আজ একুশে পদকধারী কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান এর ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী…

কবি সাহিত্যানুরাগী বিবেকবান মহা পুরুষেরা বলে গেছেন মানুষ বাচেঁ তার তার কর্মের দ্বারা বয়সের দ্বারা নয়। অনেকে আছে অনেক বছর পৃথিবীর আলো ছায়ায় থেকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে কিন্তু মানুষ তাকে মনে রাখেনি। আবার মাত্র একুশ বছর বয়সের কবি সুকান্তকে ইতিহাস মনে করে। মনে করে বাংলার সকল শ্রেনীর মানুষ। এমন এক গুনী মানুষ একুশে পদকধারী কবি, গীতিকার ও বেতার ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান। ১৯১৪ সালের ১৮ অক্টোবর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন প্রামানিক, আর মাতার নাম সবুরুন নেছা। গড়াই নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে সব সময় মোহিত করে রাখত। ১৯২৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান। উচ্চশিক্ষা লাভের ভাগ্য না থাকায় প্রবল ইচ্ছা ও অণুসন্ধিৎসার ফলে বিভিন্ন বিষয়ক পুস্তকাদি নিজের বাড়িতে এনে পাঠ করে তিনি একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। এই নজির একমাত্র তিনি নিজেই। তার পর ১৯৩১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি গ্রামের এজহার শিকদারের মেয়ে ফজিলাতুন নেছাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। তিনি ছিলেন ৩ ছেলে ৪ মেয়ের জনক কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বেতারের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত এবং পরে নিয়মিতভাবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারে চাকরিতে বহাল ছিলেন। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত দৈনিক পয়গামের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩৪ সালে তিনি তার পিতামহ চাঁদ প্রামানিকের নামে হরিপুর গ্রামে গড়ে তোলেন চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইয়ের খোঁজে আসতেন এই পাঠাগারে।

তিনি একাধারে কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়ার নদীয়া ফুড কমিটির সেক্রেটারি, বেঞ্চ অ্যান্ড কোর্ট ডিভিশনের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যের পদও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আজিজুর রহমানের কিছু পরিচয় আছে। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’রও সম্পাদক ছিলেন তিনি। জানা যায় কবি আজিজুর রহমানই প্রথম তার জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কুষ্টিয়া ইতিহাসের বহু মূল্যবান তথ্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন; কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় তিনি কুষ্টিয়ার ইতিহাস রচনা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। গীতিকার হিসেবে কবি আজিজুর রহমান এদেশের এক বিরল প্রতিভা ছিলেন। ঢাকার প্রায় প্রখ্যাত সুরকাররা যেমন আজিজুর রহমানের গানে সুর দিয়েছেন তেমন তাঁর গানও গেয়েছেন খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পীই। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, আগুন্তক প্রভৃতি ছায়াছবিতে তিনি গান রচনা করেছেন। প্রধানত গানের ফসলেই তার শিল্পের গোলা ভরেছে। ১৯৫৪ সালে কবি আজিজুর রহমান ঢাকা বেতারে গীতিকার হিসেবে অনুমোদন পান। বেতারের সাথে যোগাযোগ কবি আজিজুর রহমানের সাহিত্যিক জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কবি আজিজুর রহমান কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও গান রচনার মধ্যে তার প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। তিনি প্রায় ৩ হাজার গান লিখেছেন, যা আজও আমাদের দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ঢাকায় গিয়ে তিনি কবি ফররুখ আহমদের সহায়তায় বিভিন্ন শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হন। এসময় কবি ফররুখ আহমদ তাকে ঢাকা বেতারে নিয়ে যান। কবি আজিজুর রহমান প্রায় ৩ হাজারের অধিক গান লিখেছেন। তার মধ্যে জনপ্রিয় গানগুলো হলো –

১। ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে,
২। কারো মনে তুমি দিও না আঘাত,
৩। সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে ,
৪। আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা,
৫। নাই বা তুমি এলে,
৬। পৃথিবীর এই পান্থশালায়,
৭। হায় পথ ভোলা কবি,
৮। আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি,
৯। বুঝি না মন যে দোলে বাঁশিরও সুরে,
১০। দেখ ভেবে তুই মন,
১১। আপন চেয়ে পর ভালো,
১২। পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে প্রভৃতি।

তার পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৭৮ সালের পর কবির হাতে তেমন আর কলম ওঠেনি। একাকী বিছানায় শুয়ে দিন কেটেছে তার। সে সময় তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি, জলের লেখায় বালুকাবেলায়, মিছে এঁকে গেলে ছবি’। এটাই ছিল কবির লেখা শেষ গান। অর্থাভাবে চিকিৎসাও তার ভাগ্যে জোটেনি। ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কবি আজিজুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাকে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ঢাকার পিজি হাসপাতালে। এর ৩ দিনের পর ১২ই সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজ তার ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা এই গুনী মানুষটির জন্য দোয়া করি। পৃথিবীটা যে ভাবে নিজের সাহিত্যের ও পান্ডিত্তের মাধ্যেমে সাজিয়ে গেছেন সাজাতে চেষ্টা করেছেন উপরওয়ালাও যাতে তার কবরটাকে সেই ভাবে সাজিয়ে দেন। সঙ্গীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে তার রুহের মাঘফেরাত কামনা করি। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: