গানের পিছনের গল্প – নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা…

 

শেখ ভানু’র ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা, নিশীথে যাইও ফুলবনে’ এই কালজয়ী গানটি দেশে বিদেশে সর্বজনীন জনপ্রিয়তার লাভ করেছে। গানটি পৃথিবীর অনেক ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই বিখ্যাত গানটির কথা আরো দুজন কবিকে উৎসাহী করেছে বলে অনেক গবেষকদের ধারণা। তাদের দুজনেরই কথায় কিছু রদবদল আছে। এ যেন এক ফুল, তিন মালী।

একটি গান, তিনজন গীতিকারঃ শেখ ভানু, রাধারমণ দত্ত ও জসীম উদ্দীন।

শেখ ভানু’র রচনা ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে’ দেহ ও সাধনতত্ত্বের গানটিকে শচীন দেব বর্মণ প্রেমের গানে রূপান্তর করলেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীনকে দিয়ে এবং রূপান্তরিত এই গানটি রেকর্ড করলেন ১৯৩৫ সালে। ২০১৭ সালেও গানটির আবেদন বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি।

অলংকার বর্জন করে ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বাউল, জারির সঙ্গে পশ্চিমী ফোক মিশিয়ে শচীন দেব বর্মণ বাংলা গানের অন্য এক ভুবন নির্মাণ করলেন। গলার বৈশিষ্ট্যও একটি প্রধান বিষয়। শচীন দেবের কণ্ঠ অনুনাসিক, ভাঙা, ভেতরে একটি স্বর বাজে, আছে বিলাপধ্বনি, ক্রন্দনাকুলতা, আছে ঝোঁক, নাটকীয়তা, আছে শব্দকে নিয়ে সুরের লহরী খেলানো, পল্লী বা লোকগীতির আঙ্গিকে সিদ্ধকাম এবং এসব একত্র করে তাঁর গান মার্জিত মৌলিক ও অননুকরণীয়।

গলার গঠনের একটা বাস্তব ভিত্তি আছে। তা সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ জলমাটি হাওয়াজাত কতকটা জাতি বা গোষ্ঠীগত কতকটা শারীরিকগত কতকটা বাকভঙ্গিগত। গলা ভাঙা, গলার লৌকিক অলংকার কোনো শহুরে ওস্তাদ হাজার রেওয়াজ করেও আয়ত্তে আনতে পারেন না। শহুরে কণ্ঠ লোকসংগীতের মেলডিক স্ট্রাকচারটা ঠিকই আয়ত্ত করতে পারেন কিন্তু কণ্ঠভঙ্গিটি আয়ত্ত করতে পারেন না। তাতে করে সেই গানে মাটির গন্ধটি পাওয়া যায় না, বড়ই আরবান মনে হয়। লোকসংগীত গুরুমুখী নয়, গণমুখী, ঘরানা নেই, আছে বাহিরানা। লোকসংগীতের ভাবানুষঙ্গটি সার্বজনীন, অনুভূতিও তাই।

এখানেই শচীন দেববর্মণের কৃতিত্ব। রাগসংগীত ও লোকসংগীতের মিশেলে অভিজ্ঞতা শ্রুতি, কল্পনা ও কারুকৃতির অন্তরবয়ানে একটা স্বতন্ত্র গীতভাষা তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন ঐতিহ্যের দায়কে অতিক্রম করে। তার গানের অনবদ্য আবেদন, স্বচ্ছতা ও সারল্য এখনো বাঙালিকে বুদ করে রাখে। এটাকেই পল রবসন হয়তো বলেছেন “মিউজিক অব দি পিপল”।

শেখ ভানু বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন (জন্ম ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দ -মৃত্যু ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর পিতার নাম মুন্সি নাছির উদ্দীন। শেখ ভানু বাংলাদেশের একজন মরমী সাধক ও বাউল গানের কবি। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। শেখ ভানু’র গানের মধ্যে জনপ্রিয় অন্যতম গান হচ্ছে-

(১) আমি পারলাম না রে, আমার মনরে বুঝাইতে, তোমরানি দেইখাছো কেউ, কদম তলায় ফুল ফুইটাছে।

(২) নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা , নিশীথে যাইও ফুলবনে।

শেখ ভানু ছিলেন ধানের বেপারী। তিনি গ্রাম অঞ্চল থেকে ধান ক্রয় করে ভৈরব, মদনগঞ্জ, মোহনগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় বিক্রি করতেন। শেখ ভানু সুফীবাদের শিক্ষা লইতে বাগদাদ হতে বাংলাদেশে আগত দরবেশ মীরাণ শাহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

_______________________

শেখ ভানুর মূল গান-এর কথাঃ

নয় দরজা করিয়া বন্ধ লইয়ো ফুলেরও গন্ধ
অন্তরে জপিও বন্ধুর নাম রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইও ফুলবনে।

জ্বালাইয়া দিলেরও বাতি
ফুল ফুটিবে নানা জাতি গো
কতো রঙ্গে ধরবে ফুলের কলি রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইও ফুলবনে।

ডালপালা তার বৃক্ষ নাই
এমন ফুল ফুটাইছে সাঁই
ভাবুক ছাড়া বুঝবে না পণ্ডিতে ও ভ্রমরা
নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে।

অধীন শেখ ভানু বলে
ঢেউ খেলাইয়ো আপন দিলেতে
পদ্ম যেমন ভাসে গঙ্গার জলে রে ভ্রমরা
নিশীতে যাইয়ো ফুলবনে।

নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে ও ভ্রমরা
নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে।

নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইয়ো ফুলব।
________________________________________

পল্লীকবি জসীম উদদীনের রূপান্তরিত গান-এর কথাঃ

নিশিতে যাইও ফুলবনে রে ভোমরা।
নিশিতে যাইও ফুলবনে।

জ্বালায়ে চান্দের বাতি-
জেগে রব সারা-রাতি গো;
আমি কব কথা শিশিরের সনে রে ভোমরা।
নিশিতে যাইও ফুলবনে।

যদিবা ঘুমায়ে পড়ি-
সময়ের পথ ধরি গো,
তুমি নীরব চরণে যাইও রে ভোমরা।
নিশিতে যাইও ফুলবনে।

আমার ডাল যেন ভাঙে না,
আমার ফুল যেন ভাঙে না,
ফুলের ঘুম যেন ভাঙে না,
তুমি নীরব চরণে যাইও রে ভোমরা।
নিশিতে যাইও ফুলবনে। – তথ্য সংগ্রহে মীর শাহ্‌নেওয়াজ…

১) নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা | স্বাগত দে

২) নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা | পাপিয়া

৩) নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা | শচীন দেব বর্মণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: