‘কেমনে ভুলিবো আমি’ বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান – মীর শাহ্‌নেওয়াজ…

বাংলাদেশের সুরের জাদুকর বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান।

শাহ আবদুল করিমের গানে বৈষ্ণব ধারার মীড়াশ্রয়ী সুরের ঝংকারের সঙ্গে সুফী ধারার গতিপ্রধান ছন্দের সম্মিলন ঘটেছে।

 

শাহ আব্দুল করিম রচিত পাঁচশতাধিক গানে যেমন সিলেটের ঐতিহ্য ও শিকড়ের সন্ধান মেলে তেমনি বৈষ্ণব-সুফী ধারার সাধন-ভজনের পরিচয়ও পাওয়া যায়। একদিকে বাস্তবজীবনের কঠিন কঠোর পথপরিক্রমা অন্যদিকে জগত-জীবন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃষ্টির রহস্য নিয়ে কৌতূহল শাহ আব্দুল করিমকে করে তুলেছে বাউল মরমী।

এর একটি ঐতিহ্যময় প্রেক্ষাপট আছে। বৃহত্তর সিলেটের লৌকিক ঐতিহ্যে মূলত দু’টি ধারা প্রবহমান। একটি বৈষ্ণব, অপরটি সুফী। সুরের ছন্দ ও ভঙ্গিতে বৈষ্ণব ধারাটি হলো বিলম্বিত মীড় আশ্রয়ী এবং লীলায়িত, অনুগামী বাদ্যযন্ত্র একতারাযুক্ত লাউয়া বা লাউ। সুফী ধারাটির সুর প্রধানত গতিপ্রধান, কাটাকাটা ঝটকা দেওয়া ত্রিমাত্রিক ছন্দ, অনুগামী যন্ত্র দোতারা ও খমক। বৈষ্ণব ধারার লীলায়িত চলনের মধ্যে সুফী ধারাটি নিয়ে এলো এক গভীর আবেগ। এই দু’টি ধারারই প্রগতিশীল সামাজিক মুখ্য ভূমিকা ছিল হিন্দু-মুসলমানের এক মিলিত ভাবধারা, এক মিলিত সংস্কৃতি গড়ে তোলার। হিন্দুর গুরু, মুসলমানের মুর্শিদ, হিন্দুর রাধাকৃষ্ণ, মুসলমানের আশিক-মাশুক মিলে মিশে গেছে। এই যুগল ধারার যোগ্য উত্তরসূরি বাউল শাহ আব্দুল করিম যাঁর গানে তারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পূর্বসূরি মরমি সাধকরা তত্ত্বকথা বলে গেছেন। সমাজে সাম্য সৃষ্টির আন্দোলন করেছেন। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন মাত্রার। দেশের, দশের, জনগণের, সমাজের দুঃখ-দুর্দশার কথা তিনি তাঁর রচনায় উল্লেখ করে ভিন্নধর্মী সংগ্রাম করেছেন।

সিলেট বিভাগের ভাটি জেলা সুনামগঞ্জের বাসিন্দা করিমের গানের মধ্যেই তাঁর চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মানুষের কল্যাণ চিন্তার পাশাপাশি মানুষের চিন্তা-চেতনাকে জাগ্রত করাই ছিল যেনো তাঁর গানের কথার মূল উদ্দেশ্য। শুধু সুরের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে বাহবা কুড়িয়ে নেয়ার লক্ষ্য আর সাধারণ গায়কের মতো ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থাকতেন বলেই তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের সাথে তাঁর গভীর পরিচয় ছিল। তাঁর গানের কথা বা ভাষাগুলো তাই প্রমাণ করে। তাঁর গানের মধ্যে সাধারণ মানুষেরই চাওয়া-পাওয়ার সুরই বেজে উঠেছে।

বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত, ‘কানু ছাড়া গীত নাই, রাধা ছাড়া সাধা নাই।’ লোক কবিদের রচিত গানে রাধা আর কৃষ্ণ রূপকছলে বারবার ফিরে আসে নায়ক-নায়িকারূপে। মানবীয় প্রেমের মিলন বিরহ গাঁথা রাই-কালার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়। এর অন্যরূপও আছে। রূপক অর্থে রাই হলেন জীবাত্মা (Human Soul) এবং কালা হলেন পরমাত্মা (Supreme Soul)। বাউল মরমি গানে এই ভাবদর্শনের প্রভাব প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আব্দুল করিমও একই পথের পথিক। করিমের গানে বৈষ্ণব ধারার মীড়াশ্রয়ী লীলায়িত সুরের ঝংকারের সঙ্গে সুফী ধারার গতিপ্রধান, কাটাকাটা ঝটকা দেওয়া ছন্দের সম্মিলন ঘটেছে। যেমন – একটি গানের কথা উল্লেখ করছি –
“কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া
আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা
সখী গো আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা।”

১) কেমনে ভুলিবো আমি I হাবিব ফিচারিং কায়া

২) কেমনে ভুলিবো আমি I ফুয়াদ ফিচারিং তাসফি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: