চলে গেলেন শুয়াচান পাখি…

শুয়াচান পাখি
আমি ডাকিতাছি তুমি
ঘুমাইছ নাকি?

গানের কথাগুলোর মতোই প্রতিটা প্রাণের জীবন; একদিন চলে যেতে হবে, এটাই কঠিন নিয়তি। জন্ম নিলে তার শেষ পরিণতি অবধারিত। মৃত্যুই হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। তবুও মায়া থেকে যায়; মানুষের প্রতি মানুষের মায়া, পৃথিবীর প্রতি মায়া, সম্পর্কের মায়া, আরো না জানি কত কিছুর মায়া ত্যাগ করে চলে যাওয়া সহজ হয়ে ওঠে না তাই। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে, এ সত্যটা জানার পরেও বুকের কোথায় যেন হাহাকার জমে থাকে, প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া তাই মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ যেদিন ‘মৃত্যু’ শব্দটার সঙ্গে প্রত্যেকের পরিচয় ঘটে, আমরা জেনে যাই- এটাই চিরন্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এর ব্যতিক্রম নেই, হবেও না কোনোদিন। কিন্তু ঐ যে মায়া, পৃথিবীতে মানুষ আসেই মায়ার বন্ধনে জড়াতে, তারপর একদিন হুট করেই চলে যেতে হয়, রেখে যেতে হয় সকল কর্ম, সৃষ্টি, সব সম্পর্ক, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি। উপরে প্রদত্ত গানের লাইন দুটি প্রখ্যাত গীতিকার ও সুরকার বিজয় সরকারের লেখা। আর এ গানটিতে কণ্ঠের জাদু দিয়ে জনপ্রিয় করে তুলেছেন গ্রামীণ লোকসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক ঘরানার জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী। এতোদিন বারী সিদ্দিকী শুয়াচান পাখিকে ডাকতো ঘুম থেকে কিন্তু কোটি ভক্ত আজ তাকে ডাকছে কিন্তু আজ যে সেও অন্যদের মত হয়ে গেছে। পৃথিবীর মায়ার সূতা
ছিন্ন করে অচিনপুরের মায়ার বাধনে বেধে নিয়েছেন নিজেকে। যতই ডাকি আজ তো আর তার ঘুম ভাঙ্গবেনা। চিরদিনের মত সুখের নিদ্রায় শায়িত হয়ে আছেন মাটির কবরে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দুইটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত ১৭ নভেম্বর রাত ১টার কাছাকাছি সময় গুণী এই শিল্পী হৃদরোগে আক্রান্ত হলে অচেতন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে লাইফ সাপোর্ট দেন। জানাজা শেষে তাকে নেত্রকোনার কারলি গ্রামে ‘বাউলবাড়ি’তে দাফন করা হয়।

প্রখ্যাত এ সংগীতশিল্পীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোণায়। জন্মেছিলেন এক সংগীত প্রাণ পরিবারে, ফলে শৈশব থেকেই গানের শিক্ষা পেয়েছেন পরিবারের সদস্যদের হাতে ধরেই। ক্লাসিক্যাল সংগীতে আগ্রহ থাকায় এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। সংগীতে উচ্চতর তালিম গ্রহণের জন্য নব্বই দশকে ভারতবর্ষেও পাড়ি জমান। ভারতের পুনে শহরে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে মনোযোগী হয়ে ওঠেন আধ্যাত্মিক ও লোকসংগীতে।

১৯৯৫ সালে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রঙের বাড়ই’ নামের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন বারী সিদ্দিকী। এর মধ্যে নেত্রকোণার বাউল সাধক রশিদ উদ্দিনের লেখা ‘শুয়াচান পাখি’ এবং উকিল মুন্সীর ‘আমার গায়ে যতো দু:খ সয়’ গানের জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

প্রখ্যাত এ শিল্পী জীবনে যা-ই করেছেন, সবই তার আত্মিক টানে। তার লেখা, সুর করা কিংবা কণ্ঠ দেওয়া গানের প্রতিটা শব্দ তিনি হৃদয় থেকে অনুভব করেই উচ্চারণ করেছেন বিধায় তার গানগুলো এভাবে অন্যের হৃদয়কে স্পর্শ করে বলে তার বিশ্বাস। তেমনই তার বাঁশির প্রতিটা ফুঁ আত্মা থেকে নিঃসৃত বলেই অন্যের আত্মা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

তিনি শুধু প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীই নন, একই সঙ্গে প্রখ্যাত বংশী বাদকও। তার ধারণা, কণ্ঠ হচ্ছে ঈশ্বর প্রদত্ত, বাঁশি টেকনিকের বিষয়। একটা সময় সব ইন্সট্রুমেন্টকে কণ্ঠের কাছে হেরে যেতে হয়। তবে গান গাওয়ার চেয়ে বাঁশি বাজানোকে কঠিন মনে করেন গুণী এই শিল্পী। তিনি নিজে ১২-১৪ বছর একটানা ১২-১৩ ঘণ্টা বাঁশি প্র্যাকটিস করে সেটাকে আয়ত্তে এনেছেন। আর গানকে তিনি দেখেছেন ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যম হিসেবে।

হুমায়ূন আহমেদই তাকে প্রথম মানুষের সামনে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। সুদীর্ঘ বিশ বছর নিভৃতে ঘরোয়া পরিবেশে আধ্যাত্মিক ও লোকসংগীত গাইলেও, দেশের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজাতেন বারী সিদ্দিকী। গানের চেয়ে বেশি বংশী বাদক বারী সিদ্দিকীকেই লোকে আগে চিনেছিল। এত দরদী এক কণ্ঠের অধিকারী, নিজ দেশে লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গিয়েছিলেন বহু বছর। হুমায়ূন আহমেদই এ দেশের মানুষের কাছে বারী সিদ্দিকীর মতো রত্ন চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। মূলত তার আগ্রহেই বড় পরিসরে গান শুরু করেন এ শিল্পী।

এখনকার ডিজে গানের যুগে এসেও বারী সিদ্দিকী লোকজ ধারার মৌলিক গানের মাধ্যমে যেভাবে তরুণদের চিত্ত আকর্ষণ করেছন তা সত্যি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বারী সিদ্দিকীর গান শ্রোতারা সবসময় মনের সাথে মন মিলিয়ে গুনগুন করে গেয়ে যায়। তার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম গান গুলো, ‘শুয়াচান পাখি, আমার গায়ে যতো দুঃখ সয়, আমি একটা জিন্দালাশ, আমার অনেক বাঁশের বাঁশী আছে, মনে দু:খ মনে রইলো, আমার ঘরে জ্বালা বাইরে জ্বালা, রজনী হসনে অবসান, হইলো নারে মধুর মিলন, নষ্ট জীবন, আমার মন্দ স্বভাব ‘ সহ একাধিক গান তিনি শ্রোতাদের জন্য রেখেছেন। উনার মায়াবী কন্ঠের জন্যই শ্রোতাদের হৃদয়ে এমন ভালোবাসা। আল্লাহ তাকে মাফ করুন এবং বেহেস্থ নসীব করুন – মোহাম্মদ আমিন আলীফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: