সঙ্গীতাঙ্গন এর আড্ডায় সাবিনা ইয়াসমিন…

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তী সাবিনা ইয়াসমিন। ৪০ বছর ধরে গান গাইছেন এ দেশের মানুষের জন্য। তার গানের জনপ্রিয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। তার অসংখ্য গান যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের এক সম্রাজ্ঞী তিনি। জন্মদিনে একান্ত আপনজনের মত এই গুনী শিল্পী জানালেন তার জীবনের অনেক কথা। তিনি বলেন শিল্পী না হলে আমি শিক্ষক হতাম। স্কুলের ছোট বাচ্চাদের পড়াতে আমার খুব ভালো লাগতো মনে হয়। এমন মহান পেশার চিন্তা কেবল মহান মানুষেরই থাকে। তবে শিল্পী না হয়ে শিক্ষক হলে আমরা হয়তো এমন মিষ্টি সুরের গান গুলো শুনতে পেতাম না। সাবিনা ইয়াসমিনের এক ছেলে, এক মেয়ে। তিনি বলেন ওরা তো বড় হয়ে গেছে। মেয়ে ব্যাংকে চাকরি করে আর ছেলে পড়াশোনা করছে ইংল্যান্ডে। তাদের নিয়েই আমার পৃথিবী। আপনার স্বপ্ন কি ছিলো বড় হয়ে শিল্পী হবেন ? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা একটা মজার প্রশ্ন। কারন স্বপ্ন কি ছিলো তা ভাবার আগেই গান গাইতে শুরু করেছি। সুতরাং অন্য কিছু চিন্তা করতে পারিনা। মনে হয় এর জন্যই হয়ত পৃথিবীতে এসেছি। আমি ছোট বেলায় প্রতিমা ব্যানার্জির মতো গান গাইতে চেষ্টা করতাম। খুব পছন্দ করতাম। আর, লতা, আশা, নির্মলা মিশ্র, গীতা দত্ত এদের গান আমার খুব ভালো লাগতো।

দেশাত্মবোধক গান আমার খুব ভালো লাগতো। দেশাত্মবোধক গান শুনলেই আমি সব কাজ ফেলে ওখানে ছুটে যেতাম। ৭১ সালে যেটুকু দেখেছি তারপর গান যেন আপনা থেকেই বেরিয়ে আসতো। একজন ভালো শিল্পী হতে হলে কি কি করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, গ্রামার বলতে গানের ক্ল্যাসিকাল বুঝি, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। আমি এটা বলবো না যে খুব বেশি পারদর্শী হতে হবে। তবে বেইজটা প্রয়োজন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা না থাকলে সব গান গাওয়া কঠিন। প্রতিদিন রেওয়াজ করা, প্র্যাকটিস করা, গলা সাধা প্রয়োজন। অবশ্যই শুদ্ধ উচ্চরণ এর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

তার দু’একটি বড় অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমেই বলতে হয় লতাজির কথা। ওনার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিলো বোম্বেতে। বোম্বেতে একবার গান গাইতে গিয়েছিলাম। তখন আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে সব জায়গায় গান গাইছি। গান গাওয়ার ওখানে অনেকে বসেছিলেন। যেমন, এস ডি বর্মন, অমিতাভ বচ্চন, জয়া ভাদুড়ী, রাজ কুমার আরো অনেকে। হঠাৎ দেখি লতা মঙ্গেশকর ঢুকছেন। তাকে দেখে আমি এতই ভয় পেয়ে গেছি যে হারমোনিয়াম বন্ধ করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলাম। এটা ৭২ সালের কথা। বয়স তখন কম ছিলো। তারপর সবাই আবার জোর করে ধরে বসিয়ে দিলো। ওখানে শচীন দেব আমাকে বল্লেন, আমার দেশের পল্লীর গান শোনাতে। আমি তখন ‘নাইয়ারে নাওয়ের বাদাম তুইলা…’ গানটি গাইলাম। তখন লতা মঙ্গেশকর উঠে এসে আমাকে আশীর্বাদ করলেন। সেই দিনটির কথা আমি জীবনেও ভুলবো না। তার সাথে কথা বলে জানা যায় উনার পছন্দের শিল্পী ছিলেন মেহেদী হাসান, রুনা লায়লা এবং শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তাদের গান তিনি বেশি শুনতেন। মোট গানের সংখ্যা কত? জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি ৪০ বছর ধরে গান করছি। গানের সংখ্যা ১০-১২ হাজার তো হবেই। তবে সব গানের মাঝে আমার প্রিয় গান হলো শ্যামল মিত্রের – তুমি কি এমনই করে থাকবে দূরে, যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন। তার শিল্পী হবার পিছনে মায়ের অবদান বেশি বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, একজন মা-ই পারেন তার সন্তানকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের শিল্পীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ভালো মানের শিল্পী আসছেতো বটেই। তবে তারা তেমন মনোযোগী না। এত অল্প সময়ে তারা সব পেয়ে যাচ্ছে যা তারা চিন্তাই করতে পারেনি। অর্থের পেছনে ছুটছে। নিজেকে ধরে রাখতে পারছেনা বলে ওরা টিকে থাকতে পারছেনা। সব কিছুরই অধ্যাবসায় দরকার। নতুন প্রজন্মের বিষয়ে আমি একটা কথা বলতে চাই। প্রথমত গানের স্কুলেতো যেতেই হবে। ওখান থেকে সুর ভালো শিখবে। আর বাংলা গান শোনাতে হবে বেশি বেশি। আর যেটা জরুরী তা হলো শুদ্ধ করে বাংলা শব্দগুলো খেয়াল করা। তাহলে এক সময় অবশ্যই ভালো বাংলা গান গাইতে পারবে
তারা। ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেবার জন্য। সুস্থ্য সুন্দর জীবন কামনা করি। – মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: