বিশ্বশিল্পী ভূপেন হাজারিকা এর ৯১তম শুভ জন্মদিন আজ…

একজন স্বনামধন্য কন্ঠ শিল্পী ও ভারতীয় সঙ্গীত জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বশিল্পী খেতাপ প্রাপ্ত ভূপেন হাজারিকা। এই কিংবদন্তিতুল্য কণ্ঠশিল্পীর জন্ম ভারতের আসামে ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। আজ তার ৯১তম জন্মবার্ষিকী। অত্যন্ত দরাজ গলার অধিকারী এই কণ্ঠশিল্পীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। অসমিয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে গানের জগতে প্রবেশ করেন তিনি। পরবর্তীকালে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গান গেয়ে ভারত এবং বাংলাদেশে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর পিতার নাম নীলকান্ত হাজারিকা, মায়ের নাম শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। পিতা-মাতার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়। তাঁর অন্য ভাই-বোনেরা হলেন – অমর হাজারিকা, প্রবীণ হাজারিকা, সুদক্ষিণা শর্ম্মা, নৃপেন হাজারিকা, বলেন হাজারিকা, কবিতা বড়ুয়া, স্তুতি প্যাটেল, জয়ন্ত হাজারিকা ও সমর হাজারিকা।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ভূপেন হাজারিকা কানাডায় বসবাসরত প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন। একমাত্র সন্তান তেজ হাজারিকা নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। তিনি ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বি.এ. এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ. পাস করেন। ১৯৫২ সালে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ-দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের মৌলিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব”। ড. ভূপেন হাজারিকা তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর ও কোমল ভঙ্গির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন। তিনি মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই গান লেখে সুর দিতে থাকেন। আসামের চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সূচনা হয় এক শিশুশিল্পী হিসেবে। ১৯৩৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি অসমীয়া ভাষায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা পরিচালিত ইন্দুমালতী ছবিতে “বিশ্ববিজয় নওজোয়ান” শিরোনামের একটি গান গেয়েছিলেন। পরে তিনি অসমীয়া চলচ্চিত্রের একজন নামজাদা পরিচালক হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ, আসাম ও তার প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক ও বিশাল। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন এবং অনেক গান গেয়েছেন। অবশ্য এসব গানের অনেকগুলোই মূল অসমীয়া থেকে বাংলায় অনূদিত। ভূপেন হাজারিকার গানগুলোতে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, ভারতীয় সমাজবাদের, জীবন-ধর্মীয় বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এছাড়াও, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী সুরও উচ্চারিত হয়েছে বহুবার।

তার গানগুলোর মধ্য, আজ জীবন খুঁজে পাবি, আমি এক যাযাবর, আমায় ভুল বুঝিস না, একটি রঙ্গীন চাদর, ও মালিক সারা জীবন, গঙ্গা আমার মা, প্রতিধ্বনি শুনি, বিস্তীর্ণ দুপারে, মানুষ মানুষের জন্যে, সাগর সঙ্গমে, হে দোলা হে দোলা, চোখ ছলছল করে ইত্যাদি খুব জনপ্রিয়।
বছর চলচ্চিত্র অংশগ্রহণের মাধ্যম নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী সুরকার পরিচালক প্রযোজক চিত্রনাট্যকার অভিনেতা।
তার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মাঝে –
১৯৩৯ সালে ইন্দ্ৰমালতী।
১৯৪৮ সালে সিরাজ।
১৯৫৫ সালে পিওলি ফুকন।
১৯৫৬ সালে এরা বাটর সুর।
১৯৫৮ সালে মাহুত বন্ধু রে।
১৯৬১ সালে শকুন্তলা।
১৯৬৪ সালে প্রতিধ্বনি।
১৯৬৪ সালে কা স্বরিতি।
১৯৬৬ সালে লটিঘটি।
১৯৬৯ সালে চিকমিক বিজুলি।
১৯৭৩ সালে তিতাস একটি নদীর নাম।
১৯৭৩ সালে আরোপ।
১৯৭৪ সালে ফর হুম দ্য সান শাইনস।
১৯৭৫ সালে চামেলি মেমসাহেব।
১৯৭৬ সালে রুপ কোঁঅর জ্যোতিপ্রসাদ আরু জয়মতী।
১৯৭৬ সালে মেরা ধরম মেরি মা।
১৯৭৭ সালে থ্রু মেলডি অ্যান্ড রিদম।
১৯৭৭ সালে সীমানা পেরিয়ে।
১৯৭৯ সালে মন-প্রজাপতি।
১৯৭৯ সালে দেবদাস।
১৯৮২ সালে অপরূপা।
১৯৮৬ সালে স্বীকারোক্তি।
১৯৮৬ সালে এক পল।
১৯৮৮ সালে সিরাজ।
১৯৯৩ সালে রুদালী।
১৯৯৩ সালে প্রতিমূর্তি।
১৯৯৭ সালে দো রাহেঁ।
১৯৯৭ সালে দর্মিয়াঁ: ইন বিটুইন।
১৯৯৮ সালে সাজ।
২০০০ সালে গজগামিনী।
২০০১ সালে দমন: আ ভিক্টিম অফ মেট্রিয়াল ভায়োলেন্স।
২০০৩ সালে কিউঁ?।
২০০৬ সালে চিঙ্গারি।

২৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ‘চামেলী মেমসাহেব’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ‘অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন’ পুরস্কার ১৯৭৯ সালে। অসম সরকারের শঙ্করদেব পুরস্কার পান ১৯৮৭ সালে। দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান ১৯৯২ সালে।
জাপানে এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুদালী ছবির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন। তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান। ১৯৯৩ সালে পান পদ্মভূষণ। ২০০১ সালে অসম রত্ন। ২০০৯ সালে সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার।
১৯৯৩ সালে ড. ভুপেন হাজারিকা অসম সাহিত্য সভার সভাপতি হন।
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সালে অল আসাম স্টুডেন্টস্‌ ইউনিয়নের উদ্যোগে গুয়াহাটির দীঘলিপুখুরী জিএসবি রোডে একটি স্মারক ভাস্কর্য তৈরী করে। আসামের ভাস্কর্যশিল্পী বিরেন সিংহ ফাইবার গ্লাস ও অন্যান্য পদার্থ সহযোগে চমকপ্রদ ‘ড. ভুপেন হাজারিকা ভাস্কর্য’ তৈরী করেন।
ড. ভূপেন হাজারিকাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানী হাসপাতাল ও চিকিৎসা গবেষণা ইন্সটিটিউটের আইসিইউতে ৩০ জুন, ২০১১ সালে ভর্তি করা হয়। অতঃপর তিনি কিডনী বৈকল্যসহ বার্ধক্যজনিত সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ৫ নভেম্বর, ২০১১ সালে স্থানীয় সময় বিকাল ৪:৩৭ ঘটিকায় ধরাধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই গুণী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। আমরা তার বিদেহি আত্নার শান্তি কামনা করি। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: