Press "Enter" to skip to content

আজ রাম কানাই দাস এর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী…

হাওড় অঞ্চলের ঘাটুগান, বাউলগান, ত্রিনাথের গানের গায়ক-গীতিকার যখন বাবা রসিকলাল দাশ আর মা দিব্যময়ী দাশ যখন গীত রচনা করেন, ‘ও রে বন্ধু রসিকচান/ রাখলে না তুই আমার মান/ সাবধানে সাবধানে আইও/ নইলে পাইবায় অপমান’, তখন তাদের কোলের রামকানাই দাশের নিয়তি তো সঙ্গীতের সুতোয় বাঁধা ছাড়া আর উপায় থাকে না। সঙ্গীত-পরিবারের জন্ম নেয়া রামকানাই দাশ তা-ই শুনে শুনে গান শিখে একসময় হয়ে ওঠেন পণ্ডিত রামকানাই দাশ। লোকসঙ্গীতের প্রায় সব প্রকরণ তার ছিল কণ্ঠায়ত্ত। রবীন্দ্রসঙ্গীতের তিনি বিচারক ও প্রশিক্ষক, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম পুরোধা, শুদ্ধ সঙ্গীত প্রসারের অগ্রসৈনিক হিসেবে তিনি সম্মানিত হয়েছেন দেশে-বিদেশে সর্বত্র। ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি লোকান্তরিত হলেও তার সুর এখনো রয়ে গেছে অগণিত ভক্তের কণ্ঠে। প্রজন্ম-পরম্পরায় এই সুর প্রবাহিত হতে থাকবে। সুরের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন সঙ্গীতগুরু পণ্ডিত
রামকানাই দাশ। রামকানাইয়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা গ্রামের পুটকা গ্রামে মামাবাড়িতে। পৈতৃক বাস দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামে। বাবা-মা দুজনেই সঙ্গীতের সাধক। তার ঠাকুরদা প্রকাশচন্দ্র তালুকদারও ছিলেন গায়ক ও গীতিকার। ‘করো মা অতিথের সেবা, পূর্ণ হবে মনের আশ’ প্রভৃতি গান লিখে লোকসুরে পরিবেশন করেছেন তিনি। রামকানাইয়ের ঠাকুরদা তো বটেই, বাবার ঠাকুরদা রামচন্দ্র তালুকদারও ঘাটুগান রচনা করেছেন অসংখ্য। বড়বোন সুষমা দাশও ধামাইল গানের একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পী। ছোট একভাই মহাপুরুষ দাশ বংশীবাদক হিসেবে এলাকায় খ্যাতিমান। আরেক ছোটভাই সুধীরলাল দাশও লোকসঙ্গীত পরিবেশন করেন। পরিবারে যখন সঙ্গীতের আবহ, তখন রামকানাইকে আর ঠেকায় কে? গ্রামে যখন প্রায় প্রতি রাতেই গানের আসর বসে, তখন রামকানাই বা সুরের টানে আটকা পড়বেন না কেন? সাত-আট বছর বয়সেই কবিগান, বাউলগান, কীর্তনগান, উরিগান, ঢিক-লরানির গান, সারিগান, ত্রিনাথের গানে তিনি কণ্ঠ দিতে শিখেছেন।

যাত্রাগানের তবলাবাদক হিসেবে তার পেশাগত শিল্পীজীবন শুরু হলেও ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে নিজস্ব তবলাবাদক হিসেবে চাকরি নেন। এ সময় তিনি খেয়াল ও নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭০-রের নির্বাচনে তিনি গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে গান গেয়েছেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের জাতীয়ভিত্তিক সঙ্গীত সম্মেলনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমিতে ‘শুদ্ধ সঙ্গীত প্রসার গোষ্ঠী’র সম্মেলনে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পরিবেশন করে বোদ্ধামহলের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। ১৯৮৫ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সিলেট শাখার উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে ‘সঙ্গীত পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ছায়ানট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ধ্রুব পরিষদ বাংলাদেশে, শুদ্ধসঙ্গীত প্রসার গোষ্ঠী, সংকেত সাংস্কৃতিগোষ্ঠী, সঙ্গীতাশ্রম, সুরধ্বনি সঙ্গীত নিকেতন যশোর, নারায়ণগঞ্জ লাক্ষ্যাপাড় শাস্ত্রীয়সঙ্গীত উৎসব, ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতি কেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন এবং আতিথ্য গ্রহণ করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। সঙ্গীতের জন্য পেয়েছেন রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ-এর ‘রবীন্দ্র পদক’ (২০০০), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড (২০১০), বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ (২০১২), মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মানা (২০১৩) এবং রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’ (২০১৪)। এসব পুরস্কারের চেয়েও বড় পুরস্কার তিনি পেয়েছেন তার উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে। তার সঙ্গীতের ধারা বহন করে চলছেন স্ত্রী সুবর্ণা দাশ, কন্যা কাবেরী দাশ, পুত্র পিনুসেন দাশ ও পুত্রবধূ অনিন্দিতা চৌধুরী এবং তিন নাতনি পারমিতা দাশ, শ্রুতিকণা দাশ ও সুপর্ণা শৈলী।

তার গাওয়া গান ধরা রয়েছে ‘বন্ধুর বাঁশি বাজে’ (২০০৪), ‘সুরধ্বনির কিনারায়’ (২০০৫), ‘রাগাঞ্জলি’ (২০০৬), ‘অসময়ে ধরলাম পাড়ি’ (২০০৬), ‘পাগলা মাঝি’ (২০১০) প্রভৃতি সিডিতে। তার সুর করা গানগুলোর মধ্যে ‘সুয়া উড়িল উড়িল রে জীবের জীবন’ (শীতলাং শাহ), ‘জ্বালাইল পীরিতের আগুন আমার মনে রে’ (হাছন রাজা), ‘জলে গিয়েছিলাম সই’ (রাধারমণ) বাংলাগানের নিজস্ব ঐতিহ্যে অঙ্গীভূত হয়েছে। রামকানাই দাশের নিজের লেখা, সুর করা ও গাওয়া গানগুলোর মধ্যে ‘আমি যে ডাল ধরি ভাইঙ্গা পড়ি’, ‘কোন সন্ধানে করছো খেলা’, ‘কোকিলায় কইরাছে ধনী’, ‘আজানের বয়ানে শোনো তোমার আমার প্রাণের সুর’, ‘মানুষে মানুষে কেন বিভেদ হয়’ গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার লেখা গান এখন কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন কাবেরী দাশ ও অণিমা মুক্তির মতো খ্যাতিমান শিল্পী এবং তার প্রতিষ্ঠিত সংগীত পরিষদের শিল্পীরা। রামকানাই দাশ বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন নতুন প্রজন্মের এসব শিল্পীর সুরের মধ্যেই। তার ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা। – মোশারফ হোসেন মুন্না

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: