একতারা-র পরিচয়…

‘একতারা তুই দেশের কথা
বলরে এবার বল
আমাকে তুই বাউল করে
সঙ্গে নিয়ে চল।
জীবন মরণ মাঝে
তোর সুর যেনো বাজে।
একতারা তুই দেশের কথা
বলরে এবার বল’

একতারার পরিচয়ঃ একতারা হলো জাতীয় বাঙালি লোকবাদ্যযন্ত্র। এক তার বিশিষ্ট বলে একে একতারা নামে অভিহিত হয়। একসময় এর নাম ‘একতন্ত্রী বীণা’ ছিল বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় যে বাদ্যযন্ত্রটি আদি ও অকৃত্রিমভাবে বহমান রয়েছে তার নাম একতারা। এই বাদ্যযন্ত্রটির বাদন ভঙ্গি আর সুরের মূর্ছনায় আজো খুঁজে পাওয়া যায় মাটির ঘ্রান। এখনো এদেশের গ্রাম-গ্রামান্তর আর নগরে পাড়ি জমানো নগর বাউলদের কাছে শুনতে পাওয়া যায় এ বাদ্যযন্ত্রের বোল। আর মাত্র একটি তারের তৈরি এ বাদ্যযন্ত্রটি দিয়ে বাউল সাধকেরা সুরের যে বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।

একতারার ইতিহাসঃ একতারা আবিষ্কারের ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় প্রায় ১০০০ বছর ধরে এর ব্যবহার হয়ে আসছে। আর এ যন্ত্রটি যে সম্পূর্ণ আমাদের দেশের আবহতেই তৈরি হয়েছে তা এর উপকরণের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। আবার অনেক বাউল শিল্পী মনে করেন, মরমি সাধক লালন শাহের কালেই একতারার জন্ম। তারা মনে করেন ফকির লালন শাহ তার মনের ভেতর উদয় হওয়া কথাগুলো ভক্তদের মধ্যে প্রচারের সময় কথাগুলো আরো মধুময় করে তোলার জন্য কথার ভাঁজে ভাঁজে তালের অনুভব থেকেই একতারার জন্ম। তবে একতারার জন্ম যেখানে বা যখনই হোক না কেন এই যন্ত্র আমাদের দেশের কথা, দেশের মাটি ও মানুষের কথা বলে। বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ও দেশীয় পরিচয় বহন করে এই একতারা। আমরা যে বাঙ্গালী তার পরিচয় এই যন্ত্র।

একতারা তৈরির উপকরণঃ একতারা তৈরির জন্য লাউ, কুমড়া, মোটা বাঁশ বা কাঠ, নারিকেলের খোল কিংবা পিতলের পাতলা আবরণ যাই ব্যবহার করা হোক না লক্ষ্য রাখতে হবে এটি যেন উপরে-নিচে খোলা এবং বৃত্তাকার হয়। বৃত্তাকারের খোলা মুখের ব্যাস সাধারণত ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি হয়। প্রায় ৩ ফুট লম্বা বিশেষ এক ধরনের মুলি বাঁশের উপরের দিকে গিঁট রেখে নিচের দিকে কাটতে হবে। এমনভাবে ফাঁড়তে হবে যাতে বাঁশ বা কঞ্চিটি চিমটা আকারের হয়। বিশেষ ধরনের মুলি বাঁশ বা কঞ্চির মাঝ দিয়ে কাঠের একটি কাঁন (কাঠ দিয়ে তৈরি এক ধরনের কাঠি) তৈরি করতে হবে। চিমটার নিচের দিকটি লাউ, মোটা বাঁশ, কাঁঠ বা নারিকেলের খোল কিংবা কাঁসার পাতলা বৃত্তাকারের খোলটির দু’প্রান্তে শক্ত করে বাঁধতে হবে। ওই খোলটির তলায় চামড়া দিয়ে ঢেকে ফেলতে হবে। চমড়াটি শুকিয়ে এলে চামড়ার মধ্যে সূক্ষ্ম ছিদ্র করতে হবে। সেই ছিদ্রটির মধ্য দিয়ে একটি সরু পিতল বা লোহা কিংবা ইস্পাতের তার ঢুকিয়ে দিয়ে সেই তারের একটি মাথা দু’পাশে দেওয়া বিশেষ মুলি বাঁশ অথবা কঞ্চির মাঝে থাকা কাঁনের সঙ্গে বাঁধতে হবে। কাঁন দিয়ে তারটি টান বা ঢিলা করা হয়। দুই পাশে থাকা কঞ্চিতে চার আঙুলে ধরে এক আঙুল দিয়ে একতারায় সুর তোলা হয়। এভাবেই কাজ করে একতারা।

বর্তমানে একতারর ব্যবহার আর নেই। হারিয়ে গেছে আধুনিক যুগের গর্বে। বাউলরা আজ আর গায়না তাদের দেহতাত্ত্বিক গান। তাই একতারা আজ সুর ছাড়া তাল ছাড়া শব্দহারা নির্বাক এক যন্ত্র। যা শুধু ইতিহাস হয়ে থাকবে যাদুঘরে। আজ এই যন্ত্র আমাদের সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়না। আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে এখন সঙ্গীত চর্চা হয়। কিন্তু এতো সহজে এসব যন্ত্র হারিয়ে যেতে দিলে আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে যাবো। আমরা ভুলে যাবো আমাদের সোনালী অতিতের কথা। যে অতিত নিয়ে গর্ব করা যায়। তাই এই ধরনের যন্ত্র বাচিঁয়ে রাখতে সবার প্রতি সদয় দৃষ্টি বিবেচনা করবো। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: