন। এ ছাড়া বহু দেশে গেয়েছি। সর্বশেষ ওমান গেলাম। সেখানে বাংলাদেশিরা আমাকে পেয়ে খুব খুশি হন। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বয়াতি কুদ্দুস গানের সাথে যুক্ত আছেন। গান করেন মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে। গানকে তিনি খুব বেশি ভালোবাসেন বলে তার গান গাওয়টাই বেশ করে উৎসাহ দেয়। কখনো নিজেকে নিয়ে তত বেশি লাফ ঝাপ করেননি। খুব অবাক করা ব্যাপার হলো ২৮, ৩০ বছরে তার তেমন কোন এ্যালবাম প্রকাশিত হয়নি। জানা যায় ২০-২২ বছর আগে জীবিকার দায়ে দুটি এ্যালবাম বের করেন তিনি। তিনি কথার ফাকে বলেন এখন ডিজিটাল যুগ। কত নতুন নতুন যন্ত্রের মাধ্যমে গান করা হয়। আমাদের তো এখন আর আগের সময় নেই। তাই বলে কি হয়েছে। পড়ালেখা না জানলে কী হবে, সবাইকে বুঝিয়ে দিলাম সেকালের মানুষ হলেও আমি ডিজিটালের সঙ্গে আছি। তরুণদের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলতে পারি।

৯০ সালের পর হুমায়ূন স্যারের সাথে প্রথমবারের মতো একটা বিজ্ঞাপনে গান গাই ‘এই দিন, দিন না আরও দিন আছে’ শিরোনামে। তারপর থেকে অনেক দেশে-বিদেশে গান গেয়েছি। কিন্তু সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনার গান। মানুষ মরে যায় যাবেই আমাকেও মরতে হবে। আমি মরে গেলেও যেন এ দেশের মানুষ আমাকে মনে রাখে এমন কিছু করে যেতে চাই। বাউলশিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সে জন্য সমাজের বিত্তবান এবং সরকারের সহযোগিতা খুব দরকার। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আপামোর জনসাধারণ সহ সবার কাছে সহযোগীতা চাই। আমরাও চাই দেশের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে বাউলদের গান, যন্ত্র, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেচেঁ থাকুক। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: