Press "Enter" to skip to content

ভিডিও কখনো কোনো গানের স্থায়িত্ব হতেই পারেনা – জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নী…

– কবি ও কথাসাহিত্যিক রহমান ফাহমিদা।
জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নী, যে কিনা তাঁর সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে দেশ-বিদেশে তাঁর ভক্ত শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। প্রতিবছরই তাঁকে বিভিন্ন দেশে গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ফলে সেইসব দেশে ভক্তদের ভালোবাসার টানে ছুটে যান তিনি। তাছাড়া দেশেও তিনি বছরের পুরোটা সময় গান নিয়ে কর্মব্যস্ত থাকেন অনেক বেশী। কখনো কখনো নিজের গান নিয়ে রেডিও, টিভি এবং ফিল্মের গানে ব্যস্ত থাকেন। আবার কখনো কখনো অন্যদের গানের উপস্থাপনা করেন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে। তাঁর এই ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সঙ্গীতাঙ্গনকে সময় দিয়েছেন গান নিয়ে কথা বলার জন্য, সেই কারণে সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে প্রথমেই জানাই তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। গান নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সঙ্গীতাঙ্গনের সাথে কথা বলেন, –
– প্রথমেই জানতে চাচ্ছি আপনার গানের শুরুটা এবং সঙ্গীতজগতে পদার্পণ করেছেন কবে থেকে ?
– যখন আমার পাঁচ বছর বয়স তখন থেকেই আমার গান গাওয়া শুরু। আমি যখন ক্লাস থ্রীতে পড়ি তখন আমার বয়স আট/নয় বছর, সেই প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেলাম। বলতে পারেন সেই বয়স থেকেই আমার সঙ্গীতজগতে পদার্পণ এবং আমার পুরস্কারের প্রাপ্তি শুরু। তারপর গানের জন্য মোট পাঁচবার জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলাম। তারপর আমি ১৯৯৬-তে রেডিও টিভিতে এনলিস্টেড হই। আমার বিয়ের পরবর্তী সময় ১৯৯৭ থেকে আমি প্রফেশনালই গান গাইতে শুরু করি।
– আপনি যেহেতু ১৯৯৭ সাল থেকে গানের সাথে জড়িত আছেন! সেহেতু বলবেন কি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৯-এর গানগুলোর মধ্যে যে পার্থক্য তা আপনি কিভাবে দেখছেন ?
– আমি পার্থক্য দেখি এভাবে যে, এখনকার গানের উপস্থাপনা আর আমাদের সেই সময়ে গানের উপস্থাপনা ভিন্ন। আগে ছিল ক্যাসেটের যুগ আর এখন ইউটিউবের। আগে যেমন একটা গান রিলিজ হলে মগবাজার মোড় আমাকে জানিয়ে দিত কারণ মগবাজার মোড়ে যে ক্যাসেটের দোকানগুলো ছিল তারা সারাক্ষণ সেই গানটা বাজাতো। কোন্ গানটা হিট তখন ঐ অডিওর দোকান এবং রেডিও থেকে শুনেই জেনে যেতাম। কেননা তখন সেই গানগুলি মানুষের মুখে মুখে থাকত। আর এখন অবশ্য তা জানার উপায় নেই! কারণ এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল এবং মোবাইলের মধ্যেই যে যার পচ্ছন্দমত গান শুনছে। আর ইউটিউবের ভিউয়ার্স দেখে হয়তো আমরা কাউন্ট করি, কোন্ গানটি হিট! বুস্ট পোস্ট দিয়ে ভিউয়ার্স বাড়াচ্ছে, কে শুনলো বা না শুনলো তাতে কিছু এসে যায়না।
– ইউটিউবে বুস্টপোষ্ট দিয়ে এত লাখ লাখ ভিউয়ার্স হচ্ছে তারপরেও কেন আগের গানগুলোর মত এখনকার গানগুলো মানুষের মনে সেভাবে দাগ কাটছেনা! সেই ব্যাপারে আপনি কি বলবেন ?
– এটার কারণ হল কি! তখন যে একটা গান হত, আসলে সেই গানটা সৃষ্টি করার সময় যে পরিবেশটা ছিল, সেই পরিবেশটা খুব যত্নের ছিল। এমনও গান আছে যে গানটা ৮/৯ ঘণ্টায় রেকর্ড হয়েছে। একটি গানের জন্য একদিন দুইদিন সিটিং হয়েছে। একটি গান এভাবে রেকর্ড হত শিল্পী গিয়ে বসতেন, সুরকার গান বুঝিয়ে দিতেন এবং গানের যে সিকোয়েন্স! সেই অনুযায়ী শিল্পীকে গাইতে হতো। একটা গান বহুবার রেকর্ড করা হত যতক্ষণ মনের মত না হত। একটা টিমওয়ার্ক ছিল আর এখন এটা সলোওয়ার্ক হয়ে গেছে। এখন আর সেই টিমওয়ার্ক নেই! এখন শুধু হুজ হুজ!হিজ হিজ। একটা স্টুডিওতে একটা কম্পিউটারে গান রেকর্ডিং হয়। এটার সাথে ইনভলবমেন্ট খুব কম মানুষের। এখন দেখা যায় যে, যে গানটি লিখছে, সেইই সুর করছে আবার সে নিজেই গাইছে। তার সাথে তো কেউ নেই! টিমওয়ার্ক কি করে হবে ? গানটি যখন একজন মানুষ বানাচ্ছে তখন তো তাঁর চারপাশে কেউ নেই বলার মত, গানটি ভাল হচ্ছে না মন্দ হচ্ছে। গানটির প্রতি কমেন্ট করে যে গানটি উন্নতমানের করবে, সেই জায়গাটিতে আমরা অনেকেই একা। যার কারণে গানটি এগিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে আবার পন্থাটি হচ্ছে ভিন্ন। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনেই কিছু মানুষ আছে, যারা কিনা গানের ভিউয়ার্স বাড়ানোর জন্য বুস্টপোস্ট করে থাকে। আমি মনে করি সেই মানুষগুলোর জন্য আমাদের এই জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গান যদি ভাল হয় সেজন্য বুস্ট পোষ্ট করার কোনো প্রয়োজন হয়না। একজন পথের ফকিরের গান আপনার কানে পৌঁছে যাবে যদি তার গায়কী, সুর আর কথা ভাল হয়! সেই জন্য ভিউয়ার্সের কোনো দরকার হয়না। আমার কথা হল, গানটা কতটা সুন্দর! সেটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য একজন শিল্পী, সুরকার আর গীতিকারের দায়িত্ব অনেক বেশী। সেই জায়গাটা অবহেলা করলে গানগুলি শ্রোতাদের মনে পৌঁছাবেনা এবং আকৃষ্ট করবেনা।
– তাহলে আপনার কি মনে হয় আপু, শিল্পী, সুরকার এবং গীতিকারের সমন্বয়টা প্রয়োজন ?
– হ্যাঁ,সমন্বয়টা আরও বেশী প্রয়োজন। যেটা আগে হত। এখনও হয়না যে, তা নয়! এখনও অনেক ভালো গান হচ্ছে অনেকের সমন্বয়ে। সেগুলি আমরা ভালোভাবে নিচ্ছি এবং সেই গানগুলি মানুষের কানে পৌঁছে যাচ্ছে। যেই গানগুলি একা একা করছে বা নিজেরা নিজেদেরে বুস্টপোস্ট প্রথাতে চলে যাচ্ছে, সেই গানগুলির ভিউয়ার্স বা নানান পন্থায় এগিয়ে যাচ্ছে হয়তো কিন্তু মানুষের কানে পৌঁছাতে পারছেনা এবং মানুষের মনকে আকৃষ্টও করতে পারছেনা! তফাৎটা এইখানেই,আপা।
– বর্তমান পৃথিবীর অস্থিরতার সাথে সাথে এসময়ের সঙ্গীত জগতেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আগে গানে যে ফিল পাওয়া যেত এখন কিন্তু তা সেভাবে পাওয়া যায়না এবং নতুন যারা আসছেন তারা ধুমধাড়াক্কা গান করে রীতিমত স্টার হয়ে যেতে চান! এই ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাইছি।
– অনেকাংশে হয়তো তাই হচ্ছে কিন্তু যারা এটা করছে আমি তাদের দোষ দিবনা এই কারণে যে, প্রত্যেক মানুষের স্বপ্ন থাকে আমি ক্লাশে প্রথম হব বা আমি আমার লাইমলাইটে আসব। লাইমলাইটটাকে সবাই ভালোবাসে। আমার কথা হল, আমরা আসলে তাঁকে কিভাবে রিসিভ করছি! সেটা হল বড় কথা। ধরেন, আপনার খাবারটেবিলে অনেক ধরনের খাবার আছে, আপনি কোনটা খাবেন, সেটা আপনার ওপর নির্ভর করে। তাই আমি বলবো যে, যেহেতু একটা স্বাধীন জায়গা আছে ইউটিউব। যে যা চায় ইউটিউবে ভিডিও, অডিও বা রেকর্ডিং করে দিয়ে দিতে পারে কিন্তু আপনি যদি সচেতন শ্রোতা হন তবে আপনি পারেন এই বাজে সময়টাকে থামিয়ে দিতে! আপনার লাইক, ডিসলাইক দিয়ে, আপনার রেস্পন্স দিয়ে। একজন ভালো শ্রোতা ছাড়া একটা সমাজে কখনোই ভাল সংস্কৃতি আসতে পারেনা। একজন খারাপ শিল্পী কখনোই একদিনে স্টার হয়ে চলে যেতে পারবেনা যদি না আমার ভাল শ্রোতারা সেটা রেস্পন্স বা ডিসরেস্পন্স না করে! তাই আমি বলবো একটি সংস্কৃতি অঙ্গন তখনি ভাল হবে যখন ভালো শ্রোতার রেস্পন্স পাওয়া যাবে। আমি একটি ক্লাসিক গান করি যদি সেই গানটি শোনার জন্য ১০০ জন মানুষ পাই তাহলে আমার মত ক্লাসিক গান করার জন্য আরেকজন মানুষ চেষ্টা করবে। সে যদি ক্লাসিক গান গাইতে না পারে তবে সে কখনোই চেস্টা করবেনা ক্লাসিক গান গাইতে। তাই আমাদের শ্রোতাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশী, যেকোনো খারাপ গানকে গ্রহণ না করা।
– আরেকটা ব্যাপার! আমরা আগে যে গানগুলি শুনতাম, সেই গানগুলির কথাগুলো উপলদ্ধি করতাম আর সুরটাকে মনের মধ্যে গেঁথে নিতাম কিন্তু এখন আপনার কি মনে হয়, গানগুলো শোনার চেয়ে দেখার বিষয় হয়ে যাচ্ছে বেশী ?
– হ্যাঁ,গানটি শোনার চেয়ে দেখার বিষয় হয়ে যাচ্ছে খুব বেশী। হয়তো মনের মধ্যে দৃশ্যটা রয়ে যাচ্ছে তবে গানটাকে অনুধাবন করার মত কোনো ফিল থাকছেনা, এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা হল আপনি খেয়াল করবেন, আগের গান যে আমরা শুনতাম তখন আমরা গানের ১২লাইনই মুখস্ত রাখতে পারতাম। এখন কিন্তু আমরা গানের দুলাইনও মনে রাখতে পারিনা। কারণ হল কথার মিল নাই, আমি, তুই, সে এরকম শব্দ। শব্দের মেলবন্ধন নাই। থাকে না! গান যে বানায় গানের সাথে গানের সংগতি, স্বপ্নের মত, বুননের মত সেরকম আজকাল আর নেই। যার কারণে ঐ গানগুলো আমরা মনে রাখতে পারিনা। আমার একটা কথাই আমি বলবো, আগের পরিবেশ হয়তো ফিরিয়ে আনা যাবেনা তবে যারা যত্ন নিয়ে করছে তাদের গানই কিন্তু আমরা গাই। এখনো ভাল গান হচ্ছে, হচ্ছেনা যে তা কিন্তু নয়! যারা যত্ন নিয়ে করছে তাঁদের গান রয়ে যাচ্ছে, হয়তো আমরা বুঝতে পারবো দশ বছর পরে, এখন না। আর যাদেরটা যত্ন নিয়ে করা হচ্ছেনা তাঁদেরটা আর থাকবেনা, ভিউয়ার্স যত কোটি হোক, লাভ নেই! আর দেখার বিষয়ে বলি, শ্রদ্ধেয় লতাজীকে আপনারা কয়টা মিউজিক ভিডিওতে পেয়েছেন! কিন্তু তাঁর গানতো আমাদের কান পর্যন্ত বেজে চলেছে। এমনকি এখনকার প্রজন্মও তাঁর গান শুনছে। তাই ভিডিও কখনো কোনো গানের স্থায়িত্ব হতেই পারেনা। আমি এটা বিশ্বাসই করিনা। এটা সাময়িক মানুষকে আনন্দ দিতে পারে কিন্তু গানের স্হায়িত্বের জায়গায় এটার কোনো অবদান নাই। আমি অনেক বিশেষ বিশেষ শিল্পীকে দেখি প্রতিমাসে দুতিনটি করে মিউজিক ভিডিও রিলিজ করছেন। আসলে আমি জানিনা এটাতে ওনারা কি শান্তি পান! তারচেয়ে বরং আমার মনে হয়, বছরে একটা গান আমি যদি করি এবং সেটা যদি সুপার হিট হয়, সেটার তৃপ্তি আমি অনেক বেশী পাবো।
– আপনার কি মনে হয়, যে আপনি এখনো আপনার মনের মত কোনো গান গাইতে পারেননি ? সেই কারণে আপনার মনে অতৃপ্তি রয়ে গেছে ?
– হ্যাঁ,আমার মনে হয়, আমার অনেক অতৃপ্তি রয়ে গেছে কারণ আমি আমার গানের এখনো সেরাটা দিতে পারিনি। অনেক গান গেয়েছি এবং অনেক গানই কেউ না কেউ ভালোবাসে। তবে আমি বলবো এখনো সেরকম তৃপ্তি পাইনি। আসলে বলেনা, যখন তৃপ্তি চলে আসে তখন আর তৃপ্তির আনন্দ থাকেনা! তাই আমার তৃপ্তি নেই। আমি এখনো একটি ভালো গানের অপেক্ষায় আছি।
– আপনার কি ভবিষ্যতে গান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে ?
– আমার ইচ্ছে ছিল কিন্তু আমি জানিনা কতটুকু করতে পারবো। আমার ইচ্ছে একটা গানের প্রতিষ্ঠান করব। সেখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের গান শেখাব, ট্রেইনয়াপ করব, গ্রুমিং দিব, বিভিন্নভাবে গাইড করব। জানিনা কতটুকু সম্ভব হবে তবে স্বপ্ন দেখি হয়তো কোনো একদিন করবো।
– ইনশাআল্লাহ্‌! আপনার স্বপ্ন সফল হোক, এই দোয়া করি।সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে আপনার জন্য শুভকামনা রইল।
– সঙ্গীতাঙ্গনের জন্যও শুভকামনা।

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *