শেখড়ের সন্ধানে আলকাপ গান…

আলকাপ গান পালাগানের একটি শাখা। সাধারণত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ এবং বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে এ গানের প্রচলন বেশি। আলকাপ একটি দলীয় ও মিশ্র প্রকৃতির সঙ্গীত প্রদর্শন। এতে নাচ, গান, কথা, ছড়া, অভিনয় ইত্যাদির মিশ্রণ আছে। দশ-বারোজন শিল্পী নিয়ে আলকাপের দল গঠিত হয়। দলের প্রধানকে বলা হয় সরকার, ওস্তাদ বা মাস্টার। অন্যদের মধ্যে থাকে দু-একজন সঙদার, দু-তিনজন ছোকরা এবং বাকিরা দোহার ও বাদ্যকর। রাত্রিবেলায় উন্মুক্ত মঞ্চে আলকাপের অনুষ্ঠান বসে। বিদ্যুতের বিকল্পে হ্যাজাকের আলোয় প্রায় রাতভর এ অনুষ্ঠান চলে। মঞ্চের চারপাশে দর্শকরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে গান শোনে, আর দলের সদস্যদের মঞ্চে যাতায়াতের জন্য থাকে একটি সরু পথ।

আলকাপ গানের প্রধান দুটি অংশ – গান গাওয়া ও বোল বা ছড়া কাটা। গানের বিষয়বস্তু সাধারণত রাধাকৃষ্ণলীলা ও অন্যান্য পৌরাণিক কথা, আর ছড়ার বিষয়বস্তু সমকালের সামাজিক ঘটনা। ছড়া কাটায় অনেক সময় দর্শকরাও অংশগ্রহণ করে। আলকাপের মূল আকর্ষণ ছোকরা নাচ ও গান। যাত্রা-পদ্ধতির সংলাপ, গান ও অভিনয়ের মাঝে মাঝে দর্শককে বিশ্রাম ও আনন্দ দেওয়ার জন্য ছোকরারা নটীবেশে আসরে প্রবেশ করে। সুদর্শন বালকদের তালিম দিয়ে ছোকরা বানানো হয়। তারা খেমটা ও ঝুমুর জাতীয় নাচ-গানে বেশ দক্ষ। গ্রামের তরুণ ও যুবকদের মধ্যে ছোকরারা এক ধরনের মাদকতা এনে দেয়। তাদের চিত্তবিনোদনের মূল উৎসই ছোকরারা, তাই তারা রাতের ঘুম ও আরাম-আয়েস ত্যাগ করে আলকাপ গান শুনে রাত কাটিয়ে দেয়। সঙদাররাও ভাঁড়ামির মাধ্যমে লঘু হাস্যরস পরিবেশন করে দর্শকদের আনন্দ দিয়ে থাকে। এক কথায় আলকাপের পুরো আয়োজনই হলো রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে গ্রামের তরুণ সমাজকে আনন্দ দান করা।

আলকাপ গানের মঞ্চের উপরে থাকে দোহার এবং নিচে একপাশে থাকে বাদকদল। ঢোলক, হারমোনিয়াম, ডুগি, তবলা, খঞ্জনি, বাঁশি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এতে ব্যবহূত হয়। যন্ত্রীগণ সার্বক্ষণিক তাদের নির্দিষ্ট স্থানে বসে থাকে। প্রথমে সরকার এসে বন্দনা গেয়ে ও ছড়া কেটে পালার মূল বিষয়ের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরে তিনি ও গায়েন আলকাপ শুরু করেন এবং দোহাররা ধুয়া ধরে তাদের সাহায্য করে। আলকাপ গান ও যাত্রাপালার মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে। যাত্রা হলো অভিনয়প্রধান, আর আলকাপ নাচ-গান-তামাসা- প্রধান। যাত্রায় নিয়মিত পালা, চরিত্র, সংলাপ ও অভিনয় থাকে, কিন্তু আলকাপে সংলাপ ও অভিনয় সুনির্দিষ্ট কোনো আঙ্গিক নয়। উপস্থাপনীয় বিষয় সম্পর্কে একটা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে আসরের চাহিদা অনুযায়ী শিল্পীরা তা ফুটিয়ে তোলে। আলকাপের বিষয়বস্তুতে হাল্কা রঙ্গ-ব্যঙ্গ এবং নাচে-অভিনয়ে শরীরী আবেদন থাকায় এ গান সাধারণত লোকালয় থেকে দূরে মাঠে-ময়দানে অধিক রাতে পরিবেশিত হয়। বর্তমানে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ইত্যাদি বিনোদনের মাধ্যম গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় আলকাপ গানের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে এবং তা ক্রমশ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আমরা আমাদের গাও গ্রামের গানের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা নিয়ে কিছু কথা কিছু গানের আয়োজন করতে পারি যাতে একেবারে মুছে না যায়। সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ঠদের প্রতি এ আহবান জানাই। – মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: