এদেশের গুণী সঙ্গীত শিল্পী খুরশিদ আলম…

“মাগো মা ওগো মা
আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা।।
আমি দুনিয়া ছাড়ি যেতে পারি
তোকে আমি ছাড়বো না
ওমা তোকে আমি ছাড়বো না,
মাগো মা..।খুরশিদ আলম, বাংলাদেশ সঙ্গীতাঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তী এক গুনী সঙ্গীত শিল্পী। তিনি গানের জন্য শৈশব থেকেই সুর সাধনায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।
অতি সরল মনের মানুষ তিনি প্রান খোলে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ‘মাগো মা’, ‘পাখীর ডানার মত দুটি চোখ’, ‘তোমার ঠিক যেন নাটরের বনলতা সেন’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। এমন অনেক কালজয়ী গান তিনি উপহার দিয়েছেন আমাদের। ওনার ‘চুমকি গান’টি কত প্রজন্ম পেরিয়ে বর্তমান প্রজন্মের আধুনিক গানকেও যেন হার মানিয়ে দেয়। ওনার গাওয়া অনেক গান এদের অনেক প্রতিযোগিতা মূলক রিয়েলিটি শো এবং অনেক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে শিল্পীরা গেয়ে হয়ে গেছেন উজ্জ্বল, কিন্তু খুরশিদ আলম আজো ঢেকে আছেন আঁধারে। খুরশিদ আলম এদেশের প্রবীণ এবং গুনী শিল্পী কোন প্রজন্মই তাকে অস্বীকার করতে পারবেনা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এবং ব্যবসা সফল গানে ওনার কন্ঠের অবদান অতুলনীয় কিন্তু এই শিল্পী আজো পায়নি কোন সরকারি বা গণমাধ্যম পুরস্কার। খুরশিদ আলম এর কথা মনে হলে মনে পড়ে যায় আশরাফ সিদ্দিকির বিখ্যাত কবিতা “তালেব মাস্টার” কবিতা শিক্ষকের ব্যাথিত একটি লাইন আছে –
‘আমি সেই হতভাগা বাঁতিওয়ালা,
অন্যকে আলোদান  করি
অথচ নিজের জীবনই অন্ধকার মালা।’
খুরশিদ আলমকে এ প্রজন্মের ওনেকেই আইডল মানেন। এই গুণী সঙ্গীত শিল্পী ১৯৪৬ সালে ১লা আগস্ট জয়পুরহাটের হারুনজা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সঙ্গীত
তার অন্তরে সুখের সুরে বাজতো ছোটবেলা থেকেই। তাই স্বপ্ন সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। অনেক কষ্ট ও বাধা অতিক্রম করে আজ এতদূর আসতে
পেড়েছেন। যদিও তার জন্ম জয়পুরহাটে কিন্তু তিনি বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের একটি বাড়িতে যৌথ পরিবার নিয়ে থাকতেন। বাড়ির পাশেই একটি মসজিদ থাকায় গানের অনুশীলন কিংবা গান-বাজনা করা নিষেধ ছিল। অনেক কড়াকড়ি নিয়ম-নীতির মধ্যে তাদের থাকতে হতো। তার পরিবারের লোকজনও গান-বাজনা পছন্দ করতেন না, শুধু তার চাচা ছাড়া। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড় খুরশীদ আলম। তার বাবা এ এফ তসলিম উদ্দিন এবং চাচা ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। খুব ছোটবেলা থেকেই খুরশীদ আলমের সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল। যদিও পরিবারের তেমন কেউ সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। চাচা ডা. সাজেদুর রহমান টুকটাক রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। আর চাচার কাছেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি খুরশীদ আলমের। পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের বাড়ি থেকে খানিক দূরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল। সেখানে স্কুল টিফিনের ফাঁকেই গানের চর্চা করতেন। তিনি আজিমপুরের ওয়েস্টিন হাইস্কুলে পড়তেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে বেশ আদর করতেন। তাই গানের অনুশীলন করার সুযোগ একটু বেশিই পেয়েছিলেন। তখনও তিনি কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন না। শুধু কণ্ঠে গান ছাড়া তার সম্বল আর কিছু ছিল না। সে সময় ঠিক করলেন হারমোনিয়াম শিখবেন, কিন্তু বাড়িতে হারমোনিয়াম বাজানোর মতো অনুকূল পরিবেশ ছিল না। বাড়ির পেছনে একটি হিন্দু বাড়ি ছিল। হিন্দুরা যেখানে পূজা দিত, সেই তুলসী গাছটি ছিল একটি বড় টিলার ওপর। ওই টিলার মধ্যে একটা বড় ফুটো ছিল। প্রতিদিন সেখানে গিয়ে সেই ফুটোর মধ্যে মুখ ও হারমোনিয়াম রেখে গানের অনুশীলন করেছেন। যাতে মসজিদে আসা মুসল্লিরা কিংবা আশপাশের লোকজনের কোনো সমস্যা না হয়। এভাবেই গানের জন্য কষ্ট করেছেন খুরশিদ আলম।
তার শিক্ষা জীবন কাটে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, কলেজ অফ মিউজিক এবং তৎকালীন সরকারি জগন্নাথ কলেজে(বর্তমানে জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি)। ১৯৫৬
সালে বাংলাদেশ বেতারে [তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান] একটি অনুষ্ঠান প্রচার হতো স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। সেখানকার নিয়মিত একজন শিল্পী ছিলেন খুরশিদ আলম। তখন পর্যন্ত তাকে কেউ চিনতো না। ১৯৬১-৬২ সালে জাতীয় আধুনিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় এবং ১৯৬২-৬৩ সালে জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রতিযোগিতায়
প্রথম হন তিনি। বাংলাদেশ বেতারে আধুনিক গানের অডিশন দিতে এসে পরিচয় হয় প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের সঙ্গে। সমর দাস তাকে নিয়ে গেলেন
সঙ্গীতের ওপর বিশেষ শিক্ষা দেয়ার জন্য। তিনি তাকে শিখিয়েছেন কিভাবে কোন বিখ্যাত শিল্পীকে অনুসরণ করে ভালো গান করা যায়। তিনি তাকে প্রায় ছয়
মাস সঙ্গীতের ওপর জ্ঞান দান করেন। এরপর আজাদ রহমানের সঙ্গে সঙ্গীত নিয়ে দুই বছর কাজ করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন শিল্পীদের তালিকায় নাম লেখানোর জন্য অডিশন দিয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু তার নাম তোলা হয়নি তালিকায়। পরের বছর আবারও অডিশন দিয়ে নির্বাচিত হলেও নাম উঠলো না। তখন বিটিভির জিএম ছিলেন মনিরুল আলম খোঁজ নিয়ে তার নামটি উঠিয়ে দেন নতুন শিল্পীদের তালিকায়। এরপর থেকে অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে তার বর্তমানের পথটা। ১৯৬৭ সালে কবি সিরাজুল ইসলামের(প্রয়াত) লেখা এবং আজাদ রহমানের সুরে কণ্ঠ দেন একটি আধুনিক গানে। এই গানটি তার জীবনের বাঁক বদলে দেয়। গানটির কথা হলো – তোমার দু-হাঁত ছুঁয়ে শপথ নিলাম। সে সময়ে গানটি তৎকালীন পুরো পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানেও গানটি বেশ জনপ্রিয়। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। ডাক পান বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান করার। সে বছরই তার কণ্ঠে আরেকটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গান হলো- “চঞ্চল দু’নয়নে বলো না কি খুঁজছো ?”
মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম প্লে ব্যাক করেন ১৯৬৯ সালে বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় এবং ইফতেখারুল আলমের প্রযোজনায় ‘আগন্তুক’ ছবিতে। ১৯৬৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন’শ ছবির গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি নতুন একটি ছবিতে কন্ঠ দিয়েছেন। ছবির নাম ‘মায়া ডোরে বাঁধা’ ওনার সাথে কন্ঠ দিয়েছেন ওনার কাছের শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং সাবিনা ইয়াসমিন। এত বছর পর প্রিয় মানুষগুলোর সাথে গান গাইতে পেরে তিনি আনন্দিত।  খুরশিদ আলমের গাওয়া অসংখ্য গানের মাঝে জনপ্রিয় কয়েকটি গান।
১. চুমকি চলেছে একা পথে।
ছবি- দোস্ত দুশমন
গীতিকার – দেওয়ান নজরুল।
সুরকার – আলম খান।
২. ও দুটি নয়নে।
ছবি- অশ্রু দিয়ে লেখা।
সুরকার- আলী হোসেন।
৩. পাখীর ডানার মত দু’টি চোখ তোমার,
যেন নাটোরের বনলতা সেন।
৪. মাগো মা।
ছবি- সমাধি
গীতিকার – গাজী মাজহারুল আনোয়ার।
সুরকার – সত্য সাহা।
৫. আমাদের ভাবছো মানুষ কিনা।
ছবি- লালুভুলু
গীতিকার – মাসুদ করিম
সুরকার -সুবল দাস।
৬. বন্ধী পাখীর মতো মনটা কেঁদে মরে।
ছবি- আগন্তুক
৭. ধীরে ধীরে চল ঘোড়া।
ছবি- শাপমুক্তি
সুরকার – সত্য সাহা
৮. বাপের চোখের মণি নয়।
ছবি- জোকার
গীতিকার – গাজী মাজহারুল আনোয়ার।
সুরকার – আনোয়ার পারভেজ।
৯. যে সাগর দেখে তৃপ্ত দু’চোখ।
১০. ঐ আঁকাবাঁকা নদীর ধারে।
১১. তোমার দু’হাত ধরে শপথ নিলাম।
সুরকার – আজাদ রহমান।
এমন অসংখ্য গান তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। তিনি সর্বদা হাসিমুখে আমাদের মাঝে ছিলেন। তার হাসিমাখা মুখ আমরা সব সময় দেখতে চাই। খুরশিদ আলম আমাদের প্রবীণ কণ্ঠশিল্পী, আমাদের দেশের গর্ব। আমরা ওনার সু’স্বাস্থ কামনা করি।
অলংকরন – মাসরিফ হক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: