Press "Enter" to skip to content

শব্দ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা তিমির নন্দী…

১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। আজও বাংলাদেশের পতাকায় যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখো শহীদের রক্ত দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে হাজারো মায়ের সন্তান হারানোর হাহাকার, হাজারো বোনের ভাই হারানোর দীর্ঘশ্বাস, হাজারো নারীর স্বামী হারানো বিধবা শাড়ীর আঁচলে মুখ লুকোনো আর্তনাদ, হাজারো সন্তানের পিতা হারানোর করুন পরিনতি। তবুও যেন তাদের চোখেই স্বাধীন বাংলার মানচিত্রের বিজয় উল্লাস। আমরা বাঙ্গালী জাতি, প্রতিবাদ করতে জানি। আমরা আমাদের অধিকার আদায় করতে জানি। জীবন দিয়ে হলেও দেশের জন্য মরতে পারি।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বাঙ্গালী জাতি দেশপ্রেমের তাগিদে যার যার অবস্থান থেকে যুদ্ধ করে পাক হানাদারদের থেকে স্বাধীনতার পতাকা ছিনিয়ে এনেছে। এর মধ্যে শব্দ সৈনিকের সংখ্যাও কম নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দ সৈনিকরা তাদের কন্ঠের বিপ্লবী গানে গানে প্রেরনা যুগিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধাদের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এমনি ৫৮ জন শব্দ সৈনিকদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দান করেছে সরকার। তাদের মধ্যে তিমির নন্দী একজন। কিছু সময় কথোপথনে শব্দ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা তিমির নন্দী সঙ্গীতাঙ্গন এর প্রতিনিধির সাথে –

সঙ্গীতাঙ্গনঃ সঙ্গীতাঙ্গন পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন, কেমন আছেন?
তিমির নন্দীঃ ভালো আছি। সঙ্গীতাঙ্গন পরিবারকেও শুভেচ্ছা এবং ধন্যবাদ।

সঙ্গীতাঙ্গনঃ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৫৮ জন শব্দ সৈনিককে সরকার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের মধ্যে আপনি একজন। আপনার অনুভূতি কেমন?
তিমির নন্দীঃ কোন স্বীকৃতির জন্য নয়, যা করেছি দেশকে ভালবেসে, দেশকে স্বাধীন করার জন্যই করেছি। আমরা আমাদের গানের মাধ্যমে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি। আমরা দেশকে পরাধীনতার গ্লানী থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে আমাদের কন্ঠশৈলী দিয়ে কাজ করেছি। আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছি, স্বাধীনভাবে চলতে চেয়েছি, পরাধীনতা থেকে মুক্তি চেয়েছি আর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেই আমাদের সফলতা পেয়েছি।

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর সরকার আমাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও আমরা প্রাপ্য ছিলাম, দেরীতে হলেও সরকারীভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায়, আমি অনেক আনন্দিত!। এত দিন সবাই জানতো আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার তথা গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কন্ঠ দিয়ে গান করে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিপ্লব তৈরী করার চেষ্টা করেছি। আমাদের গান স্বাধীন বাংলায় প্রচার করা হতো, তা শুনে মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হতেন। কিন্তু দীর্ঘ ৪৫ বছর পর সরকারের স্বীকৃতির ফলে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলাম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বর্তমান সরকার আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই আমরা আনন্দিত, গর্বিত এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ।

সঙ্গীতাঙ্গনঃ ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় আপনি তো ছিলেন উঠন্ত যুবক । আপনি অস্ত্র হাতে না নিয়ে কন্ঠ দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করার প্রয়াস কিভাবে পেলেন?
তিমির নন্দীঃ আসলে আমি অস্ত্র নিয়েই যুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম। আমি তখন কুড়িগ্রাম বেড়াতে গিয়ে বাগুয়া গ্রামে থাকতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী এবং বিবিসি শুনতাম পাক হানাদার বাহিনী বিভিন্ন গ্রাম ও মহল্লায় হামলা চালাচ্ছে। তারপর মাকে বললাম – মা আমি যুদ্ধে যাবো, আমি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করবো। মা বললেন- না, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অনেকে পরিচিত আছে তুমি তোমার কন্ঠ দিয়ে যুদ্ধে করবে। আমি ১৯৬৯ সাল থেকে আমি রেডিও এবং টেলিভিশনে গান গাইতাম কিন্তু কন্ঠ দিয়ে যুদ্ধ করা যায় এটা হয়ত বুঝতাম না। তখন আমি ক্লাস টেন এ পড়ি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিপ্লব তৈরীই ছিলো মূল উদ্দেশ্য।

সঙ্গীতাঙ্গনঃ ১৯৭১ সালে কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?
তিমির নন্দীঃ আসলে তখন আমি তো এতকিছু বুঝতাম না। তবে দেশ পরাধীন থেকে মুক্তি পেলে, আমরা সবকিছুতেই স্বাধীনভাবে চলতে বা করতে পারবো। অর্থাৎ স্বাধীনতা চাই।

সঙ্গীতাঙ্গনঃ আজকের এই দিনে এসে আপনার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশকে দেখতে পান?
তিমির নন্দীঃ আমরা চেয়েছি সোনার বাংলাদেশ। সবাই কাধে কাঁধ মিলিয়ে এক অপরের বিপদে-আপদে পাশে থেকে সোনার বাংলা গড়বো। এই রকম হিংসাত্মক কর্মকান্ড, হানাহানি, আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যাক্তিস্বার্থ নিয়ে টানাটানি করার মতো দেশ অবশ্যই চাইনি। – রবিউল আউয়াল…

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: