দৈনন্দিন জীবনের চৌদিকে সঙ্গীত…

বেঁচে থাকার জন্য পেটের ক্ষুধা নিবারণ জন্য যেমন খাদ্য প্রয়োজন তেমনি মন এবং হৃদয়কে সুস্থ সতেজ রাখার জন্যই সঙ্গীতের গুরত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই সুরের পিপাসী।
সঙ্গীতে যেমন সুরে মানুষকে মুগ্ধ করে তেমনি গানের কথা এবং গায়কী মনকে ভরে তোলে। বহু ধাঁচের গানের এই দেশ বাংলাদেশ। প্রেম-ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে মানুষ শোনে আনন্দ বিরহের গান। আবার দেশ প্রেমে মগ্ন হয়ে শোনে দেশাত্মবোধক গান। নিজেকে বুঝার জন্য, নিজের অন্তর শীতল করার জন্য আধ্যাত্মিক লোকজ সঙ্গীতের শ্রোতা আমাদের দেশে বেশী। আবার চোখ বন্ধ করে নিবিড় আরামদায়ক ক্লাসিক গানের শ্রোতা সংখ্যাও কম নয়। বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসে বহু ধরনের গান আমাদের দেশে।

নজরুল সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, আধুনিক গান, চর্যাগীতি, টপ্পা গান, মাদার গান, লোকগীতি, দোহার গান, মনসার গান, মুর্শিদী গান, ধূয়া গান, বারমাসি গান, জারিগান, নৌকা বাইচের গান, কবি গান, যোগীর গান, হাপু গান, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, বারোসা গান, কীর্তন, গজল, ভজন, লালন গীতি, বাইজী গান, পপ, ব্লুজ, মুর্শিদী সহ ইত্যাদি গান মানব জীবনের সঙ্গে সঙ্গীত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের মানসিক বৃত্তি বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা অপরিসীম।

আমাদের সঙ্গীতের একটা গৌরবময় ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস আমাদের দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। সঙ্গীত সেই সংস্কৃতিরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সঙ্গীত শিক্ষা ও সংস্কৃতির আবশ্যকীয় উপাদান। সঙ্গীত আবার নানা উপাদানে সমৃদ্ধ। এ সকল উপাদানে শ্রুতি, স্বর, রাগ, গ্রাম, অলঙ্কার, রস, বর্ণ, ভাব প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত। সংগীতের এ সকল উপদানের মহিমা ও মাধুর্যকে ইতিহাসের নিরীখে জনসাধারণের কাছে পরিবেশন করার জন্যে একদিকে যেমন সঙ্গীত শিল্পীরা অক্লান্তভাবে ফলিত সঙ্গীতের অনুশীলন করছেন, অপরদিকে তেমনি অনুশীলনকারীরা সঙ্গীত-ইতিহাসের বিচিত্র উপাদান সংগ্রহ করছেন এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রচনা করছেন সংগীতের ইতিহাস, সংগীতের ব্যাকরণ, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন। আর এভাবেই রচিত হয়েছে সঙ্গীতের ঔপপত্তিক বা শাস্ত্রীয় রূপ।

আদিম যুগ থেকে ক্রমবিবর্তনের মাঝ দিয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত যে একটা ধারাবাহিকতা সঙ্গীতের ভেতর পাওয়া যায় সেটাই হলো সঙ্গীতের ইতিহাস। মানুষের মন চিন্তা ও ভাবের রাজ্য। তাই মনোবিজ্ঞান বা মনের বিজ্ঞান তথা গঠন, বিকাশ প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে সঙ্গীতানুশীলন সার্থক হয় না। সঙ্গীতের দর্শন সঙ্গীতের স্বর বা শব্দ থেকে উদ্ভূত। তাই সঙ্গীত শ্রেষ্ঠ বিদ্যা। কেননা সঙ্গীত মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর পারে নিয়ে যায় ও শাশ্বত শান্তি দান করে।

সঙ্গীতের স্বরকে আরো বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। স্বর হলো ধ্বনি। ধ্বনি সঙ্গীতের পরিভাষায় নাদ নামে পরিচিত। সঙ্গীতে এই নাদকে বলা হয়েছে, নিয়মি ও স্থির। আন্দোলন থেকে যে মধুর ধ্বনির উত্পত্তি তারই নাম নাদ। যে কোনো নাদ থেকেই কিন্তু সঙ্গীতের সৃষ্টি হতে পারে না। তাই নাদকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কোনো আঘাত ছাড়া যে নাদের সৃষ্টি সেটা হলো অনাহত নাদ। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অনাহত নাদের কোনো প্রয়োজন হয় না। আঘাত দ্বারা উৎপন্ন স্থায়ী শব্দ হলো আহত নাদ। আহত নাদ থেকে সঙ্গীতের সৃষ্টি। নাদের উত্পত্তি সঙ্গীতের ক্রমবিকাশ ধারাবাহিক একটা রূপ লাভ করে। আহত নাদ দু’প্রকার-বর্ণাত্মক ও ধ্বন্যাত্মক। কণ্ঠ দ্বারা গান গাওয়া, আবৃত্তি করা, বই পাঠ করা বর্ণাত্মক নাদ। কোনো বস্তুর দ্বারা কোনো বস্তুর ওপর আঘাত করলে যে নাদের উত্পত্তি হয় তার নাম ধন্যাত্মক নাদ।

সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় স্বরের মাধ্যমে। সঙ্গীতে সাতটি স্বরের প্রচলন রয়েছে। এই স্বরগুলো নির্ধারিত হয়েছে নাদ থেকে। আগেই বলা হয়েছে নাদ হলো ধ্বনি। ধ্বনি বা নাদের উত্পত্তি দুটো বস্তুর সংঘর্ষে বা আঘাতে। তার মানে, কোনো বস্তুর সংঘর্ষ থেকে যে আন্দোলন বা কম্পন হয়, তা থেকে ধ্বনি না নাদের উত্পত্তি।

নাদ থেকে শ্রুতির উদ্ভব। ঝঙ্কার ছাড়া শুধু শব্দের স্বরূপের শ্রবণ থেকে যে নাদের উত্পন্ন হয় সেটা শ্রুতি। সঙ্গীতে বাইশটি শ্রুতি প্রচলিত। শ্রুতিগুলোর মনোরঞ্জনের গুণ রয়েছে। এই শ্রুতিই সঙ্গীতের মূল ভিত্তি। শ্রুতিকে অবলম্বন করেই স্বরের নামকরণ করা হয়েছে। বাইশটি শ্রুতির মধ্যে সাতটি শ্রুতি মুখ্য। এগুলো হলো শুদ্ধ স্বর। সাঙ্গীতিক পরিভাষায় এদের নাম ষড়জ, ঋষভ বা রেখাব, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত, নিখাদ বা নিষাদ। সংক্ষেপে, সা রে গা মা পা ধা নি। এই সাতটি স্বরে বাইশটি শ্রুতি আছে।

নাদের কথা বলতে গিয়ে আন্দোলন বা কম্পনের উল্লেখ করা হয়েছে। দুটো বস্তুর সংঘর্ষের ফলে যখন সেই বস্তু দুটো নিজের জায়গা ছেড়ে উপরে-নিচে বা আশে-পাশে দুলতে থাকে সেটাই হলো আন্দোলন বা কম্পন।
সঙ্গীতকে শাস্ত্রের নিয়ম মেনে চলতে হয়। শাস্ত্রীয় গ্রন্থে সঙ্গীতের পরিচয় লিপিবদ্ধ করা আছে। অর্থাত্ সংগীতকে যে-সকল নির্দিষ্ট নিয়মের ভেতর দিয়ে চলতে হয় সেই নিয়মগুলো সঙ্গীতশাস্ত্রে বিধিবদ্ধ করা আছে।
সঙ্গীতের দুটো রূপ-তত্ত্বীয় বা ঔপপত্তিক ও ক্রিয়াত্মক বা ব্যবহারিক। তত্ত্বীয় শিক্ষার ওপর নির্ভর করে ক্রিয়াত্মক রূপে পারদর্শিতা অর্জন করা যায়। তবে সঙ্গীতের দুটো রূপ আয়ত্ত আনার ব্যাপারে দক্ষতা অর্জন করতে হলে শুধু শাস্ত্র অধ্যয়ন করলেই চলে না, ব্যবহারিক বিদ্যাতেও পারদর্শিতা অর্জন করতেই হবে।

একটি সঙ্গীত সৃষ্টি মহা সাধনার বিষয়। একাধিক ব্যাক্তির পরিশ্রমে একটি সঙ্গীতের জন্ম। তাই প্রত্যেকটি গানই একজন সঙ্গীত স্রষ্টার নিকট সন্তান সমতুল্য। গীতিকবি, সুরকার, কণ্ঠশিল্প কারো ভূমিকাই কম নয়। সুর ছাড়া যেমন কবিতা প্রাণহীন তেমনি সুন্দর একটি কণ্ঠ ছাড়া সব আবিষ্কার বৃথা। আবার সুর কন্ঠ সবই আছে ভাল কথা নেই, গানের কথা আবেগ নেই তাহলে গানটি জীবন পাবেনা। সঙ্গীতে যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীতেরও ভূমিকা কম নয়। খাবারে তৈল, লবন, মসলা ছাড়া যেমন খাবার স্বাদহীন তেমনি যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের ছাড়া গানেরও স্বাদ নেই। সঙ্গীত কোন মেশিন বা বস্তা নয় যে শারীরিক শক্তিতে দশজন মিলে ধরে কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলবে। একটি গানের জন্ম হয় অন্তর থেকে তাইতো সঙ্গীত কোটিকোটি মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করে, শ্রোতার অন্তরে বেঁচে থাকে। সুখে দুঃখে, প্রেরণা স্বপ্ন প্রেমে সঙ্গীত সবসময় আমাদের কাছের বন্ধুর মতো। একটি ভাল গান সারাজীবনের পথ চলার সঙ্গী হতে পারে। – মোহাম্মদ আমিন আলীফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: