বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় মেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী লিখেছেন বাবাকে নিয়ে…

কিংবদন্তী শিল্পী মাহমুদুন্নবী বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের খাতায় এক অবিনাশী স্বরলিপি, যার গান ১৯৬১ সাল থেকে বর্তমান তারুণ্য পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রোতার মুখে মুখে এক অনবদ্য প্রেরণা, ভালবাসা, ভালো লাগার এক দুর্বার অনুভূতি। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, বর্ধমান জেলার আসানসোল এ নানা বাড়িতে। এরপর বেড়ে ওঠা দাদার বাড়ী কেতু গ্রামে। দেশ বিভাগের পর বাবা বজলুল করিম এর চাকরির সুবাদে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে/বাংলাদশে। খুব ছোটবেলায় মাত্র ৭ বছর বয়সে মা’কে হারিয়েছেন গান পাগল এই মানুষটি। মা হারা ছেলেটি কিন্তু ছোটবেলায় গান শুনিয়ে সবার আদর খুঁজে নিতেন…। খেতে খুব পছন্দ করতেন…। ছোটবেলায় চকলেট, বাদাম খেতে ইচ্ছে হলে, গান শুনিয়ে দিলেই হতো…সব হাজির হয়ে যেতো…। আখের গুড়ের ফেনা খুব পছন্দ ছিলো! ছোটবেলায় খুব ডানপিটে আর দূরন্ত স্বভাবের ছিলেন। ঘুড়ি উড়ানো আর বল খেলা খুব প্রিয় ছিল। বাড়ি থেকে বই হাতে বেড়িয়ে সোজা মাঠে চলে যেতেন। এছাড়া পাড়ার কোন গাছে কোন পাকা ফল থাকতে পারতোনা তাঁর জন্য। শৈশব থেকে গান গাওয়া আর খেলা প্রিয় ছিল। গান গাইলে আর বল খেললে সবাই খুব ভালোবাসে এই বোধটা তাঁর ভেতরে খুব কাজ করতো….! একদিন কলেজের শিক্ষক বললেন…তুই একদিন অনেক বড় শিল্পী হবি…কিন্তু বল খেললে গানের গলাতো নষ্ট হয়ে যাবে …! সেই থেকে বল খেলা ছেড়ে দিলেন …! সেসময়ে ফরিদপুরে গানের শিক্ষক ছিলেন প্রাণবন্ধু শাহা। তাঁর কাছে প্রথম গানের তালিম নেয়া শুরু করেন। এছাড়া কলকাতা রেডিওতে অনুরোধের আসরে যে গানগুলো হতো, সেগুলোও শুনতেন আর গলা ছেড়ে গাইতেন নিয়মিতভাবে। এভাবেই গান শিখতে গিয়ে টের পেলেন কলেজের পরীক্ষার আর অল্প দিন বাকী ..! তখনই তিনি সিদ্ধান্ত  নিলেন পালিয়ে যাবেন ….! গানই তাঁকে ভীষণভাবে  টানছে..! এরপর গান গাইবার পূর্ণ বাসনায় প্রথমে চট্টগ্রাম গেলেন এবং সেখান থেকে ঢাকায় গেলেন। ঢাকায় তাঁর সাথে দেখা হয় ওস্তাদ গঁফুর খাঁ এর সাথে। তিনি তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন এবং সন্তান স্নেহে ওস্তাদ গঁফুর খাঁ তাঁকে গান শেখান…। বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে সেসময় শ্রোতাপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেন। এসময় একদিন কার্জন হলে গান গাইতে গিয়ে পরিচয় হয় বিখ্যাত গণসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমানের সাথে। তিনি করাচীতে থাকতেন, ঢাকায় এসেছিলেন, সেখানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন তিনি। সে সুযোগে করাচী রেডিওতে গান করার ইচ্ছার কথা তাঁকে জানান এবং বাবাকে অনেক বুঝিয়ে বাবার কাছ থেকে তিনশ টাকা নিয়ে সঙ্গীতের আরেক ধাপ শুরু করতে দুইশ বিশ টাকা প্লেনের টিকেট কেটে রওনা হলেন করাচী। সেখানে গিয়ে করাচী কালচারাল সেন্টারে গান গেয়ে বাঙালি মহলে বিশিষ্ট শিল্পী হয়ে ওঠেন তিনি। সেই থেকে শুরু। করাচী এসে প্রথম গান গাইলেন “জিনে ভি দো” ছবিতে। এরপর একে একে তিনি গান করেন যেসব ছবিতে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “পিয়াসা”, “উলঝান”।  এছাড়া তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান পরিবেশন করতে শুরু করেন। কিন্ত সব কিছুর পরও নিজের দেশে ফিরে বাংলায় গান করার তাগিদ অনূভব করতে থাকলেন তিনি। সেই তাগিদেই এক সময় দেশে ফিরে এলেন তিনি। ঢাকায় ফিরেই তিনি রেডিওতে প্রথম নিজের লেখা সুরে গান করেন “কাকনের ঠিনিঠিনি নূপূরের রিনিঝিনি” গানটি। অডিশনে এই গানেই এ গ্রেডের সম্মানী পেলেন… সময়টা ছিল ১৯৬০ সাল ঢাকার রেডিওর যাত্রা শুরু হয়ে গেলো। তখন নিয়মিত ঢাকা রেডিওতে আব্বার গান শ্রোতা সংখ্যা বাড়তে শুরু করল এবং সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান পরিবেশনে ভীষণ ব্যস্ত করে তুললো তাঁকে। যে কারণে এক সময় চাকরীও ছেড়ে দিলেন। ইতিমধ্যেই বিয়ে করেন দিনাজপুরে খালাতো বোন রাশিদা চৌধুরীকে….সেসময়ই তিনি গাইলেন আয়নাতে ঐ মুখ দেখলে যখন, তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো, প্রেমের নাম বেদনা, তুমি যে আমার কবিতা… আরো কতো ছবির গান…যে গানগুলো আজো প্রিয় মুখটির সেই গায়কির মানুষটিকে মনে করিয়ে দেয় সব শ্রোতা মহলে। সেই সময় সুরকারদের লক্ষ্যই ছিল ছায়াছবির সবচেয়ে রোমান্টিক গানটিই গাওয়াতে হবে মাহমুদুন্নবীকে দিয়ে । তা না হলে ছবি হিট হবেনা…! নায়করাজ রাজ্জাক আর মাহমুদুন্নবী যেন একই বৃন্তে দুই ফুল। যার ফলশ্রুতিতে “স্বরলিপি” ছবির প্রত্যেকটি গানই ছিল মাহমুদুন্নবীর কন্ঠে এবং প্রত্যেকটি গান শ্রোতামহলে ব্যাপক সমাদৃত হয় । সেসসময় থেকে অনেক পুরষ্কার তিনি পেতে শুরু করেন। তাঁর লেখার হাত খুব ভালো ছিল। উপন্যাস থেকে রম্যরচনা সব ধরনের লেখা তিনি লিখেছেন। সেসময় “খবর” পত্রিকায়  তাঁর লেখা ২টি গল্প প্রকাশিত হয়। “আর পারিনা” নামে একটি রম্য রচনাও লিখেছেন যা সেসময় প্রকাশিত হয় এবং সমাদৃত হয়…। পরবর্তীতে ১৯৬৯ এ গণঅভ্যুথানের সময় এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বাড়াতে অনেক গণজাগরণমূলক গান নিজেই লিখেন এবং সুর করেন এবং গানও গান তিনি… *সেই কালো পথ… *পিঁচে ঢাকা রাজপথ…!

চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসছে একটি স্মরণীয় স্মৃতি। কবে দেশ স্বাধীন হবে, আব্বা বিজয়ের পতাকা ওড়াবেন। আব্বা প্রতিদিন পতাকাটি বের করতেন ওড়ানোর জন্য। তখন আমরা ছিলাম বেইলি রোডে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে শুনতে পেলো দেশ স্বাধীন হয়েছে…! ওমনি বাসার বিশাল ছাদে কতোগুলো পরিবারের মিলেমিশে একসঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে উঠি। আব্বার সাথে লালসবুজের পতাকা উড়িয়ে…..। স্বাধীনতার পরে লিখলেন ..গাইলেন…….
*এই সেই দিন
উল্লাস মুখরিত দিন
রক্ত রঙিন  মহাবিজয়ের এইদিন
এই সেই দিন ১৬ই ডিসেম্বর
বাঙালির বুকে চির জাগ্রতদিন…।
তাঁর গাওয়া বিখ্যাত গানগুলোর উল্লেখযোগ্য ছায়াছবির নাম হলো – কাগজের নৌকা, বেহুলা, আবির্ভাব, স্বরলিপি, আয়না ও অবশিষ্ট, নাচের পুতুল, দর্পচূর্ণ, ছন্দ হারিয়ে গেল, আলো তুমি আলেয়া, দি রেইন, নীল আকাশের নীচে, যে আগুনে পুড়ি, অনির্বাণ, আধুরি দস্তান, পিয়াসা, উলঝান, জিনা ভি মুশকিল, মধুমিতা, হীরা, হারজিৎ আরো অনেক। ছবির গানের পাশাপাশি  নিজের গান যেমন করেন তেমনি অন্যদের জন্য গানও করেন। এসময় আধুনিক গানে কিছুটা পাশ্চাত্য ধারা এবং ক্লাসিক্যাল ধারা নিয়ে আসেন। তাঁর গায়কীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট খুব আবেগ মাখা গায়কী….।
“আধুনিক সংগীত নিকেতন” নামে একটা সংগীত স্কুল করেন, যেখানে তাঁর সংগীত অনুরাগীরা তাঁর কাছে গান শিখতো। তাঁর সেসব ছাত্ররা আজো তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। পৃথিবীর বুকে যেকোন বাঙালী তাঁর গান মুগ্ধ হয়ে শোনেন এবং গাইতে চেষ্টা করেন…..!
সব সময় খুব হাসিখুশি প্রাণখোলা এক মানুষ ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন একা কিছু করা যায়না। তাই সবসময় নিজের গানের পাশাপাশি অন্যদের জন্য গান করতেন। সে কারণে আমাদের বাড়িতে সব সময় প্রচুর শিল্পীদের আনাগোনা ছিল। তাঁদেরকে আব্বা গান এর ব্যাপারে সব রকম পরামর্শ দিতেন। শিল্পী বা যে কোন মানুষকে সহযোগিতা করা ছিল শিল্পী মাহমুদুন্নবীর স্বভাব। ভীষণ বিনয়ী স্বভাবটি তাঁর জীবনের বিশেষ এক সফলতা মনে করি…মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন….. আমরা তাঁর সন্তানরা সেই সরল জীবন আর সংগীতের ভুবনের বাসিন্দা হয়ে তাকেই অনুসরণ করতে চেষ্টা করছি……!
ইতিমধ্যে সরকারী সফরে আব্বা বিভিন্ন দেশে গান করতে যান। ১৯৭৬ সালে “দি রেইন” ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পান “আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই” গানটির জন্য। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পাবার পর থেকে কোন এক অজানা কারণে ধীরে ধীরে তাঁর কন্ঠকে অনেক গানে ব্যবহার করা কমিয়ে দেয়া হলো। বাংলা আধুনিক গানে এত অবদান যে মানুষটির, তাঁর ক্ষেত্রে এ ধরণের অন্যায় আচরণ তাঁকে যথেষ্ট আহত এবং হতাশ করেছিল যে কারণে তিনি অনেকটাই অভিমানী হয়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। খুব ইচ্ছা ছিলো ক্যাসেটে গান রেকর্ড করবেন… কিন্তু হলোনা… হলোনা অনেক কিছুই…! ভীষণ এক বেদনা নিয়ে ১৯৯০ সালের ২০শে ডিসেম্বর মাত্র ৫৪ বছর বয়সে বাংলা আধুনিক গানের উজ্জ্বল নক্ষত্র ক্ষনজন্মা মাহমুদুন্নবী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে ……! ২১ শে পদক দেবার কথা ছিলো…. আজো অজানা কেন দেয়া হয়নি….! দেয়া হবে কিনা….. জানিনা….! তবে শ্রোতার ভালবাসা এতো…এতো…. সেখানে কি পেলো কি পেলোনা…. কোন মানে রাখেনা…..! ডিসেম্বর মাসে তাঁর জন্মদিবস এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর অগণিত শ্রোতাভক্তকুল ও সন্তানদের পক্ষ হয়ে তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি ।তিনি যেখানেই আছেন…..শান্তিতে থাকুন… – ফাহমিদা নবী…
অলংকরন – মাসরিফ হক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: