গানের পিছনে গল্প – যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে…

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে,
তবে একলা চলো রে”,

“একলা চলো রে” জনপ্রিয় একটি গান, সাধারণভাবে পরিচিত। আসুন জেনে নেই অসাধারণ এই গানটির পিছনের গল্প। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একক রেকর্ড সংখ্যা ৩৫৭ এ্যালবাম থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে তথ্য সূত্রে জানা যায় এবং ১৯০৮ সালের মধ্যে ফরম্যাট সিলিন্ডার রেকর্ড লেবেল এইচ. বসু স্বদেশী রেকর্ড এ্যালবামটি বর্তমানে হারিয়ে গেছে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ভাণ্ডার পত্রিকায় ‘একা’ শিরোনামে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গানটি হরিনাম দিয়ে জগত মাতালে আমার একলা নিতাই রে, নামক একটি জনপ্রিয় মনোহরশাহি ঘরানার বাংলা ধাপকীর্তন দ্বারা প্রভাবিত ছিল বলে জানা যায়। অপরের সহায়তা না থাকলেও বা অপরের দ্বারা ত্যাজ্য হলেও শ্রোতা যাতে তাঁর যাত্রা বন্ধ না করেন, তার অনুপ্রেরণা হিসেবে এই গান রচিত হয়। মহাত্মা গান্ধী এই গানের দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত ছিলেন এবং এটিকে তিনি তাঁর অন্যতম প্রিয় গান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে জানা যায়।
একলা চলো রে গানটির কথা নিম্নরূপ-

যদি কেউ কথা না কয়, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয় –
তবে পরান খুলে
ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে।

যদি সবাই ফিরে যায়, ওরে ওরে ও অভাগা,
যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায় –
তবে পথের কাঁটা
ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা দলো রে।

যদি আলো না ধরে ওরে ওরে ও অভাগা,
আলো না ধরে যদি ঝর বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার ধেয়ে ঘরে –
তবে বজ্রানলে আপন বুকের পাঁজরা জ্বালিয়ে একলা জ্বলো রে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একলা চলো রে গানটি গিরিডি শহরে লিখেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বদেশী যুগে রবীন্দ্রনাথ দ্বারা রচিত ২২টি প্রতিবাদী সঙ্গীতের মধ্যে এই গানটি একটি ছিল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে আমার সোনার বাংলা গানটির মতোই এই গানটিও বঙ্গভঙ্গের সময়কালে একটি বিখ্যাত প্রতিবাদী গান রূপে জনমানসে বিখ্যাত হয়।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ভাণ্ডার পত্রিকায় একা শিরোনামে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে এই গানটি তাঁর বাউল নামক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে গানটিকে গীতবিতানের স্বদেশ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী এই গানের সুর দেন, যা ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মাসে প্রকাশিত সঙ্গীত-বিজ্ঞান প্রকাশিকা নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ও পরে স্বরবিতানের ৪৬তম খণ্ডে স্থান পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ এবং ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এইচ. বসু স্বদেশী রেকর্ড থেকে স্বয়ং এই গান রেকর্ড করেন, যা বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামোফোন কোম্পানী অব ইন্ডিয়া থেকে হরেন্দ্রনাথ দত্ত (রেকর্ডে সংখ্যা পি৫২৭০) এবং হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে অমলা দত্ত, নন্দিতা দেবী, সুধীন দত্ত এবং শান্তিদেব ঘোষ (রেকর্ডে সংখ্যা এইচ ১৯১) এই গানের রেকর্ড করেন। ১৯৪৮ (রেকর্ড সংখ্যা এন২৭৮২৩) ও ১৯৮৪ (রেকর্ড সংখ্যা পিএসপিএল ১৫০১) খ্রিস্টাব্দে বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়ক সুচিত্রা মিত্র এই গান দুইবার রেকর্ড করেন।

২০০৪ খ্রিস্টাব্দে নেতাজি সুভাস চন্দ্র বোস: দ্য ফরগটেন হিরো নামক হিন্দি চলচ্চিত্রে সুরকার এ. আর. রহমান এই গানটির সঙ্গে কিছু হিন্দী কথা মিলিয়ে নতুন করে সুরোরোপ করেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে কাহানি নামক একটি হিন্দি চলচ্চিত্রে এই গানটি ব্যবহৃত হয়, যেখানে বিশাল-শেখরের সঙ্গীত পরিচালনায় অমিতাভ বচ্চন গানটিতে কন্ঠ দেন। সবসময় সঙ্গীতাঙ্গন এর পাশে থাকুন পড়েন এবং জানুন সঙ্গীতের নানা অজানা কথা। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: