Press "Enter" to skip to content

বারী সিদ্দিকীকে নিয়ে গীতিকার দেলোয়ার আরজুদা শরফের স্মৃতিচারণ…

আত্মীক চেতনায় উদ্ভাসিত ছিলেন বারী সিদ্দিকী –

সময়টা ছিল ২০০৬ সাল।
‘আমি একটা জিন্দা লাশ
কাটিসনারে জংলার বাঁশ
আমার লাইগা সাড়ে তিন হাত কবর খুঁড়িসনা
আমি পিরীতির অনলে পোড়া মরার পরে আমায় পুড়িসনা’…

এই গানটি দিয়েই বারী সিদ্দিকীর (শ্রদ্ধেয় বারী ভাই) সাথে আমার গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই গানটি ছিল তাঁর সুরে আমার লেখা প্রথম গান। মরার আগে যে মরে আর পোড়ার আগে যে পোড়ে, সেতো জিন্দা মড়া তাঁকে আর কবর দিয়েই কী হবে! পোড়ারে আর চিতায় পুড়িয়েই বা কী হবে! গানটিতে এমন দর্শন বারী ভাইকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছিল। তিনি গানের বানীর গভীরে ডুবে গেলেন আর যে সুর করলেন ! এখন আমার চেয়ে সবাই ভালো জানেন ।

আমার সাথে দেখা হলে এই গানটি প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন, ‘দেলোয়ার তোমার লেখা জিন্দা লাশ গানটি হাজার বছর বেঁচে থাকবে।’ শুনে শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল চলে আসতো, পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলে বুকে টেনে নিতেন।

আমার লেখা সহস্রাধিক গানে বাঁশি বাজিয়েছেন তিনি ৩০টিরও বেশি গানে সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ এ্যালবাম ছিল “নিষিদ্ধ মানুষ” সব কটি গানই আমার লেখা ছিল। তার পরে নতুন আরেকটি এ্যালবামের কাজে গান লেখা ও সুরের কাজ চলছিল। এ কাজটি করতে গিয়ে আমি এই গুণী মানুষটির খুব কাছে থেকে বোঝার ও জানার চেষ্টা করেছি। আমাকে তাঁর খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলাম তিনি যখন গান সুর করছিলেন এবং হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছিলেন কণ্ঠের মধ্যে যেন তারুণ্য ফিরে এসেছে চেহেরায় ছিল পবিত্রতার আভা।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে যাবে ভুলেও ভাবতে পারিনি এত আলোর পিছনে এত গভীর অন্ধকার লুকিয়ে ছিলো তা বুঝতে পারিনি। আমার লেখা ৪টি গান সুর করে ছিলেন। স্টুডিওতে এসে গান গুলো আর নামানো হলো না তাঁর।

একদিনের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো :
সকাল ১১টায় বারী ভাইয়ের বাসায় পৌঁছলাম, উদ্দেশ্য নতুন গান সুর করা। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন আমি পাশে বসে। কী লিখেছ শোনাও? আমি গানের মুখরা পড়ে শোনালাম,

এক ফোটা জল দেখে ডরে
কাপে এ অন্তর
দয়াল আমার পিপীলিকার ঘর…।।

অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
‘খুব ভালো লিখেছো।’ ডুব দিলেন সুরের সমুদ্রে। অসাধরণ একটি সুর করলেন। বললেন, পুরো গানটা লিখে শেষ করো সামনের রবিবার চ্যানেল আইতে গানটি করবো। ঠিকই তিনি গানটি চ্যানেল আইতে লাইভে করেছিলেন।
এই গানটিই ছিল আমার লেখা বারী ভাইয়ের শেষ সুরারোপিত গান।

আত্মীক চেতনায় উদ্ভাসিত ছিলেন তিনি। পরম প্রভুতে গভীর বিশ্বাস ছিল তাঁর। বাউলদর্শন, আধ্যাত্মবোধ মরমীবাদ ও সুফিবাদ অর্থাৎ আকর্ষণ মায়া প্রেম বিশ্বাস আরাধনা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও পরম প্রভুতে বিলীন হওয়ার চিরন্তন আকুতিই ছিল সুর সাধক বারী সিদ্দিকীর। পরম প্রভুকে সুর সাধনার মাধ্যমে স্মরণ এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের বস্তুকে অনুসন্ধিতসু মন নিয়ে অনুসন্ধানের নিরন্তর চেষ্টা ছিল এই মানুষটির। বিশুদ্ধ দেহ মন আত্মা ছাড়া কখনোই পরম প্রভুর সান্নিধ্যলাভ সম্ভব নয়। জৈবিক চেতনায় লীন হয়ে প্রভু দর্শন এ যেন গহীন অন্ধকারের আয়নায় নিজের মুখ দর্শনের ব্যর্থ চেষ্টা। তাই তিনি নিজেকে খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের ভিতরে, ডুব দিতে চেয়েছেন আত্মার অতল গহীনে। গানের বানী সুরে ও গায়কীতে তাঁরই প্রকাশ ছিল।

সংগীত-ই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। সুরের বারি দিয়ে কলুষিত আত্মাকে ধুয়ে মুছে পবিত্র করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। একটি গাছ যেমন বারি ব্যতীত নির্জীব থাকেন ঠিক তেমনি বারী সিদ্দিকী তাঁর সুরের বারি দিয়ে নির্জীব চিত্তকে সজীব করে তুলতেন। বারী সিদ্দিকী তাঁর সুরের ইন্দ্রজালে গভীর প্রেমে হৃদয়কে আক্রান্ত করতেন। তাঁর জাদুকরী বাঁশির সুরে শুধু যে নিজে হারিয়ে যেতেন তা নয়, অন্যদেরও নিয়ে যেতেন সুরের এক মায়া জগতে বিমুগ্ধতায় গভীর মৌনতায় বিভোর করে রাখতেন সবাইকে।

বাউল সুর ও ক্লাসিকাল সুরের যে সংমিশ্রণ আধুনিক বাংলা ফোক গানে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সাধারণ শ্রোতাদর্শকও তাঁর সুর মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সুর করা গান শুধু যে তিনিই গেয়েছেন এমনটি নয়, বাংলাদেশের অনেক জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পীরাও গেয়েছেন। তাঁর গানের সুরে যে আবেগ ঢালতেন তার দ্যুতি মানুষের হৃদয়ে খুব সহজেই প্রবেশ করতো। তিনি সুর স্রস্টা হয়ে উঠলেন। হয়ে উঠলেন বারী সিদ্দিকী। বাংলা গান যতদিন থাকবেন বারী সিদ্দিকীও ততদিন থাকবেন যুগের পর যুগ প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে অনুপ্ররণায় ভালোবাসায় ও গভীর শ্রদ্ধায়। – লেখক : গীতিকবি দেলোয়ার আরজুদা শরফ

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: