Press "Enter" to skip to content

অষ্টক গীত ও নৃত্য…

অষ্টক গান বা অষ্টক নাচ বাংলাদেশের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রধান ধারা। এটি সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তীর নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠানের সময় পরিবেশিত হয়ে থাকে। আজ আমরা অষ্টক গীত কি? এর নামকরণ এর ইতিহাস ও উৎপত্তি উৎস সম্পর্কে ধারণা লাভ করবো।

সাধারণভাবে, চৈত্র মাসের শেষ-তিন দিন গাজন উৎসব এর আনুষঙ্গিক ‘নীলের, শিবের গাজন’ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষতঃ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সংগঠিত লোকজ মেলায় বিভিন্ন ধরনের গান ও আচার-অনুষ্ঠানাদিতে অন্যতম প্রধান আনুষঙ্গিক পরিবেশনা হিসেবে আয়োজন করা হয় অষ্টক গীত ও নৃত্য।

বাংলায় ষড়ঋতুর পরিক্রমায় বসন্তের শেষ ভাগে ও গ্রিস্মের পূর্ব-ভাগে অনুষ্ঠিত হয় গ্রামীণ জনপদের অন্যতম প্রধান লোকজ-উৎসব ‘চৈত্র-সংক্রান্তী’। এসময়ই মূলত বাংলার লোকজ উৎসবের অন্যতম প্রধান ধারা ‘গাজন’-এর শাখা ‘নীলের, শিবের গাজন’ অনুষ্ঠিত হয় এবং এই উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জমে উঠে এক-ধরনের লোকজ মেলার যা চৈত্রের শেষ-তিন দিন বিভিন্ন ধরনের গান ও আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনের মাধ্যমে সমাপ্ত করা হয়। আর এ-সময় এ অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ তাদের চলমান ঐতিহ্য অনুসারে পরিবেশন করে থাকে অষ্টক গীত,নৃত্যের।

বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের পূর্বাংশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম একটি প্রধান উপাদান হলো এই অষ্টক গীত, নৃত্যের পরিবেশনা; যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার প্রেয়সী শ্রীরাধিকা দেবীর প্রণয়-লীলার পটভূমিতে রচিত। এটি এ-অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্যতম প্রধান লোকজ উৎসব ‘চৈত্র-সংক্রান্তী’-এর সাথেই মূলত সম্পর্কিত তবে এটি শিবের স্থলে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলা বিষয়ক আখ্যান ও লোকপুরাণ অবলম্বনে পরিবেশিত হয়ে থাকে। এর পরিবেশনাতে গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-ছোকরারা শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধিকা দেবী ও রাধার শখী গোপীদের সাজ সেজে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গান ও নাচ সহযোগে সাধারণত রাধা-কৃষ্ণের ‘নৌকা-বিলাস’ পালা অভিনয় করে থাকে। চৈত্র-সংক্রান্তী উৎসবের কয়েকদিন পূর্ব হতে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির সামনে একদল শিল্পী গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান আয়োজনের লক্ষ্যে অর্থ সংগ্রহ করে; যেখানেও আমরা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের গীত, নৃত্যের পরিবেশনার মধ্যে কখনো কখনো অষ্টক গীত, নৃত্য-এর পরিবেশনা দেখতে পাই। আর এক্ষেত্রে বিষয়-বস্তু হিসেবে থাকে শিব, রাধা-কৃষ্ণ, নিমাই সন্ন্যাসী, গৌরী, বক্ষ্রা, বিষ্ণু, চন্ডিদাস-রজকিনী, বেহুলা-লখিন্দর এই অষ্ট-প্রসঙ্গ। ঠিক কি কারণে বা কোথা থেকে “অষ্টক” নামক গীত, নৃত্যের উদ্ভব ঘটেছে সে সম্পর্কে সঠিকভাবে কোনো তথ্য-বৃত্তান্ত জানা যায় না, বরং এই বিষয়ে নানা ধরনের মতামত প্রচলিত রয়েছে।
কেউ বলেন, ‘এতে আটটি বৈষ্ণবীয় প্রসঙ্গ থাকায়’; কেউ বলেন, ‘প্রতি দলে আট জনে মিলে রাধা-কৃষ্ণের উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক নাট্যধর্মী গীত পরিবেশন করায়’, কারো মতে, ‘এটি শ্রীকৃষ্ণের অষ্টপ্রহরের লীলা-সংক্রান্ত নাট্যগীতি হওয়ায়’- একে “অষ্টক গীত, নৃত্য” বলা হয়। আবার এ সম্পর্কে কোন কোন গবেষকের মতে, এ-সব গানে সনাতন ধর্মীদের অষ্ট-অবতার রাধা, কৃষ্ণ, সুবল, বিশাখা, ললিতা, বৃন্দা, বড়িমাই ও বলরাম-এর বিভিন্ন কার্য-চরিত্রের সমন্বয় ঘটেছে বলে এটি অষ্টক গীত,নৃত্য বলে পরিচিত; বিপরীতে অপর একদল বলেন, অবতার শ্রীকৃষ্ণ তার অষ্ট বা আটজন শখীকে নিয়ে লীলা করতেন এবং এ-গানে সেই উপাখ্যান আলোচিত হয় বলে একে অষ্টক গীত নৃত্য বলে। অন্য-দিকে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এই গীত, নৃত্যে “বাসলী দেবী”-এর বন্দনাও রয়েছে, যা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন বড়ু চন্ডীদাস রচিত “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” কাব্যের ভণিতায়ও লক্ষণীয়, তাই বলা যায় উৎস যা-ই হোক না কেন, লোক-সংস্কৃতির এই ধারাটি সুদূর প্রাচীন কাল হতে এদেশের লোক-মানসের সাথে প্রচলিত প্রথার একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।

বিভিন্ন অঞ্চলে একে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়; যেমনঃ ওপার বাংলার মুর্শিদাবাদ ও মালদহ অঞ্চলে ‘অষ্টকগান’ নামে, এপার বাংলার বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে ‘অষ্টগান’ নামে, ফরিদপুর, বরিশাল অঞ্চলে ‘অষ্টক গীত, নৃত্য’ নামে এটি পরিচিত। আজ এ পর্যন্ত। অন্য কোন একদিন জানবো এর আরো অজানা কিছু মজার তথ্য। – মোশারফ হোসেন মুন্না

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: