বিশ্বের নাম্বার ওয়ান সেতার বাদক অন্নপূর্ণা…

স্বনামধন্য সুরবাহার শিল্পী এবং উত্তর ভারতীয় সনাতনী শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরু অন্নপূর্ণা দেবী ওরফে রওশন আরা বেগম। সুরের অসামান্য এক প্রতিভা অন্নপূর্ণা দেবী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপাল ব্যক্তিত্ব ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর সুযোগ্যা কন্যা, ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর বোন এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাবেক স্ত্রী। সুরবাহার বাদ্যযন্ত্রে বিশেষ পারদর্শিনী অন্নপূর্ণা ছিলেন উপমহাদেশের একমাত্র শিল্পী, যিনি সংগীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেও অজ্ঞাত কারণে নিজেকে সংগীতজগতে প্রকাশ করেননি। সংগীতাচার্য অন্নপূর্ণা দেবী পিতার কাছে ধ্রুপদাঙ্গ আলাপের শ্রেষ্ঠ রূপরীতি শিখেছিলেন এবং সুরবাহার বাদনে বিরাট সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি আজো নীরবে সেই সুরের সাধনায় ব্যাপৃত আছেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি গুরু অন্নপূর্ণা দেবী ১৯২৭ সালের ২৩শে এপ্রিল চৈতী পূর্ণিমায় অবিভক্ত ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, তাদের আদি নিবাস ছিল আমাদের বাংলাদেশের ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলায় গুরু অন্নপূর্ণা দেবীর প্রতিভা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত একাডেমি প্রকাশিত ‘আলাউদ্দিন খাঁ: জীবন সাধনা ও শিল্প’ (১৯৯৬) গ্রন্থের মুখবন্ধে একাডেমির সভাপতি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ লিখেছেন, আলাউদ্দিন খাঁ যন্ত্রসংগীতের জগতে প্রায় সবারই গুরুস্থানীয় ছিলেন। তিনি তার কন্যা অন্নপূর্ণাকে তার বিদ্যায় পারদর্শিনী করে তোলেন। খাঁ সাহেবকে আমি বলতে শুনেছি, ‘আমার বাজনা যদি কেউ বাজিয়ে থাকে তবে সে আমার মেয়েই বাজিয়েছে। অন্নপূর্ণাকে তিনি নিজের মতো করেই তৈরি করেছিলেন। তারপর আলি আকবর, রবিশঙ্কর।’

গুরু অন্নপূর্ণা দেবীর শিষ্যবর্গের দীর্ঘ সারিটি বেশ সমীহ জাগানো। তাঁর বহু ছাত্রছাত্রী সুনাম অর্জন করে সংগীতাঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে রয়েছেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিত আমিত ভট্টাচার্য, নিত্যানন্দ হলদিপুর, সেতারবাদক রুশিকুমার পাণ্ডে, পণ্ডিত প্রদীপ বরাটসহ আরো অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পী, সুরসাধক। অন্নপূর্ণা দেবী তাঁর শিষ্যদের মনে রাখতে বলেন, শিক্ষাদানকালে বাবা তাঁকে বারবার বলেছেন: ‘আমার সংগীত যেন সাধারণ্যে প্রদর্শনীর জন্য না হয়ে নিজের সিদ্ধির জন্য হয়।’ কারণ, প্রথমটি মহিমান্বিত করে সংগীতশিল্পীকে, সংগীতকে নয়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অনন্য প্রতিভা অন্নপূর্ণা দেবী বর্তমানে থাকেন মুম্বাইয়ের মালাবার হিলে সমুদ্রমুখী একটি বহুতল ভবনের ছয়তলায়। আগেই উল্লেখ করেছি, সুরবাহার শিল্পী অন্নপূর্ণা দেবী ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর কনিষ্ঠা কন্যা, ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর ছোট বোন। তাঁর মায়ের নাম মদিনা বেগম। তাঁর অপর দুই বোনের নাম শারিজা ও জাহানারা। খুব ছোটকালেই পারিবারিক আলোকিত ঐতিহ্যের কারণেই তার রক্তে মিশে গিয়েছিল সুর। তাঁর পিতা ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ মহারাজ ব্রিজনাথ সিংয়ের মাইহার রাজদরবারে বাদক ছিলেন, সভাশিল্পী ছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রওশনারা খান আর ডাক নাম অন্নপূর্ণা। মহারাজই নবাগত শিশুর নাম দেন অন্নপূর্ণা। তিনি তাঁর প্রকৃত নামের পরিবর্তে অন্নপূর্ণা নামেই সুপরিচিত আর শিষ্যদের কাছে তিনি কেবলই শ্রদ্ধেয় ‘মাইজি’।

বিশ্ববিশ্রুত সেতারবাদক ও ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের এ যুগের পুরোধা ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রয়াণ সংবাদ শুনে দ্য টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করেন রবিশঙ্করের প্রথম স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী। তিনি বলেছিলেন, ‘শ্রেষ্ঠতম শিল্পীদের একজনকে হারাল ভারত। এতে বিশ্বসংগীতের, বিশেষ করে মাইহার ঘরানার সংগীতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রবিশঙ্কর আমার বাবাকে ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন সংগীতকে। তিনি ও দাদা (ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ) ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিতে অসীম অবদান রেখেছেন।’ রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে অন্নপূর্ণা দেবী বলেছিলেন, ‘১৯৩৮ সালের ঘটনা। বাবার কাছে সংগীতের তালিম নিতে মাইহার গ্রামে উপস্থিত হয়েছিলেন রবো (রবিশঙ্করকে তখন এই নামে ডাকা হতো)। তখন রবোর বয়স ১৮, আর অন্নপূর্ণার নয় বছর। দুজনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছ থেকে একসঙ্গে সরোদসহ উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নিয়েছেন। একত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজিয়েছেন। অন্নপূর্ণার ভাই ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর সঙ্গেও রবিশঙ্কর বাজিয়েছেন কত কত সময়।’ উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে দুজনের ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা হয় অন্নপূর্ণা দেবীর বর্তমান আকাশগঙ্গা অ্যাপার্টমেন্টে। রবিশঙ্কর একবারই গিয়েছিলেন, ১৯৮০ সালে। সেবারই দুজনের শেষ দেখা ও কথা বলা। এরপর তাঁদের মধ্যে আর কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। অন্নপূর্ণা বেছে নিলেন নিভৃতচারী জীবন।

জানা যায়, শৈশব থেকে অন্নপূর্ণাকে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সংগীতে তালিম দেননি। এর পেছনে একটি দুঃখজনক ঘটনা আছে। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ তার মধ্যম কন্যা জাহানারাকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে কণ্ঠসংগীতে তালিম দিয়েছিলেন। বিয়ের পর জাহানারার শাশুড়ি তাঁর সংগীত চর্চা বন্ধ করে দেন। শাশুড়ির এই নিষেধ অগ্রাহ্য করে জাহানারা সংগীত চর্চা করতে থাকলে, শাশুড়ি জাহানারার তানপুরা পুড়িয়ে দেন। পরে তাঁর সংগীত সাধনা আর অগ্রসর হয়নি। এ ঘটনার পর থেকে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা অন্নপূর্ণাকে সংগীত তালিম না দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু বাড়ির সংগীতময় পরিবেশে কোনো তালিম ছাড়াই, শুনে শুনে সংগীতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। একদিন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ বাড়ির বাইরের থেকে এসে ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর সঙ্গে অন্নপূর্ণা রেওয়াজ করছেন শুনতে পান। আড়াল থেকে অন্নপূর্ণার গান শুনে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হন এবং তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা ভেঙে অন্নপূর্ণার সংগীত শিক্ষা নিজের হাতে তুলে নেন। তিনি তাঁর পিতার কাছে কণ্ঠসংগীত, সেতার ও সুরবাহার শেখেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি সংগীতে এতটাই পারদর্শিনী হয়ে ওঠেন যে, তাঁর পিতার অনুমতিক্রমে, পিতার শিষ্যদের সংগীত শিক্ষা দিতেন। এ সময় নিখিল বন্দ্যোপাধ্যয়, ওস্তাদ বাহাদুর খান তাঁর শিষ্য হয়ে ওঠেন বোন অন্নপূর্ণার সংগীতের হাতেখড়ি এবং তালিম প্রসঙ্গে ভাই আলি আকবর খাঁ (১৯২২-২০০৯) লিখেছেন: ‘অন্নপূর্ণার গানবাজনা শেখার সঙ্গে আমার অপদার্থতার সম্পর্ক আছে। একদিন সকালে একটা জিনিস বারবার চেষ্টা করেও যন্ত্রে আনতে পারছিলাম না। বাবা রেগেমেগে থলি হাতে বাজারে চলে গেলেন। ঠিক তখনই অন্নপূর্ণা সেই ঘরে এসে আমার ভুলে যাওয়া ওই ফ্রেজটা গেয়ে গেয়ে বলল, ‘এভাবে বাজাও, দাদা’। আমি তো অবাক, বুঝলাম বাবা যখন আমাকে শেখান, কাছাকাছি থাকলে শুনে শুনেই ও সেসব গলায় তুলে নেয়। আমি ওর গাওয়া শুনে পিসটা যন্ত্রে তুলে নিচ্ছি, এমন সময় আবার বাবার প্রবেশ; থলে নিয়ে বেরিয়েছিলেন কিন্তু রাগের ঝোঁকে টাকা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলেন। অন্নপূর্ণার এই আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে সেদিন সন্ধে থেকেই অন্নপূর্ণাকে তানপুরা ধরিয়ে সরগম শেখাতে শুরু করেন বাবা। গানের সঙ্গে সঙ্গেই ছোট সেতার কিনে সেটাও শেখাতে শুরু করেন। বারো-তেরো বছর বয়সে শেখাতে শুরু করেন সুরবাহার। আশ্চর্য ক্ষমতা তো ছিলই, সেই সঙ্গে অন্নপূর্ণার নিষ্ঠার জবাব নেই। অন্নপূর্ণা আলাপটাকে একটা অসাধারণ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। সে বাবার মতোই বাজনায় শুদ্ধতার ব্যাপারে কোনো কমেপ্রামাইজ করতো না। আলাপের পনেরোটা অঙ্গ নিখুঁতভাবে বাজাত। গভীর রাগই বেশি বাজাত অন্নপূর্ণা। আমরা যেমন ভৈরবীতে সব পর্দা লাগিয়ে দিই, ও বাজাত ‘শুদ্ধ ভৈরবী’। ওর বাজনার গভীরতা সমঝদারের অন্তরে গিয়ে ঘা দিত।’ (পৃ. ৯৭, স্বরসম্রাট উস্তাদ আলি আকবর খান, অতনু চক্রবর্তী, পারুল, কলকাতা, ২০১০)।

নানা রকম জটিলতার অবসান ঘটিয়ে ১৯৪১ সালের দিকে নৃত্যগুরু পণ্ডিত উদয়শঙ্করের আগ্রহে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে অন্নপূর্ণার বিবাহে সম্মতি দেন। ১৯৪১ সালের ১৫ই মে সন্ধ্যাবেলা তাঁদের বিয়ে হয়। এ সময় অন্নপূর্ণার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ১৮৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন তাদের প্রথম সন্তান শুভেন্দ্র শঙ্কর (১৯৪২-১৯৯২)। শুভেন্দ্র তাঁর মায়ের কাছেই সেতার বাদন শেখেন। এ সময় রবিশঙ্কর শুভেন্দ্রকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে, অন্নপূর্ণা তাতে বাধা দেন এবং নিজেই পুত্রকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে থাকেন। ১৯৫০ সালের দিকে ওস্তাদ আলি আকবর খানের সংগীত স্কুলের অনুষ্ঠানে – কলকাতা ও দিল্লিতে পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং অন্নপূর্ণা দ্বৈত-বাদন পরিবেশন করেন। এরপর থেকে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের সংঘাত ঘটে। শেষ পর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, ১৯৬৭ সালে তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটে। এরপর থেকে তিনি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করা বন্ধ করে দেন এবং সংগীত শিক্ষক হিসেবেই নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, অন্নপূর্ণাও ছিলেন তাঁর পিতার মতোই নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শিনী। তিনি বহু গুণী শিল্পীকে সৃষ্টি করেছেন নানাবিধ যন্ত্রের দীক্ষা দিয়ে। তিনি তাঁর পুত্র শুভেন্দ্র শঙ্করকে শিখিয়েছেন সেতার। এছাড়া সেতার শিখিয়েছেন পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রকান্ত সার্দেশমুখ, সুধীর ফাডকে, হেমন্ত দেশাই, অধ্যাপক রুশি কুমার পাণ্ডেকে। তাঁর ভ্রাতুষ্পত্র আশিস খানকে শিখিয়েছেন সরোদ। সরোদের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শিষ্য হলেন দেবশর্মা, বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদীপ বারোত, অমিত ভট্টাচার্য এবং বসন্ত কাব্রা। বাঁশি শিখিয়েছেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া এবং পণ্ডিত নিত্যানন্দ হালদিপুরীকে। এছাড়া অনিয়মিতভাবে শিখিয়েছেন সন্ধ্যা আপ্তে (সেতার), লীনাতা ভাজে (সেতার), অমিত হিরন রায় (সেতার), স্তুতি দে (সরোদ), উমা গুহ (সরোদ), মিলিন্দ শেওরে (বাঁশি), কাকলী রাই (সুরবাহার) প্রমুখ।

মুম্বাইয়ের উম্যান অ্যান্ড হোম পত্রিকায় ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত মোহন ডি. নাদকানির নেওয়া বিরল একটি সাক্ষাৎকারে অন্নপূর্ণা বলেছিলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ শিল্পী এখন ‘কনসার্ট শিল্পী’ যাঁরা পরম্পরা সৃষ্টি করার মতো গুরু নন। বাবার শ্রেষ্ঠ শিষ্যগণও তার মিউজিকের বিশুদ্ধি থেকে দূরে সরে গিয়ে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতবোধে শ্রোতাদের ভুল পথে নিয়ে গিয়েছেন। তারা অপ্রস্তুত ও অদীক্ষিত পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের উত্তেজিত করার সহজ পথ ধরে প্রকারান্তরে হিন্দুস্তানি মিউজিকের মৌলিক ক্ষতি সাধন করেছেন। ফলে সৃষ্ট হয়েছে ভেজাল ‘মিডিয়ক্রিটি’, শুদ্ধ শিল্পী নয়।’ নাদকার্নি আরো লিখেছেন, সংগীতমহলে ওস্তাদ আমীর খাঁর উক্তিরূপে কথিত আছে যে, অন্নপূর্ণা আলাউদ্দিন খাঁর ৮০ ভাগ, আলি আকবর ৭০ আর রবিশঙ্কর ৪০। এজন্যই খাঁ সাহেবের ‘আল্টিমেট রেফারেন্স’ জ্ঞান করা হয় অন্নপূর্ণাকেই। তার সামনে সরোদ বাজাতে দ্বিধা বোধ করেন স্বয়ং স্বরসম্রাট আলি আকবর। সেজন্য সরোদ শিখতে তিনি তার ছোট বোনটির কাছেই পাঠিয়েছেন পুত্র আশীষ খাঁ এবং ধ্যানেশ খাঁকে।

গুরু অন্নপূর্ণা দেবী সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। এরপরও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে অত্যন্ত সম্মানজনক আসন লাভ করেন তিনি। এই মহীয়সী নারী পদ্মভূষণ (১৯৭৭), সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৯১) ও দেশিকোত্তমসহ (১৯৯৯, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়) উপাধি লাভ করেন ভারতের গৌরবময় সব পুরস্কার। গুরু অন্নপূর্ণা দেবীর কোনো সংগীত এ্যালবাম নেই বলেই জানা যায়। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে কনসার্টে তাঁর পরিবেশন করা বেশ কয়েকটি রাগ গোপনে রেকর্ড করা হয়। এগুলো ভারতে বেশ জনপ্রিয়। অন্নপূর্ণা দেবী বর্তমানে মুম্বাইয়ের ‘আচার্য আলাউদ্দিন মিউজিক সার্কেল’-এর প্রাণসত্তাস্বরূপ। তাঁর সমগ্র জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বাবা আলাউদ্দিন খাঁর শুদ্ধতম সংগীতের দীপটিকে প্রজ্বলিত রেখে যাওয়া।

গুরু অন্নপূর্ণা দেবীর ব্যক্তি ও শিল্পজীবন বিষয়ে খুব কমই জানা যায়। গণমাধ্যমের সামনে নিজেকে তুলে ধরতে তিনি মোটেই উৎসাহী নন। তবে নিভৃতচারী এই শিল্পীই একবার স্বেচ্ছায় ডেকেছিলেন সাংবাদিক আলিফ সুর্তিকে, দিয়েছিলেন দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই লেখাটি বেরিয়েছিল, ম্যানজ ওয়ার্ল্ড-এ, ২০০০ সালের আগস্টে। লেখাটির নির্বাচিত অংশ তুলে ধরছি গুরু অন্নপূর্ণা দেবীর মানস জগতকে আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টায় আলিফ সুর্তি লিখছেন, ‘এক বটবৃক্ষের ছায়াতলে অন্নপূর্ণার সংগীত-প্রতিভা লালিত হয়েছে। সেই মহীরুহ ছিলেন তাঁর বাবা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। অন্নপূর্ণা অবশ্য প্রতিভার আলো ছড়াতে পেরেছিলেন নিজের গুণেই। পরে সেতারের অসামান্য প্রতিভা পণ্ডিত রবিশঙ্করকে বিয়ে করে তিনি সুরের বাঁধনে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন। এ বাঁধন অবশ্য টেকসই হয়নি। বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, সে বিচ্ছেদের সূত্র ধরেই সংগীতের ভুবন থেকে হারিয়ে গেছে তাঁর সুর। রবিশঙ্করের সঙ্গে বিরোধের ফলেই অন্নপূর্ণা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে আর কখনোই দর্শকদের সামনে সেতার বা সুরবাহার বাজাবেন না। প্রতিজ্ঞায় অনড় থেকে তিনি বেছে নেন মুম্বাইয়ের বাসগৃহে নিভৃত নিঃসঙ্গ জীবন। তাঁর ৭৪ বছরের জীবনে কোনো রেকর্ডিং করেননি, প্রায় ৫০ বছর হলো বাইরের কোনো লোক তাঁকে বাজাতে দেখেনি। এর মাত্র একবার ব্যত্যয় ঘটেছিল বিখ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের বেলায়। অন্নপূর্ণার রোজকার রেওয়াজের সময় তিনি তাঁর পাশে বসার অনুমতি পেয়েছিলেন। তিরিশের দশকের কথা। আলি আকবর তখন বয়সে তরুণ। সরোদে সর্বশেষ পাঠে তালিম নিচ্ছেন। তাঁর ছোট বোন অন্নপূর্ণা, বেনারসের ১৬০ মাইল দূরে, মাইহারে, তাঁদের বাড়ির চৌহদ্দিতে এক্কাদোক্কা খেলে বেড়াচ্ছেন। খেলা থামিয়ে নিজে থেকেই ভাইকে বলছেন, ‘ভাইয়া, বাবা ওভাবে না তো, এভাবে শিখিয়েছিলেন’। তারপর গড়গড় করে তিনি বাবার তালিম থেকে গাইতে শুরু করলেন। অথচ বাবার কাছ থেকে তিনি কোনো তালিম পাননি। আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর বড় মেয়েকে গান শিখিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন। বিয়ের পর সংগীত সে মেয়ের রক্ষণশীল স্বামীর বাড়িতে সমস্যা তৈরি করে। এ জন্য ছোট মেয়ের বেলায় একই ভুল করতে চাননি। অন্নপূর্ণা চুপিচুপি চালিয়ে যাচ্ছিলেন সংগীতের সাধনা। কিন্তু একদিন ধরা পড়ে গেলেন। অন্নপূর্ণার নিজের জবানিতে সেদিনের ঘটনাটা এ রকম: ‘আমি সংগীতে এমন তন্ময় হয়ে ছিলাম, বাবা যে ফিরে এসে আমাকে দেখছেন, তা খেয়ালই করিনি। আমাকে তিরস্কার না করে বাবা তাঁর নিজের ঘরে ডেকে নিলেন। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, সংগীতের ওপর আমার সত্যিকারের দরদ আছে। আমি যেহেতু সংগীত ভালোবাসি, এটা আমি করতে পারব। সেই থেকে আমার তালিম নেয়া শুরু।’

অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো ধ্রূপদী গান দিয়ে তালিম শুরু হয় অন্নপূর্ণার। এরপর তিনি সেতার শেখেন। একদিন বাবা তাঁর কাছে জানতে চাইলেন সুরবাহারে তালিম নেয়ার আগ্রহ আছে কি না। এটি সেতারের সমগোত্রীয় সুরযন্ত্র। কিন্তু আকারে আরও খানিকটা বড়, আর বাজানোও বেশ কঠিন। তবে শিখতে পারলে সেটা খুবই গৌরবের ব্যাপার। অন্নপূর্ণা সে কথা স্মরণ করে বলছেন, ‘বাবা বললেন, “তোমাকে আমার গুরুর বিদ্যা শেখাব। কারণ তোমার মধ্যে লোভ নেই। এ বিদ্যা শিখতে হলে খুব শান্ত মন আর অসীম ধৈর্য দরকার। আমার মনে হয়েছে, গুরুর এই উপহার তুমি ধরে রাখতে পারবে। সংগীতের প্রতি তোমার সত্যিকারের অনুরাগ আছে। তবে এটা শিখতে হলে তোমাকে সেতার বাজানো ছাড়তে হবে। সেতার সবারই পছন্দ, সাধারণ মানুষ ও সমঝদার সবাই সেতার ভালোবাসে। কিন্তু সুরবাহারের প্রশংসা করবেন কেবল সেসব শ্রোতা, যাঁরা সংগীতের গভীরতা বুঝতে পারেন বা অন্তরের মধ্যে সুর অনুভব করেন। সাধারণ শ্রোতারা অবশ্য তোমার দিকে টমেটো ছুঁড়ে মারতে পারে। এখন তুমি কী করতে চাও সেটা বলো।” আমি একদম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার সোজা জবাব ছিল, আপনি যা আদেশ করবেন তাই হবে।’ এরই মধ্যে উদয়শঙ্করের ছোট ভাই রবীন্দ্রশঙ্কর (১৯৪০ সালের দিকে তিনি নাম বদলে রাখেন রবিশঙ্কর) তালিম নিতে এলেন মাইহারে। রবিশঙ্করের বয়স তখন মাত্র ১৮। আর ১৩ বছরের লাজুক কিশোরী অন্নপূর্ণা, রবিশঙ্করের ভাষায়, ‘খুব উজ্জ্বল, আর দারুণভাবে নজরকাড়া। চোখ দুটো ভারি মিষ্টি, আর গায়ের রং আলু ভাইয়ের (ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ) চেয়ে ফর্সা।’ তবে তাঁদের বিয়ে প্রেম করে হয়নি। এ ব্যাপারে অন্নপূর্ণা দেবীর ভাষ্য: ‘মাইহারে মা-বাবার সঙ্গে আশ্রমের মতো একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। পণ্ডিতজির আকর্ষণে জড়িয়ে পড়ার প্রশ্নই ছিল না। আমরা প্রেম করে বিয়ে করিনি। এটা ছিল বাড়ির পছন্দে বিয়ে।’

পণ্ডিত রবিশঙ্করও তাঁর আত্মজীবনী রাগমালাতে লিখেছেন, ‘আমাদের মধ্যে প্রেম, রোমান্স বা লুকোচুরির কিছু ছিল না। ওই সময়ে অনেকে অবশ্য এ রকমই ভাবত। বিয়ের আগে এ ব্যাপারে ওর সত্যিকারের মনোভাব কী ছিল সেটা আমি জানতাম না। আমাকে বলা হয়েছিল ওর মত আছে।’ ১৯৪১ সালের ১৫ই মে সন্ধ্যাবেলা তাঁদের বিয়ে হয়। সংগীতের সমঝদার ও সমালোচকদের মতে, সুরের জগতে রবিশঙ্কর বা আলি আকবরের চেয়ে বড় প্রতিভা ছিলেন অন্নপূর্ণা। ওস্তাদ আমির খান যেমন বলেছেন, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ৮০ ভাগ পেয়েছেন অন্নপূর্ণা, আলি আকবর খাঁ ৭০ ভাগ, আর ৪০ ভাগ রবিশঙ্কর।’ আলি আকবর নিজেও এর সঙ্গে একমত হয়েছেন তাঁর বিখ্যাত এই ভাষ্যে, ‘রবিশঙ্কর, পান্নালাল ঘোষ আর আমাকে এক পাশে রেখে আরেক পাল্লায় অন্নপূর্ণাকে রাখলে ওঁর পাল্লাই ভারী হবে।

অন্নপূর্ণার মতে, এ জিনিসটা নিয়েই তাঁদের দাম্পত্যজীবনে টানাপড়েন শুরু হয়েছিল। অন্নপূর্ণা জানাচ্ছেন, ‘দর্শকদের সামনে আমি যতবার বাজিয়েছি, সবাই আমার ভীষণ তারিফ করেছে। আমি বুঝতে পারতাম, পণ্ডিতজি এটা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। আমারও লোকের সামনে গিয়ে বাজানোর খুব গরজ ছিল- এমন নয়। তাই, এটা বন্ধ করে আমি নিজের মতো সাধনা চালিয়ে যেতে থাকি।’ এটা এখন আর কোনো গোপন ব্যাপার নয় যে, এই দুই শিল্পীর দাম্পত্যের টানাপড়েনকে উপজীব্য করেই গুণী চলচ্চিত্রকার ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায় তাঁর অভিমান ছবিটি তৈরি করেছিলেন। ছবিটি বেশ জনপ্রিয় হয়। ছবিতে বিখ্যাত এক গায়কের (অমিতাভ বচ্চন) সঙ্গে তার লাজুক বউয়ের (জয়া ভাদুরী) টানাপড়েন দেখা দেয় সংগীত-প্রতিভাকে কেন্দ্র করে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে বধূটি তার স্বামীকে ছাড়িয়ে গেলে টানাপড়েন চরমে পৌঁছে। ঋষিকেশ অবশ্য ছবির কাজ শুরু করার আগে অন্নপূর্ণার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলেন। ছবির কাহিনিতে ওই দম্পতি সুখী জীবনে ফিরে গেলেও রবিশঙ্কর আর অন্নপূর্ণার জীবনে তা হয়নি। তাঁদের দাম্পত্য-কলহ আরও অবনতির দিকে গেছে এবং এর পরিণতি ঘটেছে তাঁদের বিচ্ছেদে। বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে অন্নপূর্ণা শপথ করেছিলেন যে জনসমক্ষে তিনি আর কখনো সুর পরিবেশন করবেন না। কিন্তু এত বড় আত্মত্যাগের পরও তাঁর সংসার টেকেনি।

রবিশঙ্কর অবশ্য এ ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন কথা বলেছেন। টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘বিয়ের পর আমার সঙ্গে বাজাতে ওকে অনেক জোড়াজুড়ি করেছি। কিছু অনুষ্ঠানও করেছি আমরা…তবে এরপর থেকে সে আর একা অনুষ্ঠান করতে চাইত না। সে সব সময় চাইত আমার সঙ্গে বসে বাজাতে। তারপর আমরা যখন আলাদা হয়ে গেলাম তখন তো ও অনুষ্ঠান করাই ছেড়ে দিল…সে হয়তো দর্শকের মুখোমুখি হতে চাইত না, হয়তো নার্ভাস লাগত ওর, কিংবা অন্য কিছুও থাকতে পারে এর পেছনে। তবে যা-ই থাকুক না কেন, সে অনুষ্ঠান করা বন্ধ করেছে তার নিজের ইচ্ছায়। এটা খুব আফসোসের একটা ব্যাপার, কারণ ও অসাধারণ এক সুরস্রষ্টা।’ এ ব্যাপারে রবিশঙ্করের ছাত্র মদনলাল ব্যাসের, যিনি ৩৬ বছর ধরে দ্য নবভারত টাইমস-এর সংগীত সমালোচক হিসেবে কাজ করেছেন, তার ভাষ্য আবার অন্য রকম। ‘কনসার্ট শেষ হলে লোকজন রবিশঙ্করের চেয়ে অন্নপূর্ণাকেই ছেঁকে ধরত বেশি। এটা পণ্ডিতজির পক্ষে মানা কঠিন হতো। রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর জুড়ি ভালো হয়নি। তিনি অসামান্য এক প্রতিভা। এমনকি তাঁর বাবা, যিনি ছিলেন আপসহীন, ক্ষমাহীন এক গুরু, তাঁকে মূর্তিমতী সরস্বতী বলে ডাকতেন। এর থেকে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে?’

অন্নপূর্ণার সুর দুর্ভাগ্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে। তাঁর অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়ার কথা মনে করতে পারবেন এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। তাঁর বাজানো একটি মাত্র রেকর্ড আছে। সেটা এক দুর্লভ, ব্যক্তিগত রেকর্ডিং। তাঁদের একটি যুগলবন্দী অনুষ্ঠানে দরজার বাইরে রাখা স্পিকার থেকে সেই বাদন রেকর্ড করা হয়েছিল। প্রকাশ্য অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পর রবিশঙ্কর এবং তাঁর বর্তমান স্বামী রুশি পান্ডের বাইরে তৃতীয় যে ব্যক্তিটি সরাসরি অন্নপূর্ণার বাদন শুনেছিলেন, তিনি বিটলস তারকা জর্জ হ্যারিসন। জানা যায়, সত্তরের দশকে বেহালাবাদক ইয়েহুদি মেনুহিনকে নিয়ে ভারত সফরে এসেছিলেন জর্জ হ্যারিসন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের সম্মানে কিছু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মেনুহিন বলেন, তাঁর একটি অসম্ভব আবদার আছে। তিনি অন্নপূর্ণার বাদন শুনতে চান। শ্রীমতী গান্ধী কি সে ব্যবস্থা করতে পারবেন? অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর নিমরাজি হলেন অন্নপূর্ণা। তবে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে না। তিনি যখন রেওয়াজ করবেন, তখন তাঁরা পাশে বসে তা শোনার সুযোগ পাবেন। নির্ধারিত দিনে মেনুহিন যেতে পারেননি। তাঁর পরিবারের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে দেশে রওনা হতে হয়েছিল। একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে হ্যারিসন তাঁর বাদন শোনেন।

রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার জীবনে ছেলে শুভর আগমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুভর পুরো নাম শুভেন্দ্র শঙ্কর। ১৯৪২ সালের ৩০শে মার্চ তার জন্ম। জন্মের আট সপ্তাহের মধ্যে এক জটিল রোগ ধরা পড়ল তার। অন্ত্রের নালিতে প্রতিবন্ধকতার জন্য খুবই বিরল ধরনের, যন্ত্রণাময় ব্যথা হতো। মাস খানেকের মধ্যেই ছেলেটি সেরে উঠল। কিন্তু এক নতুন উপসর্গ দেখা দিল। ছেলেটি সারা রাত কাঁদত। রবিশঙ্করের আত্মজীবনী থেকে জানা যাচ্ছে, রোজ ১০ ঘণ্টার বেশি সেতার সাধনার পরে এই কাঁদুনে শিশুকে নিয়ে সারা রাত জেগে থাকার বিড়ম্বনা থেকেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম টানাপড়েন শুরু হয়েছিল। রবিশঙ্কর লিখেছেন, ‘এ সমস্যার কারণে রাত-জাগা অভ্যেস হয়ে গেল শুভর। এটা এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলল। আমি খেয়াল করলাম, অন্নপূর্ণার ব্যক্তিত্ব দিন দিন বদলে যাচ্ছে। আমাদের দুজনেরই শক্তিক্ষয় হচ্ছিল খুব। মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছিল আমাদের দুজনেরই। ওই সময়টাতে তুচ্ছ কারণে আমার মেজাজ বিগড়ে যেত। দুজনে একসঙ্গে রেগে উঠতাম। আমি আগে বুঝতে পারিনি, কিন্তু এবার খেয়াল করলাম, ও ঠিক ওর বাবার মেজাজ পেয়েছে। ও আমাকে প্রায়ই বলত, ‘তুমি শুধু সংগীতের জন্য আমাকে বিয়ে করেছ! আমাকে তুমি ভালোবাসো না! তোমার জন্য তো অন্য সুন্দরীরা আছে!’ অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই ওর খুব হিংসা হতো। যখনই আমি অন্য কোনো শহর থেকে অনুষ্ঠান করে ফিরতাম সেখানে আমার কোনো প্রেম আছে বলে আমাকে দুষত। এটা ওর অবসেশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’

রবিশঙ্করের বর্ণময় জীবনে ঝোঁকই ছিল নিত্যনতুনে। বর্ণময় জীবনসাগরে ঢেউয়ের মতো অবিরত আসা নারীদের কথা, তাঁদের সঙ্গপ্রিয়তার কথা রবিশঙ্কর কখনও গোপন করেননি। আত্মজীবনী ‘রাগমালা’-য় লিখেছেন, ‘নিত্যনতুনের প্রতি একটু ঝোঁক ছিল আমার।’ কতকটা রসিকতার ঢঙেই রবিশঙ্কর আত্মজীবনীতে বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, আমি একেক জায়গায় একেক জন নারীর প্রেমে পড়েছি। এটা অনেকটা ওই প্রতিটি বন্দরে নাবিকের একজন করে মহিলা থাকার মতো। আবার আমার ক্ষেত্রে কখনও কখনও একটি জায়গায় একের অধিক নারী।’ রবিশঙ্কর নিজেই স্বীকার করেছেন, ১৯৪১-এ বিয়ে করা অন্নপূর্ণার প্রেমে সেভাবে পড়েননি তিনি, যদিও অন্নপূর্ণা গভীরভাবে ভালোবাসতেন তাঁকে। কমলা শাস্ত্রীর সঙ্গে রবিশঙ্করের সম্পর্ক যখন একটা আকার নিচ্ছে, সেই সময়েই রেগেমেগে প্রথম বাপের বাড়ি চলে যান অন্নপূর্ণা। ফাটলের সেই শুরু, তারপর চিরতরে ভাঙন। বোম্বেতে তাদের দাম্পত্য-সংকট চরমে পৌঁছাল যখন অন্নপূর্ণা আবিষ্কার করলেন, নৃত্যশিল্পী কমলা শাস্ত্রীর সঙ্গে রবিশঙ্করের প্রেম চলছে। মর্মাহত অন্নপূর্ণা ছেলে শুভকে নিয়ে মাইহারে বাবার বাড়ি চলে যান। চিত্রপরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে কমলার বিয়ে হওয়ার পরই কেবল তিনি বোম্বেতে ফিরে আসেন। কিন্তু রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। ১৯৫৬ সালে দুই বছরের জন্য দূরে চলে যান তিনি। ১৯৬৭ সালে তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর আত্মজীবনীগ্রন্থ রাগ-অনুরাগেও নিজের জীবনসঙ্গিনী এবং প্রেমিকাদের কথা বলেছেন অকপটে। জানা যায়, প্রথম সন্তান শুভর জন্ম হয়। এরপর নানা কারণে, রেওয়াজ, বাড়তি উপার্জন, সংসার এবং কমলার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে অন্নপূর্ণার সঙ্গে রবির সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং ১৯৬৭ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে।

‘একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে’- এই সৃষ্টি যে শুধু শৈল্পিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ব্যাপ্তি যে আরও বিশাল, যা কিনা অনায়াসে ছুঁয়ে যেতে পারে বিশ্ব মানবতার মমতাময় আঁচল, তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ যেমন সুরসম্রাট ও সেতারের জাদুকর পণ্ডিত রবিশঙ্কর, তেমনি নীরব সাধিকা অন্নপূর্ণা। ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সুরের মায়ার খেলায় তারা আমাদের মাঝে চিরদিন শ্রদ্ধেয়জন হিসেবেই সম্মানিত থাকবেন। সংগীতের দুনিয়ার অনন্য এই দুই নক্ষত্র ঐতিহ্যধর্মী ধ্রূপদী সংগীতের মাধ্যমেই রসিকজনের মনে সতত সুরের ধারায় জাগ্রত থাকবেন। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না…

তথ্য – সংগ্রহ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: