Press "Enter" to skip to content

আমার নামটির জন্যেই আমি হয়ে গেলাম, ওপারের বাংলার লোক! – প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়…

– কবি ও সাহিত্যিক রহমান ফাহমিদা।
এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ বাস করেন যারা কিনা নিরবে নিভৃতে আজীবন তাঁদের কাজ করে যান! সৃষ্টি করেন এমন কিছু কাজ, যে কাজগুলো সারা পৃথিবীতে সুবাস ছড়িয়ে যায়। দেখা যায় তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকেই এই ভুবনে দাপটের সাথে তাঁদের কাজ করে যাচ্ছেন অথচ তাঁরা জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও বেশীরভাগ সময় প্রচার বিমুখ থাকেন। নিজেকে প্রকাশ করার ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে এক প্রকার অনীহা কাজ করে। এর পেছনে কারণ হল, অনেক সময় কোনো একটা দুঃখ বা ক্ষোভ তাঁরা নিজেদের ভেতর বহন করে চলেন। শ্রদ্ধেয় দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এমনি একজন মানুষ, যে কিনা একাধারে জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার এবং তবলাবাদক। তাঁর ব্যক্তিগত ঝুলিতে আছে অসংখ্য সুপার ডুপার হিট গান। এখনো পর্যন্ত সকলের মুখে মুখে ফেরে মতিউর রহমান পান্নু পরিচালিত এবং দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘মনের মাঝে তুমি’ ছবির সেই গান ‘মি ও প্রেমি’ এবং ‘আকাশে বাতাসে’ যে গানগুলি গেয়েছিলেন ওপার বাংলার শিল্পী উদিত নারায়ণ ও সাধনা সারগাম। সেই গানগুলি এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রায় ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির
সাথে যুক্ত আছেন। এপার বাংলা ও ওপার বাংলার জনপ্রিয় শিল্পীগণ তাঁর সাথে কাজ করেছেন। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে রহমান ফাহমিদার সঙ্গে সঙ্গীত পরিচালক দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের আলাপচারিতায়, সে তাঁর জীবনের অনেক জানা অজানা তথ্য শেয়ার করেছেন। সেই সকল দুর্লভ তথ্যগুলো আলাপচারিতার মাধ্যমে তুলে ধরা হল, সঙ্গীতাঙ্গনের পাঠকদের জন্যে –
– আপনি তো একজন জনপ্রিয় তবলাবাদক! পরবর্তীতে সঙ্গীত জগতে একজন প্রতিভাবান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পদার্পণ করেছেন, এটা কি করে সম্ভব হল ?
– মূলত আমি একজন মিউজিশিয়ান। একসময় আমি তবলা বা ঢোলক প্লেয়ার ছিলাম। যাকে রিদম প্লেয়ার বলা যায়। একসময় অনেক রিদম কম্পোজ করেছি। প্রচুর গান আছে আমার রিদম কম্পোজিশন করে দেয়া। সুপার ডুপার হিট গান আছে। এমনও সময় গেছে যখন মিউজিশিয়ানরা বসে থাকতো আমার জন্য। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সত্য সাহার মত অনেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। আমি স্টুডিওতে না যাওয়া পর্যন্ত গান বন্ধ থাকত। আমি যদি বলতাম আজকে আমি পারবোনা তখন ওনাদের গান ক্যানসেল হয়ে যেত, এরকম আমার একসময় গেছে। মিউজিক ডিরেক্টর হয়েছি অনেক পরে। মিউজিক ডিরেক্টর হওয়ার ব্যাপার যেটা সেটা হল, আমিতো রিদমের ওপর কাজ করেছি দীর্ঘদিন। এক সময় চিন্তা করলাম আমার দ্বারা মিউজিক করা সম্ভব! কারণ আমি যে রিদম কম্পোজিশন করি তার ওপর ভিত্তি করে মিউজিক ডিরেক্টরা গানের সুর দেন এবং সেই গানের সুরের সাথে পরে মিউজিক কম্পোজিশন করেন। সেই মিউজিক কম্পোজিশন আমারি রিদমের ওপর ভিত্তি করে বছরের পর বছর তাঁরা করে এসেছেন। তাই আমি দেখলাম এটা আমার পক্ষেও করা সম্ভব কারণ আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিল এইভাবে এইভাবে মিউজিক করা যায়। গানে সুর যে কোনো মানুষই চেস্টা করলে করতে পারে কারণ প্রতিটি মানুষের মনেই সুর দোলা দেয়। কারোটা হয়তো ভালো হবে কারোটা হয়তো হবেনা। তাই গানের সুর করাটা কঠিন কোনো ব্যাপার না! তবে হ্যাঁ সুরটা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কিনা এটা একটা বিষয়! কারণ গানের বাণী যদি ভালো হয় তাহলে সুরটাও নিঃসন্দেহে ভালো হবে। শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য, গানের কিছু ধারাবাহিকতা আছে তা ঠিক রাখলেই হয়ে যায়। আমি সেই ধারাবাহিকতা মেনেই এই সঙ্গীত পরিচালনায় চলে এসেছি।

– যদি জানাতেন এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার কোন্ কোন্ শিল্পী আপনার গান করেছেন ?
– আগে যারা ছিলেন এবং এখন যারা আছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, মোটামুটি সবাই আমার সাথে কাজ করেছেন। আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, সৈয়দ আব্দুল হাদী, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর, কনক চাঁপা। সুবীর নন্দী আর কনক চাঁপার গান ‘ছোট্ট একটি ভালবাসা’ ছবির গান তো সুপার ডুপার হিট হয়েছিল। তাছাড়া আমার জীবনের প্রথম ফিল্মের কাজ ‘সবাই তো সুখি হতে চায়’ ছবির গানগুলো ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ওপার বাংলার অনেক শিল্পীর সাথে কাজ করেছি তাঁদের মধ্যে যেমন – আশা ভোঁসলে, কুমার সানু, অভিজিৎ ভট্টাচার্য, অনুরাধা পাড়োয়াল, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, বাবুল সুপ্রিয়, সান, সাধনাসারগম, সনু নিগম, প্রিয়া ভট্টাচার্য, সবাই আমার গান করেছেন। সনু নিগমের ১৮টি গান করেছি। তাঁর একটি এ্যালবামের নাম ‘তোমার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচবো’ ইউটিউবে আছে এ্যালবামটি। তাছাড়া কোলকাতা থেকে একটি মিউজিক চ্যানেল যার নাম এঞ্জেল ডিজিটাল মিউজিক তাঁরা আমার ১২টি গান ছেড়েছে ইউটিউবে আমার সাথে কোনো যোগাযোগ না করে। গীতিকার মুন্সি ওয়াদুদু এর লেখা আর আমার সুর করা গান সেগুলি। ছবির নাম ‘আমার ভাই আমার বোন’ অন্যটি ‘সবার ওপরে তুমি’। আমি ওদেরকে প্রটেস্ট করতে গিয়েছিলাম কিন্তু একা একা কিছু করা যায় না।
– আজকাল তো সবাই নিজেকে প্রচার করার জন্য ব্যস্ত থাকেন কারণ অনেক চ্যানেল অনেক খবরের কাগজ তাছাড়া প্রযুক্তির কারণে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমও বেড়ে গেছে অথচ এত জনপ্রিয় শিল্পী আপনার সাথে কাজ করেছেন এবং আপনার এত সুপার ডুপার হিট গান থাকা সত্বেও আপনি কেন প্রচার বিমুখ ? আপনি কি কোনো কারণে অভিমান করে দূরে সরে আছেন এই জায়গা থেকে ?
– আমাকে ৭/৮ বছর আগে একটি চ্যানেল থেকে ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য ডেকেছিল। আমি তাঁদের বলেছিলাম, আমার লাভ কি ইন্টারভিউ দিয়ে! আমার কি বেনিফিট্ হবে? আমাকে বোঝান। আপনি আপনার প্রোগ্রাম চালাবেন আধাঘন্টা ধরে, এ্যাড পাবেন। আমার বেলায় কি হবে, শুধু যাতায়াত ভাড়া! সরি, এই ইন্টারভিউ দেয়ার মধ্যে আমি নাই। আমার কথা হল, আমি আমার কাজ আর সময় নষ্ট করে আপনার চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিতে যাব তারপর আপনি একজনকে দিয়ে আমার সাক্ষাৎকার নিবেন আপনার বেনিফিট হবে, আমার তো কোনো লাভ হবেনা! আপনি হয় তো বলবেন, আমার পরিচিতি বাড়বে এটাই আমার লাভ। আমার তা দরকার নাই কারণ আমাকে যারা চেনার তাঁরা ঠিকই চেনে আর যারা চেনেনা! তাঁরা কোনোদিনও চিনবেনা। এটা তো গেল প্রচারের ব্যাপার। এবার আসি আমি কেন দূরে সরে আছি ? আমি ১৯৭৭ থেকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত আছি। আজকে ২০১৯ সাল প্রায় ৫০বছর কিন্তু আমাকে সাংবাদিকরা কেউ কেউ বলেন, দাদা, ওপার বাংলা থেকে কবে আসছেন আবার কবে যাবেন ? তাঁরা মনে করেন দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় মানেই ওপার বাংলার মানুষ। দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এই নামটাই আমার জন্য অভিমান! এই নামটির জন্যই আমি হয়ে গেলাম ওপার বাংলার লোক! নাম বললেই মনে করে আমি ওপার বাংলা থেকে এসেছি। আমি তো ওপার বাংলার লোক না। এক সময় আমি কবরী সারোয়ারের হাসবেন্ড বাবু সারোয়ারকে বলেছিলাম, দাদারে আমি নাম বললেই সবাই আমাকে বলে আমি ওপার বাংলা থেকে আসছি! আমার চৌদ্দ পুরুষ এখানে কাটিয়ে দিল, আমি এত বছর ধরে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আছি, এমন কেউ নাই যে, আমাকে চিনে না! অথচ সাংবাদিকরা এসে বলে, আপনি কবে আসছেন কবে যাবেন। এটা আমার জন্য প্রচণ্ড দুঃখের ব্যাপার। আমার একটা নিকনেম বা ডাকনাম আছে দেবু। একজনের দুটো নাম থাকাও সমস্যা। দেবু ভট্টাচার্য নামে একজন বিখ্যাত সুরকার আছেন যে আমার গুরুজির সমতুল্য লোক। এই উপমহাদেশে তাঁর মত এত বড় সুরকার খুব কমই আছে। সেই মেহেদি হাসানের জন্ম হয়েছে যার হাতের ওপর দিয়ে। রুনা লায়লার কথা যদি বলি, রুনা লায়লার প্রথম জীবনের যে বাংলা গান-নোটন নোটন পায়রা, আমি নদীর মত শত পথ ধরে -এসব গানগুলির সুর দেবু ভট্টাচার্যের করা। সুতরাং আমি ঐ নামও ইউজ করতে চাইনা। যেহেতু দেবু ভট্টাচার্য একজন বিখ্যাত লোক।
আমি আমার পুরা নাম যেটা বাপ দাদা দিয়েছিল দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়! ওটাই ব্যাবহার করে হয়ে গেলাম ওপার বাংলার লোক। এটাই আমার বড় দুঃখ, বড় ক্ষোভ। দেবেন্দ্রনাথ যে এদেশের লোক! তা আমাকে কেন বলতে হবে ?
আমি ওপার বাংলার লোক কথাটি এমনভাবে প্রচার হয়েছে যে ইন্ডাস্ট্রির সবাই জানেন দেবেন্দ্রনাথ একজন সুরকার তবে সে এদেশের লোক না ফলে আমার প্রফেশনের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমার আজকে যেখানে থাকার কথা ছিল বা অনেক কাজ করার কথা ছিল তা হয়নি। তবে অনেক কাজ করার চেয়ে কয়েকটি ভালো কাজ করা ভালো, তাইই আমি করছি।

– যেহেতু আপনার নাম শুনে অনেকে ওপার বাংলার লোক মনে করে, আপনি যে আমাদেরই লোক এবং আমাদের সঙ্গীত জগতের গর্ব! তাঁরা তা জানেনা। সেটা তাঁদের দুর্ভাগ্য! আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। আপনার পৈত্রিক নিবাস কোথায় ? আপনার এই সঙ্গীত জগতে আসার পেছনের গল্প যদি বলতেন।
– আমার পৈত্রিক নিবাস বা আদিনিবাস খুলনা জেলার দৌলতপুর থানার আন্ডারে মহেশ্বরপাশা গ্রামে। সঙ্গীত জগতে আসার পেছনের গল্পটি হল, আমার বয়স তখন ১২বছর হবে। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। তখন থেকেই আমার তবলার হাতেখড়ি। আমার বাবা দীননাথ চট্টোপাধ্যায় গান বাজনা করতেন বললে ভুল হবে কারণ সেটা ছিল গন গান বাজনা। তবে তিনি নাটকও করতেন। গ্রামে যাত্রাপালা হলে তিনি নিজে তার ব্যবস্হা করতেন। যাত্রাপালার জনপ্রিয় নায়ক বা পরিচালক অমলেন্দু বিশ্বাসকে আমাদের বাড়িতে থাকতেও দেখেছি। তখন এক ভদ্রলোকের নাম ছিল সন্তোষ ঘোষ উনি খুব সুন্দর তবলা বাজাতে পারতেন। মানুষ গান ছেড়ে তাঁর তবলা বাজানো শুনতে যেত। আমিও তাঁর তবলা বাজানো শুনে মুগ্ধ হই। সন্তোষ ঘোষ পরে খুলনা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং মান্নান মেহেদী নামে গান করে ঐসময় খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেন। পাকিস্থান আমল থেকেই ওনার জনপ্রিয়তা ছিল। ওনাকে দেখেই আমি তবলা বাজাতে আগ্রহী হই। আমি তখন স্কুলে পড়ি। ক্লাসে মাস্টার আসতে দেরী হল আর তখন কেউ হয়তো গান ধরল! আমি তখন তার সাথে টেবিল চাপড়াতাম। আমাদের স্কুলে কিছুদিন পর মাস্টার ইউসুফ নামে একটি নতুন ছেলে আসে। সে গানবাজনা খুব ভালো জানতো। সে আমার টেবিল চাপড়ানো দেখে একদিন এসে বল্ল, তোমার তো তালটাল ঠিকই হয়। তুমি কি তবলা বাজাতে পারবা ? আমি বললাম দেখায়ে দিলে পারবো। প্রথমে তাঁর কাছেই আমার তবলার হাতেখড়ি। পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ সাদত্বকির কাছে আমার তবলার গ্রামার শেখা। উনি একদিন বল্লেন, তুমি এত সুন্দর বাজাতে পারো তো প্রপার ওয়েতে শিখো, কাজে দিবে। তখন ওনার কাছ থেকেই তালিম নিতে শুরু করলাম। তাঁর কাছে শিখতে শিখতে আমি খুলনা রেডিওতে ঢুকে গেছি। খুলনা রেডিওতে চাকরী করার সময়, খুলনার এক বড়ভাই এবং বন্ধুও বটে! সে এসে বল্ল, খুলনা রেডিওতে বসে তবলা বাজিয়ে কি করবা ? তবলা বাজাইতে হইলে ঢাকায় চল। এই আমার ঢাকায় আসা। ঢাকায় এসে আমি প্রথমেই দেবু ভট্টচার্যের কাছেই আসি। ওনার কাছে এসেই আমি এক সপ্তাহের মধ্যে সিনেমার গানের সাথে বাজাতে শুরু করি। আমি সর্ব প্রথম গাফফার চৌধুরী পরিচালিত ছবি ‘দিওয়ানা’ সিনেমার গানের সাথে প্রথম তবলা বাজাতে শুরু করি। তখন থেকেই শুরু। একদিন দেবু ভট্টচার্য আমাকে বললেন, তোমাকে প্রচুর প্র্যাকটিস করে নিজেকে তৈরি করতে হবে। কারণ এখানে যারা বাজায় তারা অনেক ভালো বাজায়। তাঁদের সাথে পাল্লা দিতে হবে তোমাকে। আমি তাঁর কথা শোনার পর আর পিছু হাটিনি। আমিও পাল্লা দিয়ে তাঁদের সাথে একটা পর্যায়ে চলে আসি। আমি তো আগেই আপনাকে বলেছি যে, অনেক সুরকার বসে থাকতেন আমার জন্যে।
– আপনি কি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছিলেন ?
– না না না, সঙ্গীতের বা গানের যে আমার গুরু সে হলো আমার স্ত্রীর ছোট ভাই কল্যাণ বাড়ৈ। সে নামকরা সঙ্গীত শিক্ষক ছিল। বিশেষ করে খ্রীষ্টান সমাজে কল্যাণ বাড়ৈ বললে সবাই চিনবে। ক্লাসিক্যালের ওপর তাঁর প্রচণ্ড দক্ষতা ছিল। আমি যখন আস্তে আস্তে সুর করা শুরু করলাম তখন উনি আমাকে বলতেন, এটা শিখেন ওটা শিখেন, এই রাগটা শিখেন ঐ রাগটা শিখেন। গ্রামাটিক্যালি যেগুলো শেখার প্রয়োজন ছিল সেগুলো আমি শেখা শুরু করলাম এবং রাগরাগিণী থেকে শুরু করে সব আয়ত্ত করেই অন্যান্য কাজগুলো করতে পেরেছি আর কি!

– সেই তখন থেকেই আপনি গানের জগতে! কখনো কি আপনার ইচ্ছে হয়নি, আপনি গান গাবেন, গায়ক হবেন, এমনকিছু!
– হা হা হা,গান করা! এক সময় গান করেছি। এক সময় আমাদের দেশে যে পপ গানের প্রচলন ছিল, আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহেদ তাঁরা যে গান গাইতো, আমি যতদিন খুলনায় ছিলাম আমার মনে হয়না তাঁদের ডাকা লেগেছে। তখন খুলনায় ডিসি ছিলেন মোফাজ্জল করিম সাহেব এবং এসপি ছিলেন মাহবুব নামের একজন। তাঁরা এবং তাদের স্ত্রী ভাবীরা আমার গান খুব পছন্দ করতেন আর বলতেন যত বড় শিল্পীই আসুকনা কেন, দেবুকে গান গাইতে হবে। তখন ঢাকার বড় বড় শিল্পীদের সাথে আমাকেও গান গাইতে হতো। আমাকে তাঁরা এভাবে অনেক সম্মান দিয়েছেন। ডিসির ওয়াইফ আমাকে বলেছিলেন, তুমি গান কর, তবলা বাজাও, ফুটবল খেলো সবকিছু তো একসাথে হবেনা! যে কোনো একটা কিছু কর। তখন আমি তবলাটাকে বেছে নেই। পরে ঢাকায় আসার পর নিজেকে তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম তখন গানের দিকে না ঝুঁকে মিউজিকের ওপর ইনভলব হয়ে গেলাম। মিউজিকেই বেশী সময় দিতে থাকলাম। তারপরে আর কখনই শখ হয়নি নিজে গান করি।
– আপনার তো অনেক হিট গান আছে যেগুলো বেশিরভাগই ‘৭০,’৮০,’৯০ দশকের গান। তখনকার গান আর এখনকার গানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন ?
– এখন তো গানের কথা হালকা। গানের সুরগুলো চটকদারি হয়। মনে করেন, আগের ব্যান্ডগুলোর মধ্যে মাইলস অনেক পুরনো ব্যান্ড যারা কিনা এখনো টিকে আছে। অনেক ব্যান্ড ছিল সবাই তো টিকেনি। ফিডব্যাক ছিল। তাঁরা অবশ্য গান করছে। মাইলস, ফিডব্যাক তাঁদের মত তো নতুন কেউ আসেনি! তবে ইনডিভিজুয়্যালী আইয়ুব বাচ্চু এসেছিল, জেমস এসেছে, তাঁদের গানে যতটুকু গভীরতা ছিল তা এখনকার গানে নেই। তাঁরা গানের কথা, গানের সুর নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই সচেতন ছিল। যার জন্য ওদেরকে মানুষ গ্রহণ করেছে। আর এখন কই ? আজ আছে তো কাল নেই। এখন অনেক গান হচ্ছে তবে তা পণ্য হয়ে গেছে। আগে গানের মধ্যে একটা আর্ট ছিল। সেই গান মানুষের হৃদয়কে আকৃষ্ট করতো। এখন গান শোনার চেয়ে দেখার বিষয় হয়েছে সেই সাথে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। কারণ একটা নতুন গান আসতে না আসতেই আরেকটি গান চলে আসে ফলে আগের গানটি হারিয়ে যায়, মানুষ নতুন গানটির ওপর ঝুঁকে পড়ে। আজকাল তো শিল্পীরা সুরকার,গীতিকারের নামটিও বলেনা। খুবই দুঃখজনক!
– আপনার ছেলে অমিত চ্যাটার্জী তো এই গানের জগতে আছেন এবং একজন ভালো সুরকার এবং মিউজিক ডিরেক্টর। আপনার কি পরিকল্পনা ছিল সে এই গানের জগতে আসুক অথবা অন্য কিছু করুক ?
– না না, আমি কখনোই চাইনি ও গানবাজনা করুক। ও তো পড়াশুনা করে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। ও যে কেন চাকরিবাকরির দিকে ঝুঁকলো না! তা বলতে পারবোনা। তবে ও ছোট থাকতেই আমার মত টেবিল চাপড়াতো। তারপর ওকে একটা গীটার কিনে দিলাম। ও সারাদিনই ঝমঝম শব্দ করে সেই গীটার বাজাতো। কত তার যে ছিঁড়েছে। তবে ওর ভেতরে মিউজিকের কিছু একটা ছিল! আমি দেখতাম ও সারাদিন মিউজিক নিয়েই আছে, গীটার বাজায় আবার গানও গায়! তখন আমি ওকে গুরু ধরিয়ে দিলাম প্রপার ওয়েতে গান শিখবে তাই। বেশ কিছুদিন শিখেওছিল। কিছু কিছু রাগরাগিণী মোটামুটি রপ্তও করেছিল। এখন আমাকে খুব বকাবকি করে, তুমি আমাকে কেন গুরু ধরায়ে দিছিলা, সেই গুরুর কাছে গান শিখে আমার লস হয়ে গেছে কারণ আমি এখন মোটামুটি জানি কোনটা সঠিক কোনটা ভুল! এখন আমার সমস্যা হয়ে গেছে, আমি না পারি তোমাদের দিকে যেতে, না পারি আজকাল যে কাজ হয় তার সাথে থাকতে। কারণ তোমাদের দিকে গেলে কেউ আমাকে ডাকবেনা আবার আমি এদিকেও থাকতে পারছিনা কারণ আমার বিবেকে বাঁধে। সে আসলে দোটানায় পড়ে গেছে।
– আপনি কি আপনার ছেলের সাথে কোনো কাজ করেছেন ?
– হ্যাঁ, এখন তো আমার ম্যাক্সিমাম গানের মিউজিক ও করে দেয়। সম্প্রতি আমার সুরে আর ওর মিউজিক কম্পোজিশনে শশী জাফরের একটি গান রিলিজ হয়েছে। তবে ওর কাজের সময় আমাকে স্টুডিওতে যেতে বারণ করে। আমাকে বলে, তুমি আসবানা, তুমি আসলে মিউজিকে ঝামেলা কর। তোমাদের কাজ এখন চলেনা, আমাকে আমার মত করতে দেও। হা হা হা। আমি এখন অনেক কম্প্রোমাইজ করি। ওর কাছে সুর করে ছেড়ে দেই, বাকী সব ও নিজেই করে। এখন দেখি ওর কাজ ভালোই লাগে। বাপবেটার দুইজনের মেলবন্ধন ভালোই হয়, ভালোই লাগে সবকিছু।
– আপনি কি সম্প্রতি কোনো নতুন কাজ করেছেন ?
– আমি সম্প্রতি বাংলাদেশ রেডিওর জন্য একটি দেশের গান করেছি। গানটি চম্পা বনিক গেয়েছেন। গানটি শুনে সাবিনা ইয়াসমিন বলেছেন আমাকে, গানটি খুব সুন্দর হয়েছে। আমি তখন তাঁকে বল্লাম,আমি তো আপনাকে দিয়ে গানটি গাওয়াতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি বললেন আপনার গলা খারাপ আছে আর এদিকে আমার হাতেও সময় ছিলনা তাই গানটির কাজ করে ফেললাম। গানটি ভালো হয়েছে। আশা করছি গানটি জনপ্রিয়তা পাবে।
– আপনার সাথে কথা বলে অনেক ভালো লাগলো। সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে আমি রহমান ফাহমিদা আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি সেই সাথে আমাদের আরও নতুন নতুন গান উপহার দিবেন এই আশা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, শুভকামনা রইল।
– সঙ্গীতাঙ্গন ও আপনার জন্যেও রইল অনেক অনেক শুভকামনা।

More from গীতবাদ্যকর - (যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী)More posts in গীতবাদ্যকর - (যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী) »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *