পাগল বাচ্চুকে স্মরণ করলেন হাসান মতিউর রহমান…

জনপ্রিয় সঙ্গীত ব্যাক্তিত্ব হাসান মতিউর রহমান। তাকে জানে না বা চিনে না এমন মানুষ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। পাগল বাচ্চুও তেমনি পরিচিত মানুষ। পাগল বাচ্চুর স্মৃতিচারণ করলেন হাসান মতিউর রহমান। তার স্ট্যাটাস এ তিনি লিখেন –
এই সেই পাগল বাচ্ছু। মোঃ বাচ্চু দেওয়ান। জন্ম ঢাকা শাহ জালাল বিমান বন্দরের কাছেই দক্ষিনখানে। উনার গানের ওস্তাদ খালেক দেওয়ান সাহেব। প্রথম জীবনে ওস্তাদের সাথে চিকন গলায় দোহারি করতেন। পরে নিজেই আলাদা দল বানিয়ে পালাগান গাইতে থাকেন। অল্প দিনেই একটা অবস্থান করে নেন। বাংলাদেশ বেতার কিছুদিন আগে শাহবাগ থেকে আগারগাঁও স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তখন আমি বেতারেই বেশি গান লিখতাম। কাজ না থাকলেও আড্ডা দিতাম। ১৯৮৪ সালের কথা। নিজের ক্যাসেট কোম্পানি চেনাসুর খোলার পর রাস্তা ঘাটে খালি সবার মাথার দিকে তাকাই। লম্বা চুল দেখলেই মনে হয় শিল্পী। উপযাচক হয়ে ভাব জমাই। কারণ তখন আমার নতুন নতুন শিল্পীদের গান করার নেশা ধরে গেছে। চা খেতে বেতারের কেন্টিনে ঢুকতেই দেখি একটা টেবিলে কয়েকজন শিঙাড়া খাচ্ছে। সামনে ছোট্ট প্লেটে পেয়াজ কাচা মরিচ। খুব জমিয়ে চিবুচ্ছে। একজনের মাথায় অনেক লম্বা চুল। এগিয়ে গেলাম। নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, একটা কথা বলতে চাই। বসতে বললেন।

বসলাম। আমার জন্য চা- শিঙাড়া অর্ডার দিলেন। সব জেনে বললাম, রেকর্ড ও ক্যাসেটের জন্য কিছু গান আপনার গলায় রেকর্ড করতে চাই। উনার পাশে বসা একটি মেয়ে দেখিয়ে বললেন, ওকেও যদি চান্স দ্যান তা হলে করতে পারি। খুব ভাল গায়। দেখতে পিচ্চি হলে কী হবে! দেখি মেয়েটির হাতে কালো বাক্সবন্দি বেহালা। মেয়েটি এত ছোট যে তার চেয়ে বেহালা বড়। নাম মায়ারানী।
গান করতে রাজি হলেন। তারপর দিনই গেলাম বাসায়।
একটার পর একটা গাইতে লাগলেন। সাথে নিজের যন্ত্র শিল্পীরা। ভাবে মজে গেলাম। উঠতেই মন চায় না। গানের যে কী সুর। কলজে ছিঁড়ে যায়। সেদিন বাচ্চু ভাই যে কী খাতির যত্ন করলেন, কত কিছু যে খাওয়ালেন জীবনেও ভুলবোনা। কয়দিন পরেই ঝংকার স্টুডিওতে রেকর্ড করলাম। দুই জনের ১৬টা গান। আরো এক ঘন্টা সময় আছে। বাচ্চু ভাই বললেন দুইজনে একটা পালা গেয়ে দেই। বললাম বাচ্চু ভাই, নারী ও পুরুষ পালাটা গেয়ে দেন। শুরু হল পালা। পাগল বাচ্চু আর উনার ছাত্রী মায়ারানী। মেয়েটিও পাল্লা দিয়ে যা গাইল, সবাই অবাক হয়ে গেলাম।

মাস খানেকের মধ্যেই প্রথম বের করলাম চেনাসুর থেকে পাগল বাচ্চুর জীবনের প্রথম একক ৪টি গানের মাইকের রেকর্ড। বের হতেই মার মার কাট কাট। সুপার হিট। যেখানে যাই সেখানেই পাগলের গান। খুশীতে চোখ ভিজে যায়। এরপর ছাড়লাম বাচ্চু – মায়ার পালাগান নারী ও পুরুষ। স্টুডিওতে রেকর্ড করা দেশের প্রথম পালা গানের ক্যাসেট। একটা গান ‘মাইয়া তুই পচা কাঁঠাল বিক্রি হবি কোন জাগায়’ ওই সময় সবার মুখে মুখে ছিল। এর আগে গ্রাম গঞ্জের আসর থেকে টেপ রেকর্ডারে তুলে এনে বাজারে বিক্রি করতো ডেমরা সারলিয়া বাজারের কাশেম ভাই। ছাড়তে দেরি হলেও হিট করতে দেরি হল না। আমার এই প্রয়াসে অডিও শিল্প পেল দুজন ভাল শিল্পী এবং কিছু চমৎকার গান। এই রেকর্ড এর প্রথম গান ছিল –
‘ ওই রুপ তোমার ঝলক মারিয়া পাগল করলা আমারে
একবার এসে প্রাণ বন্ধু দেখা দাও মোরে’..
দেশে কিছু ফাজিল আছে নিজে পারেনা অন্যের হিট গান না জানিয়ে গেয়ে ফেলে। চট্টগ্রাম থেকে একটা ব্যান্ডের পোলাপান গানটা গেয়ে ছেড়ে দিল। বাচ্চু ভাই আর আমি মামলা করতে উকিলের কাছে গেলাম। কপিরাইট আইনের কথা উনিও জানেন না আমরাও না। মন খারাপ করে ফিরে এলাম। পরে প্রযোজক হাতে পায়ে ধরে আপোষ করেছে।
পাগল বাচ্চু আজ নেই আছে উনার গান এই গানেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
আমার কানে আজও বাজে
চিকন গলায় মধুর সুর,
‘এত জ্বালা দিলি বন্ধু
সইতে না আর পারি’…
– মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: