Press "Enter" to skip to content

হিজড়াদের জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’…

হিজড়াদের প্রতি ছোট বেলা থেকেই বিরূপ ধারণা বা মনোভাব নিয়ে আমরা বেড়ে উঠি। এদের সম্পর্কে কোন প্রকার সঠিক তথ্য আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষিতরা এমনকি অনেক ডাক্তাররা পর্যন্ত দিতে পারেন না। আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত প্রজনন এবং লিঙ্গ নির্ধারণ ভিত্তিক কথাবার্তা খুব ভীতি সহকারে এবং গোপনে আলোচনা করা হয় যার কারণে এরকম ব্যাপার গুলা খুবই স্পর্শকাতর বলে ভাবা হয়। পৃথিবীতে পুরুষ ও স্ত্রীলিঙ্গ নামক দুই প্রকার লিঙ্গ যুক্ত মানুষ থাকলেও মানুষের জটিল দেহ গঠনে মাতৃগর্ভে বাচ্চার লিঙ্গ জেনেটিক্যালি নির্ধারিত হবার সময় লক্ষ জন মানুষের ভেতর দু’একটা ভুলচুক হয়ে যায় মাঝে মাঝে। যাদের থেকে এই হিজড়ার উৎপত্তি হয়। সমাজের আর দশটা মানুষের থেকে একটু ভিন্ন হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো। সাধারণ মানুষগুলো যেমন তাদের আড়চোখে দেখে, তেমনি মেলে না সম্মানও। সামাজিক কোনো আচার-অনুষ্ঠানেও সবাই তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় খুব সহজেই। তবে সেই সম্মানহীন মানুষগুলোকেই একটু ভালোবেসে সবকিছুর সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেছে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা রি-থিংক। তারই অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হলো হিজড়াদের জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’। ৩০ সেপ্টেম্বর, রবিবার রি-থিংকের নিজস্ব কার্যালয় রাজধানীর গ্রিন রোডের ‘বিন্দুধারী’তে অনুষ্ঠিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এ আয়োজনে বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা নিয়ে হাজির হন ভারতীয় শিল্পীরা।
এতে সরোদ পরিবেশন করেন অর্ণব ভট্টাচার্য এবং তবলায় পরিবেশন করেন নিলীমেশ চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয় হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোকে। রাজধানীতে হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়ন এবং সদাচারণ প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে সমাজ সেবা অধিদফতর এবং রি-থিংক যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একজন হিজড়া যে কাজে পারদর্শী বা আগ্রহী, তাকে সে কাজ শেখানো এবং তাদের সদাচারণ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য রি-থিংক আয়োজন করে এ অনুষ্ঠানের, যেন হিজড়া জনগোষ্ঠী কিছুটা হলেও এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুদ্ধ সঙ্গীত সম্পর্কে জানতে পারে।

সরোদে রাগ চারুকেষীতে বিলম্বিত, দ্রুত ও তিন তাল দিয়ে শুরু হয় এর আয়োজন। এরপর নিলীমেশ চক্রবর্তী এবং অর্ণব ভট্টাচার্য তবলা ও সরোদের যুগলবন্দিতে পরিবেশন করেন রাগ মারুবেহাগ, রাগেশ্রী, যোগ এবং গোরক কল্যাণ। আয়োজন সম্পর্কে শিল্পীদের নিবেদনের মাঝে মাঝে কথা বলেন হিজড়া জনগোষ্ঠির বিভিন্ন জনগণ।
এ সময় তারা জানান, এই আয়োজন তাদের সত্যিকার ভাবেই অনুপ্রাণিত করেছে। অন্য জায়গায় কোনো আয়োজনে গেলে যেমনটা সবাই সরে যায় বা তাদের তাড়িয়ে দেয়, সেখানে শুধু তাদের জন্য এ আয়োজন সত্যিই অনেক ভালোলাগার। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন রি-থিংকের পরিচালক লুলু-আল-মারজান।

হিজড়া শব্দটি উর্দু হলেও উৎপত্তিগত ভাবে সিমেটিক এরাবীয়। ‘হিজর’ বা যাকে আমরা হিজরত বলি সেটা থেকেই হিজড়া শব্দের উৎপত্তি। এই হিজর এর অর্থ নিজ গোত্র ত্যাগকারী। পরিবার এদের তাড়িয়ে দেয় বলে এদের হিজড়া বলা হয়। ইংরেজিতে ইউনাচ( Eunuch) বা হারমার্ফোডিথ ( Hermaphrodite) বলে একে। এদের ভারতের বিভিন্ন স্থানে আরাভানি, আরুভানি, জাগাপ্পা ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। তামিল ভাষায় থিরুনাংগি বা চাহাক্কা বলা হয়। উপমহাদেশে এদের স্বীকৃতি বহু বছর না থাকায় এরা মূলত দেহব্যাবসার কাজে জড়িত থাকত গোপনে। তাছাড়া ভিক্ষা, ছিনতাই ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকতে হয় তাদের ইনকামের জন্য। হিজড়াদের যৌনসঙ্গীকে ‘কথি’ বলা হয়। এই কথিরা সমকামী হয়। বাংলাদেশে এই কথিদের ‘পন্থি’ বলে ডাকা হয়। দিল্লীতে বলে ‘গিরিয়া’ কোচিনে বলে ‘শ্রিধর’ নেপালে বলে ‘মাতি’ পাকিস্তানে বলে ‘জেনানা’। প্রাচীন ভারতের বাৎস্যায়নয়ের
লেখা বিখ্যাত ‘কামসূত্র’ বইতে এই হিজড়াদের ‘তৃতীয়া প্রকৃতি’ বলে সম্বোধন করা আছে। তৎকালীন রাজারাজড়াগণ হিজড়াদের অন্দরমহলে প্রহরী হিসেবে রাখত। হিজড়াদের একটা আলাদা ভাষা আছে হিজড়া ফারসি নামে। ১৮৭১ সালে বৃটিশরা এদের ‘অপরাধী সম্প্রদায়’ বলে আইন করার পর থেকে এদের দুর্ভোগ শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে উপমহাদেশের দেশগুলো এদের জাতীয় স্বীকৃতি দেয়া শুরু করলো। পাকিস্তান আর ভারত ২০১৩তে এদের নাগরিক বলে স্বীকৃতি দেয়। ভারত নিজেদের পাসপোর্টে এদের জন্য আলাদা কাগজ লাগিয়েছে। পাকিস্তানে এরা রাজনীতিতেও অংশ নিচ্ছে। ২০১৩তে পাকিস্তানের নির্বাচনে সানাম ফকির নামক এক ৩২ বছর বয়স্ক হিজড়া স্বতন্ত্র্য প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ায়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এদের সম্পুর্ন নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দিয়ে আইন জারি করে। এদের তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক হিসেবে ভোটার তালিকা করার অধিকার দেয়া হয়। শিক্ষায় এদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এদের নিয়ে বহু নাটক সিনেমা বই লেখা আছে। বিভিন্ন ধর্মে এদের নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত আছে। সবার উপরে এরাও আমাদের মত মানুষ। শুধু মনটাই বিধাতা একটু ভিন্ন করে দিয়েছেন। এছাড়া  আবেগ অনুভূতি হাসি কান্না আনন্দ বেদনা সব আমাদের মতই। এদেরকে নিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা মানে ভালো একটা বিষয়। যারা এর আয়োজক সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। – মোশারফ হোসেন মুন্না

ছবি – সংগ্রহ

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: