Press "Enter" to skip to content

বাউল সাধক উকিল মুন্সীর স্মৃতি রক্ষায় হচ্ছে সংগ্রহশালা…

পূবালী বাতাসে/আমার গায়ে যত দুঃখ সয় বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়/ কিংবা আমার কাঙ্খের কলসী জ্বলে গিয়াছে ভাসী মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া – এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা বাউল সাধক উকিল মুন্সী। প্রয়ানের ৪০ বছর পর সরকারি অর্থায়নে তার সমাধীস্থলে হতে যাচ্ছে ‘উকিল মুন্সী সমাধী কমপ্লেক্স ও সংগ্রহশালা’। এতে কী কী থাকবে প্রাথমিকভাবে এর একটি খসড়া পরিকল্পনাও করা হয়েছে। নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুরে গ্রামে বেতাই নদীর কুল ঘেষে যে উকিল মুন্সীর সমাধী রয়েছে সেটিকে ভিন্ন-আঙ্গিকে পাকা করা হবে। তার সঙ্গে যুক্ত একটি লম্বা দেয়ালে উকিল মুন্সীর কিছু গান স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়া হবে। থাকবে একটি সংগ্রহশালাও, যেখানে উকিল মুন্সীর গান, গানের এ্যালবাম, তার পান্ডুলিপি, তাকে নিয়ে সম্পাদনা ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ইত্যাদি সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়াও উকিল মুন্সীর সমাধীর পাশে তার পরিবারের লোকজনের থাকার জন্য একটি পাকা ঘরও করে দেওয়া হবে, যা এই সমাধী কমপ্লেক্সের মূল পরিকল্পনারই অংশ। উকিল মুন্সীর সমাধীস্থল ও তার পুত্র প্রয়াত বাউল সাধক আবদুস সাত্তারের স্ত্রী গীতিকবি ফুলবানুর আবাসস্থল পরিদর্শনকালে
গত বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান এমন উদ্যোগের কথা জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, উকিল মুন্সী সম্পর্কে এই এলাকার মানুষের যে আবেগ, সারাদেশে ও দেশের বাইরে তার গানের যে ভক্ত-শ্রোতা রয়েছে তাতে করে উকিল মুন্সীর স্মৃতি রক্ষায় কিছু একটা করার আবেগ ব্যক্তিগতভাবে আমিও সংবরণ করতে পারলাম না। তাই সরকারী সহায়তায় এ কাজটি আমরা করতে যাচ্ছি। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি কাজটি করতে পারব। এসময় নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম, নেত্রকোণা জেলা পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী, নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি লিটন, মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী মাহমুদ আকন্দ, মোহনগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ ইকবালসহ স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

সাজ্জাদুল হাসান জানান, উকিল মুন্সীর নিজস্ব সম্পদ খুবই স্বল্প। তাই সম্ভব হলে বাড়ির পাশের কিছু জমি কিনে পুরো কাজটি সম্পাদন করা হবে। এমন একটি কাজের জন্য এলাকাবাসীর সার্বিক সহায়তা ও আন্তরিকতা কামনা করেন তিনি। এলাকাবাসী জানান, জগত জুড়ে উকিল মুন্সীর সুনাম। দীর্ঘদিন ধরে উকিল মুন্সীর সমাধীটি অবহেলায় পড়ে আছে। তার গান গেয়ে প্রয়াত বারী সিদ্দিকীসহ অনেক শিল্পী খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু উকিল মুন্সীর উত্তরসূরীরা খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করছেন। তা দেখে দীর্ঘদিন ধরেই উকিল ভক্তরা উকিল মুন্সীর বাড়ি ও সমাধীস্থল সংরক্ষণের জন্য দাবী জানিয়ে আসছিলেন। ২০১৪ সালের দিকে উকিল মুন্সীর বাড়িতে মানববন্ধন করে এমন দাবী জানায় মোহনগঞ্জের নাগরিক আন্দোলন নেতাকর্মীরা। এছাড়াও মোহনগঞ্জের সংস্কৃতিমনা মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে উপজেলাটির সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের উদ্যোগে সরকারি অর্থায়নে প্রাথমিকভাবে সমাধীটি পাকা করনের ব্যবস্থা হয়।

মোহনগঞ্জবাসী কবি ও নাট্যকার রইস মনরম বলেন, হাওর অঞ্চলের এক অনন্য প্রতিভার নাম উকিল মুন্সী। তিনি তার গানে এই এলাকার রূপ বৈচিত্র্য, এলাকার মানুষ, মানুষের ভেতরের সুর ও অসুরের কথা এক অসামান্য ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে উকিল মন্সী আর তখন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আবদ্ধ থাকেন নাই। তার খ্যাতি ছড়িয়ে যায় দেশ থেকে দেশের বাইরে, সমস্ত বাংলাভাষী মানুষের কাছে। ছড়িয়েও গেছেন। গৃহবাসী বাউল উকিল মুন্সী আজ সারাবিশ্বের বাংলাভাষী মানুষের কাছে এক আদরণীয় নাম।
মোহনগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ ইকবাল জানান, উকিল মুন্সীর জন্য কিছু একটা করার ব্যাকুলতা আমাদের অনেক দিনের। এই কাজটির মধ্য দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের একটা জার্নির বাস্তব রূপ দেখাতে পারবো। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।
উকিল মুন্সীর পুত্র বাউল সাধক সাত্তারের স্ত্রী গীতিকবি ফুলবানু এলোমেলো ভাষায় যা বললেন তা এই দাঁড়ায় – উকিল মুন্সী তার উস্তাদ এবং শ্বশুর। উকিল যেমন দেখতে সুন্দর ছিলেন তেমনি সুন্দর জীবন যাপন করে গেছেন। একইসঙ্গে মসজিদের ইমামতি এবং বাউল গান চর্চা করে গেছেন। ভেতর বাইরের এক ও অবিচ্ছেদ্য মানুষটির কর্মকাণ্ড কখনো ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে আঘাত করেনি।
উকিল মুন্সীর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১১ জুন। নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ি থানার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে একটি ধনাঢ্য পরিবারে। তার পারিবারিক নাম আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবে তিনি ঘেটুগানে যোগ দেন। পরে গজল ও পরিণত বয়স থেকে মৃত্যুর পূর্ব পযন্ত বাউল সাধনায় লিপ্ত থাকেন। করেছেন মসজিদে ইমামতি ও মক্তবে আরবি পড়ানোর কাজ। শেষ জীবনে তিনি মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাস করতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৩ নম্বই বছর বয়সে তিনি মারা যান। আমরা তার বিদেহি আত্নার মাঘফেরাত কামনা করি। – মরিয়ম ইয়াসমিন মৌমিতা।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: