আমাদের ড্রামাররা…

কালের বিবর্তনে আর যুগের চাহিদার কারনে আমাদের সঙ্গীতেও এসেছে পরিবর্তন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এদেশের

সঙ্গীতে ব্যান্ড মিউজিক নামে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ধারা। অত্যাধুনিক সব সুর যন্ত্রের শব্দের দোত্যনা অবাক করেছে সবাইকে। তৈরি হয়েছে নতুন এক শ্রোতাদল। আর এই ব্যান্ড সঙ্গীতের সুর যন্ত্রের অন্যতম একটি হচ্ছে ড্রামস। ড্রামসের ডাক-ডাব গুড়-গুড় শব্দ আজ শুধু ব্যান্ড মিউজিকেই নয়, আধুনিক গান হতে ফোক সব ধরনের মিউজিকের জন্যই অত্যাবর্শনীয়। ড্রামসের অসাধারন ছন্দ আর তালের মেলা পুরো সঙ্গীত জগতেই এনেছে নতুন স্বাধ। তবলা বা ঢোলের মতই ড্রামস আমাদের সঙ্গীতে আজ অন্যতম একটি যন্ত্র। আর যাদের দক্ষ হাতে এই যন্ত্রটি আমাদের দেশে উৎকর্ষতা লাভ করেছে – শ্রোতার কানে সৃষ্টি করেছে ভাল-লাগা তাঁদের নিয়ে এই আয়োজন।

11994390_10204827973327897_207449318_nপিয়ারু খান : স্বাধীনতা পর পর দেশে একচ্ছত্রভাবে যিনি সঙ্গীত জগত দখল করে থাকেন তিনি হচ্ছেন আমাদের প্রিয় এবং জনপ্রিয় শিল্পী পিয়ারু খান। সঙ্গীত জীবন শুরু করেন গায়ক হিসেবে যখন তিনি শিশু শিল্পী ছিলেন সাথে সাথে তবলাবাদক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন এবং রেডিও টিভিতে শিশু শিল্পী হিসেবে তাঁর সাথে তখন তিমির নন্দী, হ্যাপী আখন্দ, শেলু বড়ুয়া অংশগ্রহন করতেন। ‘৭৪/৭৫ সালে তিনি ড্রামার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং একমাত্র ড্রামার হিসেবে চলচ্চিত্র, টিভি এবং রেডিওতে স্থান করে নেন। ‘৮০ সালের দিকে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘৭৫/৭৬ সালে ধানমন্ডিতে অবস্থিত একমাত্র মিউজিক ক্যাফে ‘ডিম্পল’ রেস্টুরেন্টে ‘অস্থির’ নামে একটি ব্যান্ড পারফর্ম করতেন। তখন ব্যান্ডে ছিলেন নয়ন হক মুনশি, দুলাল জোহা, পিয়ারু খান এবং ফুয়াদ নাসের বাবু। এবং গায়ক হিসেবে পারফর্ম করতেন দেশের সব জনপ্রিয় শিল্পীগণ। মেলোডি ধাঁচের এই ড্রামারের অসাধারণ সব কাজ খুঁজে পাওয়া যায় ফিডব্যাক এর যুগান্তকারী সব এ্যালবামে। ‘৭৭ এ ফিডব্যাক এর শুরু থেকে আজ অবধি তিনি ফিডব্যাক এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন, এবং পাশাপাশি ‘উই’ নামক আর একটি ব্যান্ডের সাথেও জড়িত আছেন। জড়িত আছেন ‘YUDA’ ইউনিভার্সিটির মিউজিক ডিপার্টমেন্টের রিদম প্রোগ্রামার এর প্রভাষক হিসেবে। তাঁর প্রথম ড্রামস ছিল ‘পার্ল স্নেয়ার প্রিমিয়ার’, তারপর ‘তামা রকস্টার ট্রান্সপারেন্ট’ এবং এখন ‘ভি ড্রামস’ নামে তাঁর একটি অসাধারণ ড্রাম ফিট ব্যবহার করছেন।

11997514_10204827973247895_441965380_nমিল্টন আকবর : এদেশের জনপ্রিয় এবং সেরা কয়জন ড্রামারের মধ্যে অন্যতম মিল্টন আকবর। গত ৩১শে ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁর অসাধারণ সব কাজ তাকে করে রাখবে চিরস্মরনীয়। মাইলসের প্রথম এ্যালবামে মাধ্যমে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। এর পরেই যোগ দেন এল আর বি তে। রক এবং হার্ডরক ধাঁচের এই ড্রামারের অসাধারণ কাজ রয়েছে ‘চমক’ এবং এল আর বি -র ‘তবুও’ শীর্ষক মিক্সড এ্যালবামে। পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার আগে তিনি লন্ডনে বসবাস করতেন এবং নিজস্ব সাউন্ড কোম্পানি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তামা স্টার ক্লাসিক নামে তাঁর কাছে একটি অসাধারণ ড্রাম ফিট ছিল।

12000060_10204827973087891_926594159_nশাহবাজ খাঁন পিলু : দেশের আরেকজন প্রথম সারির ড্রামার হচ্ছেন শাহবাজ খাঁন পিলু। তাঁর দক্ষ হাতের সুরের ছোঁয়ায় তৈরি হয়েছে রেনেসাঁর অসাধারণ সব সৃষ্টি। চমৎকার রোলিং, বিমূর্ত ছন্দ এবং তালে ভরা তাঁর ড্রামিং মন কাড়ার মতো। রেগে ও ক্লাসিক রক ধাঁচের এই ড্রামারের সেরা কিছু সৃষ্টি হচ্ছে ‘ওরে ছোট্ট বেলার সাথী’, ‘ভাল লাগে’, ‘বৃষ্টি লেখা কবিতা’, ‘ও নদীরে’। এছাড়াও ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামে ব্যান্ডের পুরো এ্যালবামটিতেই রয়েছে তাঁর দক্ষ হাতের ছাপ।

11992427_10204827973047890_1644565627_nএহসান এলাহী ফান্টি : এদেশের ড্রামার জগতে যিনি তৈরি করেছেন অনেক বড় বড় মাইলফলক তিনি হচ্ছেন এহসান এলাহী ফান্টি। তাঁর প্রত্যেকটি কাজেই রয়েছে অসাধারণ দক্ষতার ছাপ। সুরের সাথে তাঁর বিস্ময়কর সব তালের মাতোম পুরো শরীরে শিহরন জাগায়। ফিলিংসের সাথে ছিলেন প্রথম থেকেই। ফিলিংসের অসাধারণ সব কম্পোজিশন সৃষ্টিতে তাঁর অবদান অনেকখানি। ফিলিংস বর্তমানে নগরবাউল খ্যাত জেমসের সাথে কাজ করা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মিক্সড এবং আধুনিক গানের এ্যালবামেও কাজ করেছেন। ক্লাসিক রক এবং ফাঙ্ক স্টাইলের এই ড্রামার অতুলনীয় সব কাজ রয়েছে ফিলিংস এবং নগরবাউলের বিভিন্ন এ্যালবামে। বর্তমানে তাঁর কাছে তামা রকস্টার নামে একটি ড্রামস রয়েছে।

11992286_10204827972847885_498385521_nমাহবুবুর রশিদ : রকস্ট্রাটার অসাধারণ সব সৃষ্টি আলোড়ন তুলেছিল পুরো ব্যান্ড জগতে। সাথে সাথে মাহবুবুর রশিদের পাওয়ারফুল ড্রামিং নজর কাড়ে সকল শ্রোতাদের। তাঁর আগে কেউই এত শক্তিশালী ড্রাম সাউন্ড উপহার দিতে পারিনি। মাইলসের সাথে কাজ করেছেন দ্বিতীয় এ্যালবাম থেকে প্রত্যয় এ্যালবাম পর্যন্ত। মাইলসের জনপ্রিয় সব গানে রয়েছে তাঁর অনবদ্য ড্রামিং সাউন্ড। এদেশের ড্রামসের উৎকর্ষতায় তাঁর অবদান অনুস্বিকার্য। বর্তমানে তিনি প্রবাস জীবন যাপন করছেন।

11911676_10204827972887886_2055732312_nশেখ মনিরুল আলাম টিপু : এদেশের ড্রামসের ক্ষেত্রে আরেক দিকপাল হচ্ছেন শেখ মনিরুল আলাম টিপু। টিপুরদক্ষ হাতের ছোঁয়া মিশে আছে ওয়ারফেজ আর উইনিংয়ের সব এ্যালবামে। দেশের প্রথম সারির এবং মেটাল ব্যান্ড গুলোর শীর্ষস্হানীয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ বর্তমানে প্রধান ব্যাক্তি তিনি। তাঁর অসাধারণ ড্রামিং সাউন্ড তাঁকে এনে দিয়েছে দেশের শীর্ষস্হানীয় ড্রামারদের মধ্যে অন্যতম একজনের খ্যাতি। কনসার্টে তাঁর সর্বদা হাস্যজ্জোল মুখখানির সাথে পাওয়ারফুল ড্রামিং উতরে যায় সর্বদাই। তিনি ড্রামস কিট হিসেবে ব্যাবহার করেছেন ‘পার্ল এক্সপোর্ট প্রো’। হেভীমেটাল ও হার্ডরক স্টাইলে বাজিয়ে টিপু কাজ করেছেন নিজের ব্যান্ডের এ্যালবাম ছাড়াও বিভিন্ন মিক্সড ও অন্যান্য শিল্পীর এ্যালবামে।

রিয়াদ : দেশের আরেকজন সুদক্ষ ড্রামার হচ্ছেন রিয়াদ। অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রথম সারির ব্যান্ড এল আর বি-র ড্রামার তিনি। তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ এল আর বি-র ‘ঘুমন্ত শহরে’ এ্যালবামের মাধ্যমে। রক স্টাইলের এই ড্রামার বাজিয়েছেন এল আর বি-র ‘স্বপ্ন’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘ক্যাপসুল’ সহ অসম্ভব জনপ্রিয় সব এ্যালবামে। তাঁর ড্রামিংয়ের উল্লেখযোগ্য দিকটি হচ্ছে পাওয়ারফুল সাউন্ড। এদেশের ড্রামসের ইতিহাসে রিয়াদ সর্বদাই স্মরনীয় একজন।

11995728_10204828789668305_1391392615_nহাসান তৌহিদুর রহমান রুমি : বাংলাদেশের ড্রামসের ক্ষেত্রে আরেক পরিচিত মুখ এবং দক্ষ ড্রামার হচ্ছেন তৌহিদুর রহমান রুমি। ‘৯২ তে ‘লিজেন্ড’ ব্যান্ড ফর্ম করেন এবং ‘অন্যভূবন’ নামে একটি এ্যালবাম রিলিজ করেন। এরপর কিছুকাল নিশ্চুপ থাকার পর ‘৯৮ তে যোগ দেন ‘দ্যা ট্রাপ’ এ। তাঁর কিছুদিন পর আর্কে। ২০০০ সালে ‘আর্ক’ ত্যাগ করে যোগ দেন ‘অর্থহীন’ এ। অর্থহীনের প্রথম এ্যালবামে তাঁর কাজ খুবই উপভোগ্য। অর্থহীনে থাকাকালিন সময়েই কাজ করতে থাকেন ‘দলছুট’ ব্যান্ডে। কিন্তু ২০০১ সালে অর্থহীন ছেড়ে দিয়ে ফর্ম করেন নিজের ব্যান্ড ‘এসিড রেইন’। হার্ডরক ও ফাঙ্ক স্টাইলের এই ড্রামারের উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ রয়েছে লেজেন্ডের ‘অন্যভূবন’, দ্যা ট্রাপের ‘ঠিকানা’, অর্থহীনের ‘ত্রিমাত্রিক’, বাপ্পার ‘ধুলোপড়া’, ‘চিঠি’ প্রভৃতি এ্যালবামে। তিনি ‘পার্ল এক্সপোর্ট’ নামের ড্রামকীট ব্যাবহার করেন।

11994505_10204828789708306_1671114578_nজিয়াউর রহমান তূর্য : মাহবুবুর রশিদ মাইলস ছেড়ে দেবার পর তাঁর পরিবর্তে দলে দরকার ছিল আরেকজন পাওয়ারফুল ড্রামার। আর সেই কাজটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পালন করছেন বর্তমান ড্রামার তুর্য। অত্যন্ত ফাস্ট রোলিং এবং প্রচণ্ড ভার্সেটাইল ড্রামসে হাতেখড়ি খুব ছোটবেলায় কানাডাতে। দেশে ফেরার পর ব্যান্ড রে-বীটাস, তারপর জলি রজারস এবং সর্বশেষ মাইলস। হার্ড রক ধাঁচের এই ড্রামারের কিছু অসাধারণ কাজ রয়েছে মাইলসের এ্যালবামে।

রেজওয়ান : হার্ড রক ও হেভীমেটাল ড্রামারদের মধ্যে অন্যতম একজন। তাঁর প্রথম ব্যান্ড ‘ফেন্টম লর্ডস’। অল্প কিছুদিন পরেই যোগদেন দেশের অন্যতম ব্যান্ড আর্কে। আর্কের ‘তাজমহল’ এ্যালবামের অসম্ভব জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে তাঁর অসম্ভব মেধা ও মননের ছোঁয়া। কিন্তু এই এ্যালবামের পর তিনি আর্ক ছেড়ে দেন। ২০০১ সালে বেনসন এন্ড হেজেস স্টার সার্চ প্রতিযোগিতায় বেস্ট পারকাশানিস্ট হন তিনি। সর্বশেষ তিনি কাজ করেছেন নাফারমান নামের একটি ব্যান্ডের সাথে।

সাজু : নতুন প্রজন্মের ড্রামারদের মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছেন সাজু। বর্তমান সময়ের আরেক অসম্ভব স্মার্ট মেটাল ব্যান্ড ‘আর্টসেল’ এর ড্রামার তিনি। আর্টসেলের তিনি আজীবন সদস্য। ‘ছাড়পত্র’ এ্যালবামে ‘অদেখা স্বর্গের’ মতো গানে তাঁর পারফরমেন্স সত্যিই দারুন। এছাড়াও কনসার্টে তাঁর লাইভ পারফরমেন্স দেখার মতো। সাজু বর্তমানে এখন প্রবাসে থাকেন।

আরাফাত : নতুন প্রজন্মের ড্রামারদের মধ্যে আরেক প্রতিভার নাম আরাফাত। ‘জোলাফট’ ব্যান্ডের মাধ্যমে প্রথম তিনি স্টার সার্চ প্রতিযোগিতায় যোগ দেন। তারপর ‘ওয়াটসন ব্রাদার্স’ ব্যান্ডের সাথে পারফর্ম করে ২০০০ সালের বেনসন এন্ড হেজেস স্টার সার্চ প্রতিযোগিতায় সেরা ড্রামার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কানাডায় বসবাসরত। তিনি ব্যাবহার করতেন ‘রোল্যাড ভি’ নামের ড্রামস কীট।
এই প্রতিবেদনটি গত এক যুগ আগের একটি সঙ্গীত বিষয়ক পত্রিকার (মিউজিক ওয়ার্ল্ড)৫ম সংখ্যার জন্য লেখা হয়েছিলো, কিন্তু তা অপ্রকাশিত থেকে যায়। সঙ্গীতাঙ্গন পাঠকদের জন্য এই অপ্রকাশিত লেখাটি প্রকাশ করা হল। আশাকরি পাঠকদের ভাল লাগবে এবং এই লেখা ধারাবাহিক ভাবে চলবে। ধন্যবাদ

অলংকরন – মাসরিফ হক….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: