চিরকুট…

বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট । ব্যতিক্রমধর্মী গান এবং অনন্য অসাধারণ সুরের জাদু দিয়ে চিরকুট আজ লাখ লাখ বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে । প্রতিনিয়ত তারা নতুন নতুন সব গান সৃষ্টি করছেন এবং মুগ্ধ করছেন গানপাগল শ্রোতাদের । গানের এই জাদুকরী শক্তি নিয়ে ছুটে চলা ব্যান্ড “চিরকুট”কে নিয়েই আজ আমাদের এই আয়োজন।
মগবাজারে তাদের স্টুডিওতে কথা হল চিরকুটের সমসাময়িক ব্যস্ততা, ব্যান্ডের শুরুর গল্প থেকে শুরু করে ভক্তদের সাথে মজার অভিজ্ঞতা–সহ নানা বিষয় নিয়ে। প্রথমেই কেমন আছেন জানতে চাইলে হাসিমুখে উত্তর দিলেন ব্যান্ডটির ভোকাল সুমি । তিনি জানালেন বেশ ভালো আছে তারা ।  বর্তমানে কি নিয়ে ব্যস্ত আছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এই বছরটা আসলে আমরা ফিল্মের গান নিয়ে বেশী জোর দিতে চাচ্ছি । কেননা যদি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বড় না হয় তাহলে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কখনোই বড় হতে পারবে না । তাই এই বছর বেশ কয়েকটা ফিল্মের গান করাই আমাদের লক্ষ্য । গতবছর আমরা “কানামাছি মিথ্যা,কানামাছি সত্য” গানটা করেছিলাম ফিল্মে যা কিনা অকল্পনীয় সাড়া ফেলেছে । এত এত শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়ে সত্যি আমরা আনন্দিত । নতুন কোন কোন ছবিতে চিরকুট গান করছে জানতে চাইলে ব্যান্ডটির ভোকাল সুমি বলেন, মোস্তফা সারওয়ার ফারুকি ভাইয়ের নতুন ছবি “পিঁপড়া বিদ্যা”তে আমাদের একটা গান আছে । ছবিটিতে একটিই মাত্র গান আর সেটা আমরাই করেছি । গানটি বেশ মজার । গানটির নাম হচ্ছে “লেজে রাখা পা” । এছাড়া গোল্লাছুট নামের যে ছবিটি আসছে শাহিন কবির টুটুল ভাইয়ের ওখানে গোল্লাছুট টাইটেল ট্র্যাকটা আমরা করলাম । এর বাইরে আমরা আরেকটা গান করছি সেটা হচ্ছে মুজরা গান যা পুরোপুরি ব্যতিক্রম যা কিনা ব্যান্ডের ঘরনার বাইরে তবে আশা করছি এটাও শ্রোতাদের ভালো লাগবে । মুজরা গানগুলো হচ্ছে আগের দিনের বাইজিরা যখন গান করতো সেইসব গান । আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের গানটায় সেই সময়ের আবহটা সঙ্গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে । গানটি করা হয়েছে “পদ্ম পাতার জল” ছবির জন্য । এছাড়াও আমরা আরেকটি মুভির ফুল ব্যাকরাউন্ড স্কোর করতে যাচ্ছি । যা কিনা বাংলাদেশের কোন ব্যান্ডের জন্য প্রথমই বলা যায় । অনেক ব্যান্ড ফিল্মে গান করেছে বেশ কয়েকটা গানের মিউজিক ডিরেকশন দিয়েছে তবে পুরো ছবির যাবতীয় সাউন্ডের ব্যাপারটা আমরাই প্রথম করতে যাচ্ছি । চিরকুটের জাদুর শহর এর পর নতুন কি অ্যালবাম প্রকাশ হতে যাচ্ছে? নতুন অ্যালবামের কাজও আমাদের চলছে । খুব শীঘ্রই আমরা নতুন অ্যালবামের ব্যাপারটা জানাব।

ব্যান্ডের শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে সুমি বলেন, ব্যান্ডের শুরুটা মূলত আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইআর ডিপার্টমেন্টে পড়ছি তখন থেকে । আইআর এর শিক্ষক,ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সবাই গান পাগল । তখন থেকেই মূলত এটার শুরু । তারপর আস্তে আস্তে পরিচয় হল পিন্টু ঘোষের সাথে, পিন্টু আবার একদিন পরিচয় করিয়ে দিল ইমনের সাথে বলল ছেলেটা বেশ ভালো গিটার বাজায় । তারপর আস্তে আস্তে পাভেল, তমাল,দিদার এর সাথে পরিচয় । একদিনে তো না আস্তে আস্তেই সবকিছু হয় । এভাবেই আমরা ব্যান্ড করে ফেললাম । কিন্তু আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় এটা শুরু করলেও আমরা আত্মপ্রকাশ করি ২০১০ সালে । নতুন ব্যান্ড ছিলাম সেভাবে ভালো কোন সাড়া পাচ্ছিলাম না ঠিক সেই সময় ব্রাক ব্যাংক আমাদের পাশে দাড়ায় আমরা প্রকাশ করি “চিরকুট নামা” অ্যালবামটি । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অ্যালবামটি বাজারে পাওয়া যায়নি । এটাই আমাদের শুরুর গল্প আর এখন আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের অনেক শ্রোতার তৈরি হয়েছে এবং তাদের ভালোবাসা নিয়েই গান করছি এবং করে যাব ।
এবার প্রশ্ন করা হয় ব্যান্ডটির আরেকজন ভোকাল এবং বেহালাবাদক পিন্টু ঘোষকে। জানতে চাওয়া হয় নতুন যারা ব্যান্ড করতে চায় তাদের ব্যাপারে কিছু উপদেশ দিন । পিন্টু হাসিমুখে বলেন, উপদেশ দেবার আমরা কে ? আমরা বরং মতামত দিতে পারি । নতুন যারা ব্যান্ড করছে তাদের জন্য প্রথমেই যে কথাটা বলব সেটা হচ্ছে অনেক বেশী গান শুনতে হবে । গানকে অনেক বেশী ভালবাসতে হবে । শ্রোতা হিসেবে নয় গান বানানোর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও গান শুনতে হবে । আর ব্যান্ড করবার কথা যদি বলি তাহলে যে বিষয়টা আগে বলা দরকার সেটা হচ্ছে ব্যান্ডের মধ্যে বোঝাপড়া ব্যাপারটা খুব দরকার । ৬-৭ টা মানুষ নিয়ে যে দলটা করা হচ্ছে এই দলের সবার মাঝে ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুবই দরকার । একটা দলে যেমন স্ট্রাইকার থাকে ডিফেন্ডার থাকে তেমনি গোলকিপারও থাকে । ব্যান্ডের ক্ষেত্রেও এমন একজন গোলকিপার দরকার যে সবাইকে আগলে ধরে রাখবে ।
ব্যান্ডের মজার কোন অভিজ্ঞতা বলুন জানতে চাইলে পিন্টু ঘোষ বলেন, আসলে আমরা যখন একসাথে থাকি প্রতিনিয়তই মজা করি । তবে আনন্দের কিছু ঘটনা আছে । যেমন শ্রীলংকায় যখন কনসার্ট করে বের হয়েছি তখন দেখলাম একদল মানুষ তাদের মতো করে গাইছে কানামাছি মিথ্যা,কানামাছি সত্য গানটা । বিদেশীদের মুখে নিজেদের গান শুনে খুব ভালো লাগছিল । এমন সময় ব্যান্ডের ভোকাল সুমি বললেন, আসলে এরকম ব্যাপার সত্যি খুব আনন্দের । যেমন নরওয়ে-তে আমরা ৬ টা সিটিতে শো করেছিলাম । মজার বিষয় হচ্ছে শো গুলো বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ছিল না ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটিতে ছিল । বিশ্বের বড় বড় ব্যান্ডগুলো যেমন পারফর্ম করে ঠিক তেমন । আমরা নরওয়ে গর্ভমেন্টের আমন্ত্রণে ওখানে গিয়েছিলাম । ওখানে কনসার্ট করবার পর ওদের যে সাড়া পেয়েছি সত্যি তা কখনো ভুলবার মতো না । নরওয়ের শ্রোতারাতো আসলে অনেক বেশী ভদ্র তাই ওরা সহজে তালি বাজায় না তাই শিল্পীদের অনেকেই তাদের উপর রাগ করে যে শ্রোতারা উৎসাহ দিতে পারে না । আমাদের কনসার্টের সময় যে বিষয়টা হয়েছে তা হল একটা দর্শকও বসে ছিল না। ঠিক যতক্ষণ কনসার্ট হয়েছে ততক্ষণই তারা দাড়িয়ে তালি বাজিয়েছে । পুরনো ঢাকার কিছু ভক্ত সেদিন অনেক অনেক বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে হাজির হয়েছে । এরকম আসলে অনেক ঘটনা আছে । এখন হয় তো সব বলে শেষও করা যাবে না । এখন বরং দেখে নেওয়া যাক চিরকুটের লাইন আপ ।
ভোকাল – সুমি
ভোকাল এবং বেহালা – পিন্টু ঘোষ
গিটার-ইমন
বেইজ গিটার- দিদার
রিদম গিটার- তমাল
ড্রামস- পাভেল
ব্যান্ড নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছেন জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, সময়কে গানের মাধ্যমেই ধরে রাখতে চান তারা । রবীন্দ্রনাথ যেমন তার সময়কে গানের মাঝে তুলে ধরেছেন, নজরুল যেমন তার সময়কে তুলে ধরেছেন ঠিক তেমনি আমরা আমাদের সময়কে আমাদের গানের মাঝে তুলে ধরতে চাই । আর চাই সংগীত নিয়ে বাংলাদেশের নাম পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় পৌঁছে দিতে । বাংলাদেশের গানকে পৃথিবীর মাঝে ছড়িয়ে দিতেই আজীবন কাজ করে যেতে চান তারা । – মশিউর রহমান শান্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: